মকদ্দস আলম উদাসী : একজন নির্মোহ সংগীতসাধক || মোহাম্মদ জায়েদ আলী

মকদ্দস আলম উদাসী : একজন নির্মোহ সংগীতসাধক || মোহাম্মদ জায়েদ আলী

বাউল হওয়া সহজ কথা নয়। বলতে গেলে গোটা জীবনটাকে উৎসর্গ করতে হয় গানের জন্য। সাধনা করতে গিয়ে ক্ষণস্থায়ী জাগতিক সকল সুখ ও প্রাপ্তির বাসনাকে ত্যাগ করে অসীমের দিকে যাত্রা করতে হয়। যে-বাউলকে নিয়ে আজ লেখার উৎসাহ বোধ করছি, তিনি হলেন মকদ্দস আলম উদাসী। দেশবরেণ্য বাউলশিল্পী দুর্ব্বিণ শাহের অন্যতম শিষ্য ছিলেন তিনি। ১৩৫৪ বঙ্গাব্দে ছাতক উপজেলার চরবাড়া গ্রামে কবিরাজ মুজেফর আলী ও গৃহিণী সুখিরমা খাতুনের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন বাউলসাধক মকদ্দস আলম উদাসী।

নিজের জন্মতারিখ বলতে গিয়ে উদাসী এক গানে লিখেছেন, “১৩৫৪ বাংলায় জন্ম আমার জানিলাম, / বড় হইয়া মামার লিখা ডাইরিতে সন্ধান পাইলাম।” (নির্বাচিত গান : বিরহ লহরী, গান ২৮)। তাঁর অনেক গানেই তাঁর জন্মস্থান সম্পর্কে তথ্য উঠে এসেছে । যেমন — “চরবাড়া গেরামে জন্ম ইউনিয়ন হয় নোয়ারাই / ছাতক থানার অন্তর্গত সুরমা গাঙে লাই খেলাই।” (নির্বাচিত গান : বিরহ লহরী, গান ২৮)। আরেকটি গানে বলেছেন, “ছাতকের পশ্চিমে চরবাড়া গেরামে / জন্ম নিয়েছি এক কুঁড়েঘরে / সুরমা নদীর উত্তর পার স্মরণ আছে আমার / খেলাধুলা করতাম কোলাকানির চরে।” (উদাসীসংগীত : গান ১১৯)। উল্লেখ্য, ‘উদাসী’ তাঁর পরিবারপ্রদত্ত কোনও নাম/উপাধি নয়। এটি তাঁর উপনাম। তাঁর ভাষ্যমতে, তাঁর গুরু দুর্ব্বিণ শাহ তাঁকে এই উপাধি দিয়েছিলেন।

মাত্র দশ বছর বয়সে মকদ্দস আলম পিতাকে হারান। তখনও তিনি পিতা হারানোর মর্ম ঠিকমতো উপলদ্ধি করেননি। কিন্তু তাঁর বড়োভাইয়ের বিয়ের পর ভাই যখন পর হয়ে যায়, তখন থেকে ধীরে ধীরে তিনি জগৎসংসারের বৈরী রূপ দেখতে শুরু করেন। তাঁর গানে আভাস পাওয়া যায় — “দশ বৎসর বয়সে হইলেন পিতা জান্নাতবাসী / ভাইয়ের কাছে আমি তখন হয়ে গেলাম দোষী। / ধনসম্পদ কোনোকিছু মোটেই চাইলাম না / তবুও চরবাড়াতে থাকা মোর হলো না / ভিক্ষা করে লেখাপড়ার খরচ চালাই / তবুও জন্মভিটায় হলো না মোর ঠাঁই। / নির্যাতনের শিকার হইলাম কহিতে না পারি / মনের দুঃখ মনে লইয়া হইলাম দেশান্তরী। / পাগলের বেশে যখন বনে-জঙ্গলে রই / পেটের খিদায় শরীর কাঁপে কার কাছে কই।” (নির্বাচিত গান, বিরহ লহরী, গান ৬০)

