বাংলা গানে ব্যান্ডধারা : নাইন্টিস্ অ্যান্ড অনোয়ার্ডস্ || আহমদ মিনহাজ

বাংলা গানে ব্যান্ডধারা : নাইন্টিস্ অ্যান্ড অনোয়ার্ডস্ || আহমদ মিনহাজ

বাংলা ব্যান্ডমিউজিকের জলবায়ু নিয়া কথাবার্তায় সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার আলোয় তার শ্রবণ-পঠন বা সে-রকম বয়ান কি দেশে গড়ে উঠতে পারছে? যেখান থেকে গাইয়ে-বাজিয়ে আর গীতিকার-সুরকার নতুন চিন্তনের রস পাইতে পারেন? আমার জানা নাই। সকলে তো দেখি গানের সুর, বাদন ও গায়কিকে বাহবা দিয়া আলাপের অন্ত টানেন! এর বাইরে গানের কথা এবং সেখানে সচল ভাববস্তু ডেলিভারি দেওয়ার সময় যেসব মোমেন্টাম তৈরি হইতে পারত অথবা হয়তো হইছিল অথবা হইতে গিয়াও হয় নাই, — গান শ্রবণের পর এইসব নিয়ে ভাবনা করা শ্রোতার দায়িত্বে পড়ে। সেদিক থেকে রচনাগুলা অ্যানালিস্টের  ভূমিকায় অবতীর্ণ হইতে অনিচ্ছুক ইত্যাদি ভণিতা গাইলেও সেই পথে হাঁটাচলা করতে অনভ্যস্ত নয় বলে প্রত্যয় হয়। ভাবনার খোরাক কী এছাড়া কপালে জোটে! এইসব রচনাকে উপলক্ষ করে তো বাংলাদেশের প্রজন্মপরম্পরায় বেড়ে-ওঠা সংগীত-ঐতিহ্যের মূল্যায়ন ও ব্যান্ড ঘরানার বিশেষত্ব নিয়া সংলাপে গমন সম্ভবপর ছিল। সে-ঘটনা কী ‘গানপার’-এ পাঠক ঘটাইতে পারছেন? ব্যান্ডগায়করা কী সে-রকম প্রতিক্রিয়ায় আপনার সঙ্গে আলাপ জুড়ছিলেন কোনোদিন? যদি থাকে তবে লিঙ্ক দিয়েন।

খেয়ালবশে নব্বই-পরবর্তী বাংলা ব্যান্ডসংগীত শ্রবণের ক্ষণে আপনি ছাড়াও দু-একজনের সংগীতবীক্ষণ পাঠের মওকা জুটছিল। সেই সুবাদে বিশেষ না-ভেবে ওপরের কথাগুলা লিখছি। সে যা-ই হোক, নব্বই-পরবর্তী ব্যান্ডসংগীত শ্রবণের পর মনে হইল জীবনবীক্ষণের জায়গায় উভয়ের মাঝে দূরত্ব তৈরি হইছে। নব্বই ও অনতিপরবর্তী দশক জুড়ে বিকশিত ব্যান্ড গায়করা কমবেশি ট্রানজিশনে বসে গান বাঁধছে। নিজের যুগবিশ্বে তারা শতভাগ বিলং  করে নাই আবার সদ্য অতীত দশকিবৃত্তে জারি থাকাও সংগত ছিল না। দুইয়ের মধ্যবর্তী শূন্যতায় অবিরত আসা-যাওয়ার ঘোরে নিজের অনুভব ও ভাবনাকে ভাষা দিতে তারা সচেষ্ট ছিল। বাংলাদেশে ওই সময়কার গানবাজনা প্রাগাধুনিক, আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক যুগবিশ্বের Inter Crossing Level বা আন্তঃপারাপারের  অভিজ্ঞতাকে ধরতে চেষ্টা করছে। বিষয়টা দিমাগে নেওয়া প্রয়োজন।

