শরৎরাত্রিতে || আনম্য ফারহান

শরৎরাত্রিতে || আনম্য ফারহান

এখন রাত না ফুটলে শরৎ ফোটা রাত্র ওইভাবে বলাও যায় না। মধ্যাহ্ন পরবর্তী বিকাল, সন্ধ্যাবেলা; অনেকক্ষণ ধইরা পেঁচাইয়া পেঁচাইয়া হইতে থাকা, চলতে থাকা সন্ধ্যাবেলারে একরকম কইরা বুঝাই, আসলে নিজেরেই বুঝাই, রাত অত সুললিত হবে না। কষা রাত্রি, নিংড়াইয়া রস বাইর হইয়া যাওয়া রাত্রি, ফোঁপড়া রাত্রি, দীর্ঘ রাত্রি — এইগুলাই পারতপক্ষে হওয়ার।

বাসার গলিতে, একটা বাড়ি নির্মাণ চলতেছে। ট্রাক দেখি প্রতিদিন — হয় পাথর নামায় নাইলে বালু। ছাদ ঢালাইয়ের দিনগুলা আমার খুব ভাল লাগে। বালু ও কংক্রিটের স্তূপ আমি পছন্দ করি। কিন্তু রাত্রিবেলা, রাস্তায় ইটের কণার স্তূপ ও তার গা ধোয়া লাল পানি মাড়ায়ে ঘরে ফিরতে একটু অস্বস্তি লাগে। আমি উনাদের বলছি এইটা দিনে দিনেই সাইরা ফেলতে। ওরা করবে না হয়ত সেইটা। যদিও আমি উনাদের মধ্যে সেন্সিবল যিনি, তাঁকেই আমার অ্যাপিয়ারেন্স সহ জানাইছি যে আমার সমস্যা হয়।

পরে একটা জিনিস ভাবছি, এই যে মানুষজন মহাজীবনের মধ্যে পরিব্যাপ্ত, যার যার কাজ সে সে যাচ্ছে করে, প্রোগ্রামড ডিভাইস অ্যান্ড কোর্স, তার মধ্যেও তাদের আমার কথা শুনতে বা পাত্তা দিতে অসুবিধা হয় না। নিশ্চিত করেই কমিউনিকেশন ঘটে, তাদেরও হয়ত অঙ্গীকার ফলপ্রসু করতে না পারার আশঙ্কায় চোখ-মুখ ঈষৎ ব্যথিত, দেখছি, আর সমবেদনা একটু; ওই-ই মনে হয় আমার সান্ত্বনা হবে। সামনে।

কিন্তু তারপর? ডেড এন্ড?

কিছুই না তারপর। একটা লম্বা টানা পরিচিতিমাত্র চলতে থাকবে। চলতেই থাকবে। কোনোই শব্দাক্ষর বা শব্দাক্ষরের ভনিতাও সাধিত হবে না। লুজ এন্ডগুলা খোলাই পইড়া থাকবে।

তো, সান্ত্বনার পূর্বোল্লেখের সূত্রে ফেরত যাই। সান্ত্বনা যদিও এখন আমি সামান্য টলারেট করতে পারি, যা সত্য সত্যই একটি অভূতপূর্ব ঘটনা, তা কী একসময় আমরা কমজোরি হিসাবে উড়ায়ে দিতাম না? এখনও দিই। তবে এর গরম আঁচের প্রতি লোভটা এখন একটু-একটু হয় মনে হয়। খুবই অকিঞ্চিৎকর, তাই ভাবনা বিশেষ নাই। টুলস হিসাবে এর এই অত্যল্প ব্যবহার খুবই ভাল। জানতেছি।

আমিও তো মহাজীবনের তরে ব্যাপৃত। যেই ঊষাকে দেখছি সুপ্ত পৃথিবী টলায়ে সারিবদ্ধভাবে রচনা করে অর্থ, কিংবা নিরর্থ, তার সঙ্গী হয়েই এই জীবনে করতেছি একই কাজ। শরৎ রাত্রিতে আমি প্রবেশ করি যেন দরজা, জানালা ও দেয়ালগুলা সকাল পর্যন্ত ঠিকঠাক যার যার অবস্থানে থাকে। কোনো স্পেসশিপে, কোনো খেলনায় রূপান্তরিত কাজের কোনো অংশে, ধুলায় লুটানো যেন, না থাকে, সকালে। কোনোদিকে ছুইটা চইলা গেলেও যেন এমনি এমনি, সত্য সত্য না।

অগমেন্টেড রিয়ালিটির আগেই কোনো রিয়ালিটি যেন আমি এইখানে ভাঙি নাই। বরং ভাঙা মানেই গড়া, এর মধ্যেই নিহিত বিশ্বাস না রাইখা পাজল খেলতেছি। বরং আরও কুচি কুচি করতেছি। তাকে কি একধরনের গড়া বলে? যেহেতু আগের বস্তুটা নাই? নাহ, এত সরল না। বা সরল — জাস্ট কিছু একটা করতেছি। আগের কার্য সমাধান বা নিরুপণ, কিছুই না। আরেকটা কাজ।

লাউ-কুমড়ার কথা ভাবলে, তাদের পাতা ও তাদেরকে খাওয়ার কথা ভাবলে, ও…, অবশ্যই কুমড়া ফুলের কথাও; তখন আমার সুখী সুখী লাগে। মানে একটু স্মাইলি মাথা হয় তখন। সিগারেট টানলে অত গিল্ট ফিল হয় না। রাতভোর হয়ে এলে, আমি কাজগুলার দিকে তাকাই, শব্দের চেয়েও চিন্তার দিকে বেশি দেখি, কখনও শব্দ বেশি উচ্চকিত, কখনও চিন্তার মধ্যে সঠিক শব্দটাই নাই, আমার আর কিছুই ভাল লাগে না তখন। গভীর এক শরৎকালের লম্বা ছবি তখন সাজাইতে থাকি তো সাজাইতেই থাকি। ইংরেজ কবিদের অটামের মতো অটাম একটা মাথার মধ্যে চালাইতে থাকি। তখন ফসলশূন্য, কৃষিশূন্য কোনো মাঠঘাট আর মনে থাকে না আমার। মাঠভরা ভুট্টা বা চাবাগান বা তরমুজ মনে আসে না। একটা চলতে থাকা মনে আসে।

সারদা দেবীর কথা মনে আসে।
মনসার ঘট পুকুরে ভাসে, মনে আসে।
এমভি কর্ণফূলি এক্সপ্রেস মহেশখালী ও সোনাদিয়ার চ্যানেল পার হয়ে গভীর সমুদ্রে উঠল — মনে আসে।

সকালের আলো উঠার আগে, পৃথিবীতে এত নিরবচ্ছিন্ন বায়ু, অত্যন্ত হালকা একটি উড়াবড়া সাপ গাবগাছের পাতায় আইসা বসার শব্দের মতন তার নড়াচড়া — নীল শিরা দেখার মতো এইসব অপলক দৃশ্য আমাকে প্রস্তুত করতে করতে দিনের উপকণ্ঠের দিকে আস্তে আস্তে নিয়া আসে। দিনটাকে দেইখা খুব খুশি না হইলেও, গোসল না করলেও, চায়ের পানি ফুটাইতে না দিলেও, নাটেলা বা পিনাট্ বাটার দিয়া ব্রেডের কথা মনে না করলেও, শুধুই ওই চলতে থাকা কার্য, অকার্য এবং দীর্ঘ প্রায় না-থামা কাজগুলির মধ্যে লম্বা লম্বা অটামও চলতেছে মনে কইরা বিকাল বা সন্ধ্যাগুলির মধ্যে পড়ব ভাইবা আমার ভাল লাগতে থাকে।

পরিষ্কার আকাশে বের হইছে রৌদ্র। নীল খরতাপ আইসা বসছে রেলিংয়ে।

—১৬/০৯/২০২৩


আনম্য ফারহান রচনারাশি

গানপার

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you