মকদ্দস আলম উদাসীর বিভিন্ন গান থেকে স্পষ্ট হয় পিতার মৃত্যুর পর দুঃখটা হয়ে যায় তাঁর চিরসঙ্গী। মামার সাহায্য-সহযোগিতায় প্রথমে চরবাড়া মতিনিয়া লুৎফুল উলুম মাদরাসায় সাফেলা পাঞ্জম (মাধ্যমিক) পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। নিজের লেখাপড়া নিয়ে মকদ্দস আলম উদাসী লিখেছেন, “জন্মস্থান ছাড়িলাম শিক্ষাগুরু পাইলাম / মাদ্রাসাতে উস্তাদ নিলেন আপন করে। / প্রথম উস্তাদ মোর গ্রাম হয় মানসীনগর / মো. মফিজুর রহমান শিক্ষা দেন মোরে। / ফারসি উর্দু আরবি শিখাইলেন আপন ভাবি / বাংলা শিক্ষায় আবদুল কাহার গ্রাম বড়োবাড়ি ধরে।” … “বাবায় কবিরাজি করিতেন, নাগরী অক্ষর শিখাইলেন / হাতে কলম দিয়া বললেন, ‘এই দিলাম তরে / করিও আল্লার ইবাদত, মানুষের করিও খেদমত / কেউ আসিলে তোমার নিকট মায়া করিও তারে’।”

বাবার মৃত্যুর পর মকদ্দস আলম উদাসীর জীবনে দুঃখকষ্টের বর্ষণ শুরু হয়। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংকট। তিনি এ-সম্পর্কে বলেন, “বাবার ইন্তেকালের পর, দুঃখ এল মাথার উপর / দেশ ছাড়িয়া দুঃখমনে হইলাম দেশান্তর।” (উদাসীসংগীত,  গান ১১৯)। অতঃপর নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছেন, “মাদরাসাতে মন বসে না পড়ার খরচ কোথায় পাই / চিন্তারোগে ধরল মোরে কী করিব ভাবছি তাই।” (উদাসীসংগীত : গান ৪৬)। জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর মাদরাসায় এক বছর পড়ার পর প্রতিষ্ঠানিক লেখাপড়ায় ইতি টানেন। তারপর চলে আসেন ছাতকের দুর্বিনটিলায়। তিনি সংগীতে সিলেট অঞ্চলের প্রখ্যাত মরমি সাধক দুর্ব্বিণ শাহের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এখানে দোতলা-বেহালা বাজানো শেখেন। মালজোড়া গানের প্রশিক্ষণ নেন। তিনি দুর্ব্বিণ শাহ ও জালাল উদ্দীনের গান গাইতেন বেশি। তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু ছাতক উপজেলার কামারগাঁওয়ের শুকুর আলী চিশতি।

মকদ্দস আলম উদাসী নাগরী লিপিতে পড়তে ও লিখতে পারতেন। তাঁর বাবা একজন মৌলভি ছিলেন। তিনি কবিরাজিও করতেন। মোল্লার ছেলে গান করে বলে এলাকার মানুষ অনেক কথা বলত। কিন্তু উদাসী তাতে কর্ণপাত করেননি, গানও ছাড়েননি। সাধন-ভজনই ছিল তাঁর আজীবনের সম্বল। পরমাত্মাকে আজীবন তালাশ করেই জীবন পার করে দিয়েছেন তিনি।

বিভিন্ন সময়ে অনেক স্বনামধন্য শিল্পীদের সঙ্গে গান গেয়েছেন মকদ্দস আলম। মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে তিনি সিলেটের দক্ষিণ সুরমার সিলাম নিবাসী প্রখ্যাত বাউলসাধক আবদুল খালিক, সালুটিকরের বাউল অন্নদা রঞ্জন দাস, বাউল শাবুল মিয়া, বাউল ফকির সমছুল, বাউল কফিল উদ্দিন সরকারের সঙ্গে মালজোড়া গান গাইতেন।

মকদ্দস আলম উদাসী দিরাই উপজেলার বাসিন্দা আসমা বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর প্রথম পুত্র নুরুল আলম, দ্বিতীয় পুত্র ফয়জুল আলম, তৃতীয় পুত্র মইনুল আলম, প্রথম কন্যা সায়রা বেগম, কনিষ্ঠা কন্যা তাহেরা বেগম এবং কনিষ্ঠ পুত্র বুলবুল আহমদ। তাঁর স্ত্রী, পুত্র-কন্যাদের মধ্যে বুলবুল আহমদ ছাড়া সবাই প্রয়াত। স্ত্রী, পুত্র-কন্যাদের হারিয়ে তিন বছর বয়সে মা-হারা একমাত্র পুত্র বুলবুল আহমদকে নিয়ে মকদ্দস আলম উদাসী দুঃখদারিদ্র্যে দিনযাপন করতে থাকেন। এতকিছুর পরেও তিনি গান ছাড়েননি।

মকদ্দস আলম উদাসী নিজে গান লেখার পাশাপাশি হারিয়ে-যাওয়া লোককবিদের গানও সংগ্রহ করতেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি জগন্নাথপুরের রানীগঞ্জের রহমতুল্লাহ শাহ-র ১১৫টি, ছাবাল আলীর ৪৭টি গান সংগ্রহ করেছেন।

গুণী বাউলসাধক মকদ্দস আলম উদাসী জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন জগন্নাথপুর উপজেলায়। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে তিনি ছাতক থেকে জগন্নাথপুর উপজেলায় চলে আসেন। জগন্নাথপুর উপজেলা সদরের দিঘির পাড়ে ছোট্ট কুটিরে সংসারজীবন শুরু করেন। সেখানে নিজে গান গাইতেন আর শিষ্যদের গান শেখাতেন। পরবর্তীকালে তিনি গীতিকবি রাধারমণ দত্তের জন্মভূমি কেশবপুর গ্রামের এক কলোনিতে বসবাস শুরু করেন।

বাউল মকদ্দস আলম উদাসী তাঁর জীবনে অনেক গান রচনা করেছেন এবং সুরারোপ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইসমূহ হচ্ছে — ‘পরার জমিন’ (সম্পাদনা : শুভেন্দু ইমাম, মোস্তাক আহমাদ দীন; প্রকাশক লোকচিহ্ন  ১৯৯৯), ‘বিরহ লহরী’ (সুনৃত  ২০০২); উদাসীসংগীত (নাগরী  ২০১৭), নির্বাচিত গান (সম্পাদনা : মোস্তাক আহমাদ দীন ও মুক্তাদীর আহমদ, প্রকাশক : জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদ  ২০১৭)।

চার হাজারের বেশি গান রচনা করে গেছেন এই বাউল। নিজে গান লিখতেন, গাইতেন ও দোতারা বাজাতেন। তিনি বাউল দুর্ব্বিণ শাহের শিষ্য ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি ‘বন্যা’, ‘ট্রলার’, ‘কোলাকানীর বাঁক’, ‘বিরহ লহরী’ (১ম থেকে  ৫ম খণ্ড), ‘উদাসী সংগীত’ (১ম থেকে ৭ম খণ্ড) শিরোনামে পাণ্ডুলিপি করে রেখে গেছেন। মকদ্দস আলম উদাসী সুনামগঞ্জ শিল্পকলা অ্যাকাডেমির সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন। এছাড়াও তাঁকে ২০২১ খ্রিস্টাব্দে কেমুসাস-দেওয়ান আহবাব সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

বাউল মকদ্দস আলম উদাসী প্রকৃত অর্থেই একজন সাধক ছিলেন। আজীবন নির্লোভ ও নির্মোহ জীবন কাটিয়েছেন। জাগতিক মায়া তাঁকে যেমন স্পর্শ করতে পারেনি, তেমনই বিরত রাখতে পারেনি তাঁকে তাঁর সাধনা থেকে। তিনি নিজে কেবল আজীবন গান গেয়েছেন বা রচনা করেছেন তা নয়, পাশাপাশি সংকলন করেছেন আঞ্চলিক গান। তিনি যে-সমস্ত গান রচনা করেছেন তা লোকসংগীতজগতে এক অমূল্য সম্পদ, যা আজীবন মানুষের কাছে সমাদৃত হবে।

চিরদুখি মকদ্দস আলম উদাসী ১৪ জুলাই ২০২২ খ্রিস্টাব্দে দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংহপুর ইউনিয়নের চাইরগাঁও গ্রামে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। জ্ঞান ও গান সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি সারাজীবন পরমকে খুঁজে বেড়িয়েছেন। অবশেষে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হবার নিমিত্তেই তাঁর অন্তিম মহাযাত্রা।

তাঁর পরকালীন জীবন হোক পরম সুখের।


বাউল মকদ্দস আলম উদাসী নিয়া আরও রচনা
মোহাম্মদ জায়েদ আলী রচনারাশি

গানপার

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you