বাদনপ্রণালীর সঙ্গে কণ্ঠস্বরের উচ্চবিক্ষেপ অর্থাৎ Loud Voice Throwing-এর জন্য লোকে হয়তো দেশের ব্যান্ড-অঙ্গনে গীত সংগীতকে রক-পপ-হিপহপ ইত্যাদির মধ্যে গড় করে বিচার সারে, যেখানে রকএনরোল-এর স্বাদ উপহার দেওয়ার জন্য পৃথকভাবে তাকে বাহবাও দেওয়া হয়। ঘটনা হয়তো সত্যি, তবে পশ্চিমা বিশ্বে রক  গানের জমিন ষাট-সত্তুরের দশকের হিপি-বিটনিট দার্শনিক প্রস্থানভূমির ওপর দাঁড়ায়া অতিকায় যেসব কোমল-কঠোর রকারগো জন্ম দিয়াছিল তার সঙ্গে বাংলার রকার্সবৃত্তে চর্চিত গানাবাজনার বিলক্ষণ তফাৎ রয়েছে। ব্যান্ডগায়কদের ভাষা, জীবনবোধ বা প্রস্তুতিলগ্নের স্ট্রাগল এখানে অবদান রাখছে। বাংলা জবান ভূগ্রহের সর্বাধিক মিষ্টি জবানের কাতারে পড়ে। এই ভাষায় গান বাঁধতে বসে স্বর-সংযোজনার প্রতি অঙ্গে সে-কোমলতা উপচায় যে কি-না গায়কের ভোকাল কর্ড থেকে নিঃসৃত উচ্চ স্বরবিক্ষেপের  চাপ বেশিক্ষণ নিতে পারে না। কর্কশ বুলিও দেখবেন এই ভাষার জলহাওয়ার তাঁবে এসে কমলাভ হইতে থাকে।

নব্বইয়ের সফট থেকে মেটালিক ধাঁচের ব্যান্ডগায়কি তাই স্মৃতিকাতর কোমলতায় নিজের বিরাম খুঁজতে নিরুপায় ছিল। চিৎকৃত স্বরবিক্ষেপ পিছুটানে নিঃশেষ হইতে এখানে আরাম বোধ করছে। নব্বই বা শূন্য দশকের ব্যান্ডগায়কদের হাতে স্রোতের মতো সৃষ্ট গানের ভাষা ও ভাববস্তু এবং গায়নপ্রণালী যদি খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন সেগুলা অবধারিত নিয়মে বাঙালির চিরচেনা স্মৃতিকাতর নীড়ে বিরাম নিতে ব্যাকুল থাকছে। রক ধাঁচে নিজেকে ডেলিভারি দিতে গিয়া পপ বৃত্তে ঢোকার প্রবণতাকে সে নিরোধ করতে পারে নাই। ভিনভাষী রকার্সগো অনুসরণ করলেও ভাষা এবং জীবনবীক্ষণের দেশজ জলবায়ুর চাপে বাংলাদেশের ব্যান্ড গানের জগৎখান শেষতক্ কোমল পায়রা। নিঃসন্দেহে উপভোগ্য, তবে সেইটা বাংলার নিজস্ব সংগীত-ঐতিহ্যের ছাঁচে তাকে যখন ভাবছি তখন। পশ্চিমা বিশ্ব হইতে আগত ঐতিহ্য তাকে প্রভাবিত করছে কিন্তু নিজেকে এর উপযোগী বা কম্পিটেবল  করার চেষ্টা শেষতক্ অন্যদিকে মোড় নিতে বাধ্য ছিল। বাংলাদেশের লিজেন্ডারি ব্যান্ডগায়করা বিষয়টি তাদের বক্তব্যে তুলে ধরতে শরমান। যেন পশ্চিমা ব্যান্ডগানের ধারায় নিজেকে কম্পিটেবল  প্রমাণ করতে না পারলে বাংলা ব্যান্ডের জাত খোয়া যাবে! ঔপনিবেশিক মনন অর্থাৎ কলোনিয়াল মাইন্ডসেট   থেকে উনারা এখনো পুরাপুরি মুক্ত হইতে পারেন নাই।

বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের উৎস ও বিবর্তনের ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে গিয়া গায়কগণ নিজের গায়নপ্রণালীকে অহরহ Westernized জাহিরের চেষ্টা কেন করেন সেইটা এখন আর বুঝে আসে না। বাংলার জলহাওয়ার গুণে বিদেশি গানের কথা, ভাববস্তু, স্বর ও অঙ্গবিক্ষেপের সঙ্গে যে-প্রভেদ বাংলা ব্যান্ডসংগীতের জগতে অনায়াসে তৈরি হইছে সেখানে দেশিকরণের ঘটনা মিউজিশিয়ানরা নিজ মেধার জোরে ঘটাইতে বিফল হন নাই। বলা বাহুল্য, দেশিকরণটা বাঙালির জন্য উপভোগ্য শ্রবণ-অভিজ্ঞতাও বটে! কলকাতার ব্যান্ডগায়করা (*হীনে ঘোড়া  ব্যতিক্রম) আজোবধি এই কামে সফল হইতে পারেন নাই! অথচ বাংলাদেশ ঠিকই পারছে। সুতরাং গানের ধরতাইকে ভাঙা রেকর্ডের মতো Westernized দাগানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। শুরুয়াতের দিনকালে হয়তো ঠিক ছিল। এখন এ-রকম কথাবার্তা শুনতে বিরক্ত লাগে। ব্যান্ডগায়কদের নিজ হস্তে সৃষ্ট স্বকীয়তার ওপর এই দাবি অবিচার ঘটায়!

বাংলা ব্যান্ডগানের বাদনপ্রণালী হয়তো Westernized; উক্ত ধাঁচ থেকে সে আজো বাহির হইতে পারে নাই এবং এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে কমবেশি সত্য। ব্যান্ডগায়কদের মুখের বুলি, পোশাকআশাক ও জীবনযাপনের ধারা পশ্চিমা গায়কদের অনুকরণে একই সময়ে বিশ্বে তৈরি হইছিল। ভয়েস ডেলিভারির ক্ষণে গায়কের দেহভঙ্গির মধ্যে পশ্চিমা গায়কদের ছাপ চোখে পড়ে। সিনথেসাইজারের কল্যাণে কণ্ঠস্বরের যান্ত্রিকায়ন পশ্চিমা পদ্ধতিতে অটকায়া আছে মনে হয়। পশ্চিমা  এতকিছুর উপস্থিতি সত্ত্বেও গানের ভাষা ও ভাববস্তুর দেহে সুর লাগানোর পদ্ধতি আর স্কেল অনুসারে স্বরবিক্ষেপের ঘটনা বাংলার জলমাটিহাওয়ার তাঁবে গায়ককে বশীভূত হইতে বাধ্য করে। বাচ্চু-জেমস-মাকসুদ-হাসান নিজে বোধহয় টের পায় না বাদনপ্রণালীর যে-আবহ তাদের কণ্ঠকে বিশেষ এক্সপোজার  দিতে উতলা করে এবং স্বরবিক্ষেপের সাহায্যে তারা সেইটা ঘটায়, সেইখনে বাংলা জবানের মিঠা-মিঠা স্বভাব তাদের কণ্ঠস্বর নিয়া খেলে! চিৎকৃত স্বরবিক্ষেপের পশ্চিমা ধরন তখন নিজের মেজাজ হারায়া ফেলে। স্মৃতিকাতর সংবেদনে নিহিত পিছুটান আর ভালোবাসার আর্তিঘন বুলির মাঝে যত কোমলতা বাংলা ভাষায় বিরাজে, সেখানে তাদেরকে সে ফেরত যাইতে বলে।

নব্বইয়ে অনেক কামিয়াবির ঘটনা ঘটছিল এবং আরো ঘটত যদি বাংলা লোকগান ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে বিদ্যমান স্বরবিক্ষেপের ফ্লেভারকে নিজস্ব ঘরানায় নবীকরণ ঘটানোর কামে গাইয়ে-বাজিয়ে-সুরকারগণ ব্যাপক হইতেন। এই চেষ্টা সোলো গায়কদের আঙ্গিনায় কবীর সুমন একসময় করছেন, তবে মনে রাখা প্রয়োজন উনি ব্যান্ড/রক   গায়কির বর্গে পড়েন না। ডিলানকে নিলেও রকার্স   হওয়ার চেষ্টা করেন নাই। গানের কথায় সুমন সময়ের আর্তিকে ধারণ করতে চাইছেন এবং সুরসৃষ্টি ও বাদনপ্রণালী সেই ছকে মেনে সেখানে ঘটছিল। নির্দিষ্ট কোনো ধারা তাঁকে শাসনে রাখতে পারে নাই। যখন যেইটা দরকার মনে করছেন সেই অঙ্গে নিজের কথাকে সুরে জুড়ছিলেন। পশ্চিমদেশি সোলো গায়কদের লম্বা লিস্টে বব ডিলান তাঁকে প্রভাবিত করলেও স্বরবিক্ষেপ যোজনার ক্ষণে ডিলান বা কোহেনের পরোয়া তিনি কতটা করেন সে-নিয়া তর্ক হইতে পারে। তাঁদের নিকট থেকে তিনি সেই এসেন্সটা ধার করছিলেন যেইটা তাঁকে গানের কথায় নতুন গতি ও শক্তি সঞ্চারের দিকে নিয়া যাইতে পারে। যেহেতু শচীনকর্তা কিংবা সলিল চৌধুরীদের যুগবিশ্বে সৃষ্ট বাংলা সংগীতের সুমধুর কামিয়াবির ঘটনা ততদিনে সকল অনন্যতা সত্ত্বেও সময়ছুট ও নিস্তেজ সংগীতের প্রতীক রূপে তাঁর চেতনায় বিঘ্ন ঘটাইতে শুরু করছিল। স্বাভাবিক! সত্তরের দশক দুই বাংলার জন্য স্মরণীয় ছিল। মুক্তিযুদ্ধ বা নকশালবাড়ির ঘটনায় বসবাস করা যুবার পক্ষে বাংলা গানের চিরাচরিত প্রেম-বিরহ-বিষাদমাখা গীতল স্বরকে প্রচলিত অঙ্গে গানে জোড়ার মেজাজ থাকে না।

বাড়ির খাল বেয়ে নকশাল যুবকের লাশ ভেসে যাচ্ছে … এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার পর ডিলানদের দিকে তাকানো কবীর সুমনের জন্য অনিবার্য ছিল। সুমন তাকাইছেন এবং গানের ভাষায় তাঁর সময়ে সক্রিয় হইতে উন্মুখ সব দ্রষ্টব্য সংযোজন বা বাংলা গানের গীতল ধারাকে নবঅঙ্গে ভাংচুরের মাধ্যমে এখন বোধহয় শান্ত হইছেন। তাঁর গানের আবেদন সময়ের পটপরিবর্তনে প্রাসঙ্গিক হইতে থাকবে নাকি জাদুঘরে নির্বাসন লাভ করবে সেইটা আন্দাজ করা কঠিন। মরমে বাংলা গানের স্বীকৃত চিহ্নগুলাকে মন্থন করলেও যুগের প্রয়োজন মিটানোর কামলা খাটা সুমনের গানের জগতে এর রিফ্লেকশন ব্যাপক হয় নাই। বাংলা ভাষায় বিরচিত গানের ক্ষেত্রে অকাট্য ট্রেডমার্কগুলা ব্যবহারের সময়, পরিস্থিতি অথবা সেই মেজাজ তিনি ধরে রাখতে পারেন নাই, যার চর্চায় রবি-নজরুল-পঞ্চকবি থেকে শুরু করে শচীন-সলিল-রাহুল সকলে কমবেশি অক্লান্ত থাকছেন।

সে যা-ই হোক, বাংলা ব্যান্ডের কথায় ফিরি। বাদনপ্রণালীর জায়গা বাদ দিলে নব্বই মূলত সত্তরে জন্ম নেওয়া পপ অঙ্গে স্বাভাবিক ছিল এবং তাকে নেতিবাচক ভাবার কারণ নাই। আজম খানরা যে-অঙ্গে স্বরের স্কেল ব্যবহার করতেন অথবা তাদের পৃথক দেহভঙ্গির পরোক্ষ ছাপ নব্বইয়ের শুরুতে দুর্লভ ঘটনা ছিল না। তবে গানের ভাষা ও সুরেলা হাওয়ার আবেশ ছড়ানোর কামে নব্বইয়ের গায়কি সত্তর থেকে দূরগামী হইতে পারছে। সফট ও মেটালিক সকল ধাঁচের পরিবেশনায় নব্বইয়ের ব্যান্ডবাজদের কথা, সুর, বাদন আর স্বরবিক্ষেপে কম্প্যাক্ট   থাকার ঘটনা অনায়াস হইতে পারছিল, যে-কারণে বাংলার আমজনতা তাদেরকে বুকে টানতে ও ভালোবাসতে দ্বিধা করে নাই।

ওদিকে নব্বই-পরবর্তী ব্যান্ডের গায়ন শুনে মনে হইল নিজেকে নিয়া ওরা বোধহয় কনফিউজড! গানের ভাব ও সুর সৃষ্টির প্রবণতা থেকে শুরু করে গায়কির সর্বাঙ্গে চাপা নিরাশার ছাপ কানে পশে। নিজেকে নিয়ে কী করা যায় সেইটা ভেবে না পাওয়ার ছন্নছাড়া আর্তি তাদের দেহমনকে যেন কারাগারে কয়েদ রাখছে। স্মৃতিকাতর পিছুটানগুলা অবশ্য এখানে তীব্র হওয়ার ক্ষমতা হারায়া ফেলছে বা অতীতের প্রতিধ্বনি হইতে চায় না। সমাজ ও স্বদেশ-সংযোগ খাপছাড়া। কণ্ঠস্বর, মুখের অভিব্যক্তি ও দেহভঙ্গির সবটাই বিকারহীন আত্মহত্যার সহযোগী হইতে ব্যাকুল। জাত ইন্ট্রোভার্ট   ও নিজেকে নিয়া সদা নিরুপায় নরওয়েনিবাসী চিত্রকর এডওয়ার্ড মুঙ্ক দেহমনের ভিতরে ঘুমন্ত চিৎকার   বাহির করার উপায় তালাশ করার অবধারিত ক্ষণে ক্যানভাসে ‘The Scream’ আঁকতে বাধ্য হইছিলেন। জুনিয়র প্রজন্মের গায়কির মধ্যে সে-রকম চিৎকারে ফেটে বাহির হওয়ার প্রয়াস কানে এসে লাগে। যদিও অঘটনখান ঘটানোর জন্য প্রেতঘন যেসব উপকরণ ও নিঃসঙ্গ বিষাদ অনিবার্য হইতে হয়, সেইটা তাদের জীবনে জন্ম নিয়াছে বলে একিন যাইতে পারি নাই। প্রেম-ভালোবাসার আবেগকে এক্সপ্লয়েট করার ঘটনায় সিনিয়র প্রজন্মের মতো স্মৃতিকাতর বৃত্তে ফেরত যাওয়ার তাড়া তাদেরকে অস্থির করে বলে একবারও মনে হয় নাই। এইসব অনুভূতি গানে জোড়ার সময় তারা বরং যান্ত্রিক অভিব্যক্তির ভিতর দিয়া কাম সারে, যেখানে নিজেকে ভালগার রূপে উপস্থাপনের প্রবণতা কানে সজোরে ঘাই দিয়া যায়।

বাদনের সঙ্গে কণ্ঠস্বরের ওঠানামায় স্বেচ্ছাকৃত Sarcasm (*যেমন ধরুন ফিরোজ জংয়েরঅং বং ছংকিংবা সোনার বাংলা সার্কাসএর গানে স্বরযোজনার ধরন) অর্থাৎ নিজের বিশ্বাস ও ভাবনার বিপরীত কিছু সজোরে উগড়ে দেওয়ার চেষ্টা প্রবল মনে হইছে। সুরেলা হওয়ার ক্ষণে ইন্টারপৌজের   মতো সুরহীন হওয়ার চেষ্টা খট করে কানে বাজে। এইসব ঘটনা পশ্চিমা রক  ঘরানায় গীত সংগীতের জাত লক্ষণ। এই প্রজন্ম বোধহয় মনে করায়া দিতে চায়, নব্বইয়ের বৃত্তভুক্ত হইতে তারা সবিশেষ আগ্রহী নহে। যদিও বাদনপ্রণালীর ধাঁচ দেখে ধারণা হয় নব্বই থেকে এখনো বিশেষ আগায় নাই। ঘটনাখান উদ্ভট এবং সে-কারণে আমি নিজে কনফিউজড। দুইটা ভাগ আপাতত চোখে পড়ছে। এক ভাগে শূন্য, মেঘদল, সোনার বাংলা সার্কাস, সহজিয়া   ইত্যাদিকে বিবেচনা করা যাইতে পারে। এই ভাগটা নব্বই ও পূর্ববর্তী প্রজন্মের গায়নপ্রণালীকে ডিজওউন  করার চেয়ে সেখানে নিজের ল্যাঙ্গুয়েজ ও ভিডিওগ্রাফির (*যেহেতু গান এখন শ্রবণের সঙ্গে দেখারও বিষয়) নতুনত্ব তুলে ধরতে চায়। ভিডিওগ্রাফির ক্ষেত্রে নেমেসিস   হয়তো তাদের খানিক হইলেও প্রভাবিত করে যায়। শূন্য দশকে জন্ম নেওয়া নেমেসিস  গেল দুই দশকে গানের ভাববস্তুর সচিত্রায়নে বিশেষ ঘটনা বটে! ‘মেঘদল’ বা ‘সহজিয়া’-র উপস্থাপনা সেদিক থেকে বিগত ও সমাগতের মিশ্রণ বলা যাইতে পারে। নব্বইয়ের সময়বিশ্বে জন্ম নেওয়া লক্ষণের নিরিখে নিজের সময়-লক্ষণকে বিশ্লেষণ ও উভয়ের মাঝে কনট্রাস্ট ঘটানোর কামে তাদের মনোসংযোগ কানে দোলা দিয়া যায়।

সহজিয়া’-র পাখিপর্বের গানগুলার কথাই ধরেন। গানের কথা ও গায়কি হৃদয়গ্রাহী সুরযোজনায় নব্বইয়ের যুগবিশ্বে সৃষ্ট অনিকেত মুহূর্তগুলা মনে পড়ায়। অনিকেত অনুভব ফেরত আনার ক্ষণে কিন্তু বৈপরীত্যের অনুভূতি গানের কলির মধ্যে প্রবেশ করে, যেইটা আবার নব্বই থেকে সহজিয়াকে দূরের ভাবতে বাধ্য করায়। ‘ছোট পাখি’ গানের প্রতি পরতে ‘নেই’-র ঘোষণা নগ্ন ও ডিরেক্ট,  যেইটা আবার নব্বইয়ের ব্যান্ডগানে সহজশ্রাব্য ছিল না।

ও পাখি ও পাখি / গানটা হেরে গ্যাছে / নদীটা ফিরে গ্যাছে / পাহাড়টা সরে গ্যাছে / সাগরটা মরে গ্যাছে / আদিবাসী শামুকের কোনো ঘর নেই … /  নেই নেই কিছু নেই / রাস্তার বাম নেই / শ্রমিকের ঘাম নেই / টাকাদের দাম নেই / চিঠিটার খাম নেই / আমাদের কারো কোনো নাম নেই

নব্বইয়ে ‘নেই’-হওয়া সঞ্জাত বিষয়গুলার প্রকাশভঙ্গি পৃথক ছিল। এমন মনে হয় নাই যে ‘নেইমানে সত্যি সতি কিছুনেইবলে গায়ক মিন করতে চায়! এর গণ্য কারণ সেই জার্নিতে ছিল যেখানে নব্বইয়ের ব্যান্ডগায়ক তার জীবন হইতে উধাও বিজড়নকে স্মরণ করতে বসে হয় বিমনা নতুবা চেপে-রাখা আর্তিতে বিদীর্ণ হইছে মাত্র। বুকের খাঁচায় কল্পপ্রতিমার আকারে হইলেও সকল পিছুটান, বিষাদ ও স্মৃতি-বিস্মৃতিকে পুষে রাখার ভাবনা তার পিছু ছাড়ে নাই। সোলস, এলআরবি, নগরবাউল, ফিডব্যাক  থেকে শুরু করে আর্ক, মাইলস, রেনেসাঁ, ডিফারেন্ট টাচ  কিংবা অনতিপরবর্তী অর্থহীন, শিরোনামহীন … সকলের গায়কিতে ঘটনাখান প্রকাশ্য। এমনকি মেটালিক ওয়ারফেইজ, আর্টসেল  বা নেমেসিস  এই বৃত্তে সহজাত থাকার কোশেশ করছে। ‘নেই’ হওয়ার বিচিত্র অনুষঙ্গকে সোজাসাপ্টা ইশতেহারে পরিণত করার মুহূর্ত সমাগত হইতে দেখে সেখান থেকে তারা পিছলে সরে আসছিল, একই ঘটনা এখন ‘মেঘদল’ বা ‘সহজিয়া’-র যুগবিশ্বে আর সহজাত ও সম্ভব ‘নহে’।

‘সহজিয়া’-র যুগবিশ্বে ‘নেই মানে সত্যি সত্যি নেই’! কল্পপ্রতিমায় তারে বুকে পোষার অনুভব এখানে নিঃস্ব হইতে বাধ্য থাকে। ‘নেই’-র ডিক্লারেশন যেন শ্রোতাচিত্তে স্মৃতিকাতর কল্পপ্রতিমার আবেশ বহাইতে না পারে সেই অঙ্গে গায়ক স্বরবিক্ষেপ ঘটায়। শ্রবণের পর শ্রোতার মনে প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার চান্স সে দিতে রাজি নয়। নিজেকে নিঃস্ব ও ফাঁকা-ফাঁকা বোধ হওয়ার আবহখান নীরবে শুধু ঘনীভূত হয় সেখানে। মুঙ্কের চিৎকারটা সে-আবহের শিকল ছিঁড়ে বাহির হইতে চায় কিন্তু বিফল হতশ্বাসে মাথা কুটে মরে।

মৌসুমী ভৌমিক ‘সহজিয়া’-র ‘ছোট পাখি’ গানখান খালি গলায় গাইছিলেন। গলার স্বর তারসপ্তকে তুলে তিনি গাইছেন। শ্রবণের ক্ষণে শ্রোতাচিত্তে আবেশন জারি থাকে এবং সেইটা মৌসুমীর এই ধারার গানে সহজাত কামিয়াবির কারণে না-ঘটে উপায়ও থাকে না। সেইসঙ্গে দুই প্রজন্মের তফাতটা সেখানে দাঁত বের করে হাসে। গানটা পরিবেশনের সময় নব্বইয়ে সহজদৃষ্ট ভাবাবেগে মেদুর হওয়ার অভিজ্ঞতা মৌসুমী তাঁর কণ্ঠে রিকল   করান। ওদিকে রিকল­  করার ঘটনা প্রত্যাখ্যানের বোধ হইতে কিন্তু ‘সহজিয়া’ মধ্যসপ্তকে স্থির থেকে গানটা ডেলিভারি দিয়াছিল। অগত্যা জেনারেশন গ্যাপ নিরোধের উপায় আর অবশিষ্ট থাকে না। ‘নেই’-র সঙ্গে বিজড়িত সমুদয় বস্তু/বয়ান ডেলিভারি দেওয়ার ক্ষণে পৃথক যুগবিশ্বে জন্ম নেওয়া মানুর অনুভবগত মাত্রাভেদ দিমাগে নিতে না পারলে শ্রোতার পক্ষে নব্বই পরবর্তী ব্যান্ড গানে ‘মেঘদল’ বা ‘সহজিয়া’-র বৈপরীত্য বা স্বাতন্ত্র্য তৈরি ধারা বোঝা কঠিন হয়।

অন্য ভাগে অপেক্ষাকৃত চ্যাংড়া যেমন আফটারম্যাথ, কনক্লুশন, ভাইব, এডভার্ব, ফিরোজ জং  ঘরানার গায়কিকে রাখা যাইতেও পারে। এই চ্যাংড়ারা অধিবাস্তব বিশ্বে সক্রিয় চিহ্ন ও বোধ নিয়া আগাইতে আগ্রহী। তাদের গানাবাজনা ও অ্যানিমেশনে সেই কসমিক মিথস্ক্রিয়ার অনুভবকে ভাষা দিতে চায়। নব্বইয়ের কবিতায় প্রবণতাটা উঁকি দিলেও গানে কিন্তু সেভাবে আসে নাই। তাৎক্ষণিক নিরিখে এমনটাই মনে হইছে। যা হোক, নবীন প্রজন্মের গায়নপ্রণালীর দিশা পাইতে আরো সময় ও অপেক্ষা প্রয়োজন।


আহমদ মিনহাজ তাৎক্ষণিকামালা
আহমদ মিনহাজ রচনারাশি

COMMENTS

error: