দরোজার ওপাশে এবি || সজীব তানভীর

দরোজার ওপাশে এবি || সজীব তানভীর

আমায় ডেকেছে
তাই আমি বসে আছি
দরজার ওপাশে …

রাত বেড়ে যাচ্ছে, দেড়টা বেজে গেছে; হাতের মোবাইলে ফেসবুক খুলে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরছি, স্যাড ইমোজি দিয়ে চলেছি একের পর এক। আমার মাথার নিচের বালিশটা ভিজে গেছে, চোখের পানি থামছে না। ল্যাপটপে হেডফোনে অনবরত বেজে চলেছে গান, আজ সারাদিন তাকেই শুনে চলেছি,  —

আমার একটা নির্ঘুম রাত
তোমার হাতে তুলে দিলেই
বুঝতেই তুমি
কষ্ট কাকে বলে

আজ খুব ভোরে কেন যেন ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সকালটা কেমন যেন ছন্নছাড়া মনে হচ্ছিল খুব। যখন খবরটা পেলাম, তখন আমি বাসায় একা, কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, বেশ কয়েকটা মুহূর্ত মনে হচ্ছিল নিশ্চয় ফেসবুকের নানান ভুল খবরের মতোই কিছু একটা। ইস!

বাসা থেকে বের হতে পারিনি, লাল চোখ কিছুতেই স্বাভাবিক করতে পারছিলাম না। বাসায় দুই-এক দফা ঝগড়াঝাটি হয়ে গেল এই নিয়ে, একজন পূর্ণবয়স্ক তরুণ সারাদিন একজন লোকের গান শুনে যাচ্ছে আর অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে, কোনো স্ত্রীই আসলে বেশি সময় এটা সহ্য করতে পারবে না। তাই এই আবেগ থেকে টেনে বের করার জন্যই বুঝি ঝগড়ার আশ্রয়। বিকালের দিকে কয়েক ঘণ্টার জন্য বেরিয়েছিলাম, চারিদিকের সবকিছুই কেমন যেন থমকে আছে মনে হচ্ছিল। যেন চারিদিকেই সব কোন-এক বিরহের সুরে ভেসে যাচ্ছে।

বাইরে গিয়েও অনেক কষ্টে চোখের পানি লুকিয়েছি। অথচ যে-মানুষটার জন্য এত কষ্ট হচ্ছে, তার সাথে সর্বসাকুল্যে দেখা হয়েছে তিন থেকে চারবার। আমি কখনোই তার সামনে গিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারিনি, প্রথমবার দেখায় বরফ হয়ে গিয়েছিলাম, তিনি নিজেই বলেছিলেন “কী খবর, কেমন আছো?”, আমি ঠিকমতো উত্তরও দিতে পারিনি!

বড় বেশি জানতে ইচ্ছে করে
ভুলে যাবে নাকি আমায় মনে রাখবে
বৃষ্টিভেজা কোনো দুপুরে
ভেবে কি তুমি কাঁদবে না
জোছনাধোয়া কোনো রাতে
বিষণ্ণ কি হবে না

নিজের খুব প্রিয় কাছের মানুষ হারিয়েছি অনেককেই, সাড়ে-তিনহাত মাটির কবরে নেমে নিজহাতে তাদের রেখে এসেছি। কেঁদেছি কিন্তু এমনভাবে অনবরত না। অথচ এই মানুষটা আত্মীয় নয়!

এই মানুষটা আসলে আমার মতো কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর আত্মার অংশ হয়ে গেছেন বিগত তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছরে। আমার কান্না আমার দুরন্ত কৈশোরের ফেরারি মনের, আমার কান্না সেই হাসি-শেষের নীরবতা দেখতে পাওয়া মানুষটার জন্য, কান্না কষ্ট পেতে ভালোবাসা মানুষটার জন্য, কান্না সেই দরোজার ওপাশে বসে থাকা রূপালি গিটার হাতে মানুষটার জন্য!

ব্যক্তি তিনি একা উড়াল দেননি আকাশে, সাথে নিয়ে গেছেন আমাদের সেই কিশোর-তরুণ সত্তাকেও। আজ সকাল পর্যন্ত সেই সুরের মাঝে কাটানো সময় ছিল বর্তমানকাল, এখন নস্টালজিয়া; সুরের সেই মানুষটা বর্তমান থেকে চলে গেছেন স্মৃতির পাতায়। তিনি আর বলবেন না “বুকেরই সব কষ্ট দু-হাতে সরিয়ে চলো বদলে যাই” …

আপনি জেনে রেখেন প্রিয় আইয়ুব বাচ্চু আপনার গান ছাড়া বাংলা গানও অসহায় …

রূপালি গিটার ফেলে আপনি দরোজার ওপাশে ভালো থাকুন …

সজীব তানভীর রচনারাশি
গানপারে এবি ট্রিবিউট

COMMENTS

error: