বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর : প্রস্থান ও পদাবলি

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর : প্রস্থান ও পদাবলি

কিন্তু অনেক বেশি দিরং হয়ে গেল, অতটা দেরি হবে ভাবি নাই আগে। একবছর পুরে এল বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ইন্তেকাল করেছেন। পড়াশোনার ছোটবেলা থেকেই উনার লেখাপত্র পড়ে আসছি তো, কাজেই উনারে নিয়া অবিচুয়ারি কিসিমের একটাকিছু মুসাবিদা করতে যেয়েও করতে না পারতে পারতে একবছর পগারপার। হাউ টাইম ডাজ্ ফ্লাই!

ইন্তেকালের নিউজটা পাই যখন, দুনিয়ায় কেউ তখন কাউরে নিয়া মাথা না-ঘামায়া খালি ইয়া-নফসি ইয়া-নফসি করছিল। সবাই ইন্ডিভিজুয়্যালি বাঁচতে চাইছিল সবাইরে ফালায়া। দারাপুত্রপরিবার কে-বা কার অবস্থা চাদ্দিকে। এখনও তথৈবচ। অথবা আদি থেকে আদতে তা-ই বিরাজিছে। প্যান্ডেমিকের টাইমে ব্যাপারটা আমাদের জেনারেশনের সামনে ন্যাংটো হয়ে দেখা দিয়াছে কেবল। ২০২০ মার্চের ২৩ তারিখে খানজাহাঙ্গীর ইন্তেকাল করেন, ইমিডিয়েইট পরের দিন অনির্দিষ্টকালের কড়ারে দেশজোড়া লকডাউন ডিক্লেয়ার করা হয়। ছাব্বিশে মার্চ থেকে আপিশকাচারি বন্ধ করে সবাই ঘরে বসে থাকতে শুরু করি। খানজাহাঙ্গীরের জীবনাবসানের খবর পেয়ে অবিচুয়ারি লিখছি-লিখব করে একটা আস্ত বছর ঘুরে গেল। মৃত্যুর মিছিল শুরু হলো দুনিয়ায়, দেশে-দেশান্তরে, এখনও থামে নাই মিছিল, কবে থামবে কেউ বলতে পারে না।

কবি হিশেবে খানজাহাঙ্গীরের পরিচয় সেই-অর্থে প্রচারিত বা প্রতিষ্ঠিত না-হলেও উনার কবিতা ভাল্লাগত। যদিও উনার ছোটগল্পগুলা আরও বেশি ইন্ট্রেস্টিং মনে হতো। দৈনিকের/সাপ্তাহিকের/মাসিকের পাতায় উনার কবিতা নজরে এলেই পড়তাম, ঠিক যেমন রাহমানের কবিতা সযত্ন পরিহার করতাম। রাহমানের এবং তার অগুন্তি অনুকারদের কবিতায় বাংলাদেশের পাতাগুলা ভরা থাকত। আল মাহমুদ, সিকদার আমিনুল হক, আবিদ আজাদ, ফরহাদ মজহার প্রমুখ অঙ্গুলিমেয় কয়েকজন ছাড়া কারোর কবিতা আমাদেরে ভ্যালু দিয়া পাঠের কোনো প্র্যাক্টিক্যাল কারণ ছিল না তখন; এখনও কি আছে?

কেমন কবিতা লিখতেন খানজাহাঙ্গীর? শামসুর রাহমান গংদের ভরভরন্ত মরশুমে খানজাহাঙ্গীর কবিতা লিখতেন এমন একটা ভাবে, এমন একটা স্টাইলে, যেমনটা আর কেউ লিখত না। প্রায়ই আমাদের সমবয়সী তরুণ কবিরা, যারা ক্যালকাটা কাব্যের সাবস্ক্রাইবার ছিল, তারা ভাবত যে এইসব আদৌ কবিতাই নয়। বলত, উনার হয় না, উনি লিখতে পারেন না। আমার ভাল্লাগত। কবিতার-মতো-শুনতে, দেখতে-কবিতার-মতো, এমন কবিতা উনি লিখতেন না। একই কথা খাটানো যায় উনার গল্পের ক্ষেত্রেও। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর হাসান আজিজুল হকদের গল্পশৈলী দিয়া বাংলাদেশে গল্পের যেই চর্বণ চলেছে (এবং চলছে), এর কিয়ৎকাল পরে শহীদুল জহির প্রবর্তিত গল্পশৈলীর পৌনঃপুনিক অনুবর্তন, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরে সেসবের ছিঁটেফোঁটা আনাগোনা নাই। ফলে উনারে ফোলো করে গেছি অনেকেরই এবং অনেককিছুরই অলক্ষে।

এই কথাগুলাই বলতে চেয়েছিলাম উনার মৃত্যুর খবর পেয়ে। এত দেরি হয়ে গেল যে এখন আর এত ব্যক্তিগত কথায় (এবং ব্যক্তিগতিকতায়) নিবন্ধ না-পয়দায়া আরেকটু কর্তব্যনিষ্ঠার পরিচয় দেখায়া উনার কাজ নিয়া কথা বলা দরকার। তা-ও সময়সাপেক্ষ। তবে এই কাজটা আমাদেরে করতে হবে একদিন। উনার লেখাপত্র মূলত আমরা পড়েছি সাময়িক পত্রিকান্তরে, উনার বইটই সেভাবে পড়ি নাই। কিন্তু উনি নিয়মিত আর্ট নিয়া লিখতেন, দেশিবিদেশি শিল্পীদের নিয়া বায়োগ্র্যাফিক প্রবন্ধ লিখতেন, আমি অনেক উপকার পেয়েছি উনার কিছু আর্টক্রিটিক পড়ে আমার আর্লি দিনগুলায়। শিল্পী জয়নুল আবেদীন নিয়া উনার একটা বই কিনেছিলাম কবেকার ধূসর অতীতে। এখনও বইটা কাজের।

স্কলার ছিলেন উনি অ্যাকাডেমিক বিবেচনায়। ইয়াং জেনের লগে তেমন দহরম-মহরম ছিল না বলেই হয়তো, তদুপরি বিদ্যায়তনিক সাফল্যের সিঁড়ি বাইতে যায়া, উনার সৃষ্টিশীল সত্তাটা সেভাবে পরিচিত হয়া উঠতে পারে নাই। শিক্ষাবিদ পরিচয়টাই দিত পত্রিকাওলারা সাধারণত। উনি নিজেও খুবই উচ্চম্মন্য একটা ভাব সম্ভবত বজায় রাখতেন, বিভিন্নজনের মেমোয়ারে এমন ইঙ্গিতই পেয়ে এসেছি সবসময়। কিন্তু উনার স্কলার সত্তাটা বাধা হয় নাই ক্রিয়েটিভ সত্তা বাঁচায়া রাখবার ক্ষেত্রে। উনার লেখা কবিতা আর গল্পের সংখ্যা দেখেই জিনিশটা আন্দাজ করা যায় যে উনি লিখে গেছেন নিজমনে নিমজ্জিত অবস্থায়। এতই ব্যক্তিক অনুভূতি থেকে লেখাগুলা দাঁড় করান উনি যে মাঝেমধ্যে একটুখানি পিসড-অফ অবস্থায় আবিষ্কার করব পাঠক হিশেবে আমরা নিজেদেরে। এমনকি কবিতা ভায়ব্রেটেড হয় বিফোর ইট ইজ আন্ডার্স্টুড, এই আপ্তবাক্যটা জানা থাকা সত্ত্বেও উনার কবিতা (এবং গল্পও) প্রায়ই ধন্দে ফেলে দ্যায় আমাদেরে। সেই-যে, আশপাশের কিছু/কারোর লগে মিলাইতে না-পারার ফলে পাঠক হিশেবে আমাদের ইগো হয়তো হার্ট হয়। অ্যানিওয়ে।

এইখানে বেশকিছু কবিতা আমরা আগে পড়ি খানজাহাঙ্গীরের, যেন পরে একদিন উনারে নিয়া আমরা আরেকটু কথাবার্তা বলতে পারি। কবিতাগুলা ব্যক্তিগত সংগ্রহের পুরানা পেপারপত্রিকা থেকে বেছে নেয়া। আরও যুক্ত করা যেত কবিতা, বা উনার ‘কবিতাসংগ্রহ’ কালেক্ট করাটাও হয়তো কঠিন হতো না, তাতে টাইম লাগত আরও। আপাতত এই কয়টা কবিতা পড়ি যদি, বিশেষত বাংলাদেশের কবিতায় ক্যালকাটা ছাপ্পার বাইরে থেকে একটা কাব্যশৈলী যারা আবিষ্কার করতে চাই, কিছুটা ফায়দা নিশ্চয় পাবো।

সঙ্গে এইটাও বলে রাখি যে উনার কবিতা ‘কালি ও কলম’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যাগুলায় ছাপা হতো, পত্রিকার আর্কাইভে ঘেঁটে সেসব দেখে নেয়া যায় চাইলেই। তাছাড়া ‘বাছবিচার’ সাইটে বেশ-কয়েকটা কবিতা পড়া যায় যেগুলা এই সংক্ষিপ্ত সংকলনের সম্পূরক হিশেবে গণ্য হতে পারে, সেই লিঙ্কটা আগায়া দিচ্ছি :  ‘বই: বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের কবিতা সংগ্রহ’ / বাছবিচার

ও আচ্ছা, আরেকটা কথা জানানো দরকার যে এই টেক্সটগুলা যেসব পত্রিকা থেকে নেয়া হয়েছে সেসবের বানান অবিকল ওইভাবেই রাখা হয়েছে, এবং যথাসাধ্য পঙক্তিগুলার বিন্যাসও।


সংকলন ও সম্পাদনা : জাহেদ আহমদ


আমার পৃথিবীতে
আমার পৃথিবীতে বীর নেই
আছে, সাধারণ মানুষ

যারা বড়ো কষ্টের মধ্যে বেঁচে থাকে
যাদের গতকাল নেই আগামীকালও নেই
আছে কেবল বেঁচে থাকার নান্দনিকতা।

এই নান্দনিকতা সরল
হাতে বানানো সাজসরঞ্জাম যেমন সরল
যেমন সরল ধানকুড়ানি হাত
যেমন সরল পৌষের সন্ধ্যায় চুলার আগুনের পাশে বসে থাকা।

এই পৃথিবীর ভেতর আমি বেড়ে উঠেছি
এই পৃথিবী ৪৩-এর দুর্ভিক্ষ দেখেছে
ব্রিটিশদের শাসন দেখেছে
এই পৃথিবী ৭১-এর যুদ্ধ দেখেছে
পাকিস্তানী ও জামাতীদের হত্যা দেখেছে।

আমার পৃথিবীতে আমরাই আছি
আমরা সাধারণ মানুষ।

জীবনযাপন টিকিয়ে রাখতে গিয়ে
আমরা লড়াই করেছি গতকাল
আগামীকালও লড়াই করব
কেবল বেঁচে থাকার নান্দনিকতার জন্য।

বেঁচে থাকা এক নিষিদ্ধ ইশতেহার
গতকাল এবং আগামীকাল।

শৈলী ঈদসংখ্যা ১৪০৫/১৯৯৯
.
.

নদীর কথাটা
নদীর কথাটা বারবার কেন বলি
যে-নদীতে স্রোত নেই, যে-নদী মরে গেছে

আমারও মতো নদীটারও কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই

যে-নদীতে স্রোত নেই তার কথা ভাবি

আমাকে তুমি ভবঘুরে করে দিয়েছ
তোমাকে সবকিছু দিয়ে ফতুর হয়ে গিয়েছি

নদীতে স্রোত নেই কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই
তুমি ঈশ্বরীর মতো বসে থাকো
আমি খুঁজি তোমার শরীর

বৃষ্টির ভারে বাদাম গাছটা ভরে গেছে
নদীতে যদি এবার স্রোত হয়
তোমার স্তনে হাত রেখে ভাবব

তোমাকে ভালোবাসি।

কালি ও কলম এপ্রিল ২০১১
.
.

তোমার শরীর
তোমার ঠোঁটের জন্য আমার তৃষ্ণা
তোমার বুকের জন্য আমার হাহাকার

তোমার শরীর আমাকেই গুছিয়ে দিতে হয়।

পুরাকালে যেমন হতো
পুরাকালে যেমন হতো :
তোমাকে আমার জন্য বিশেষভাবে রেখেছি

যুদ্ধে আমার জয় হয়েছে

একত্রে দুর্গ থেকে সূর্যাস্ত দেখি,
দেখি
পাহাড়গুলি তিনদিকে দৌড় দিচ্ছে।

.
.

ঈশ্বর নিজেই একা
ঈশ্বর নিজেই একা। ঈশ্বর চূড়ান্ত নিঃসঙ্গ।
আমি নিঃসঙ্গ ঈশ্বরকে ভালোবাসি।

(তিনটি কবিতা) কালি ও কলম, দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৩
.
.

আমরা কেউ জানি না
তুমি ঘুম থেকে ওঠো কোন এক সকালে। ভাবো
তোমার বয়স বেড়ে গেছে। ভাবো সকল পুরানো অর্থ
বদলে গেছে। বদলে যাওয়া মানে তোমার ঘুম থেকে
ওঠার সময় হয়েছে।

এই বাড়িতে কেউ আমরা কারো নই।
আমি আমার স্ত্রীর নই। আমি আমার ছেলের নই।
আমরা একসঙ্গে থাকি। দূরের গাছপালা কারো নয়।
দূরের পাখিগুলো কারো নয়। তবু সবকিছু শান্ত।
দূর সবুজ। আকাশ নীল এবং ঠান্ডা।

কে জানে, কেউ কি জানে?

আমরা কেউ জানি না। ঈশ্বরও জানেন না।

.
.

আমরা একসঙ্গে থাকি
আমি আমার স্ত্রী আমার ছেলে
গাছপালা পাখি। পরস্পরের নিয়ম বুঝে কিংবা না বুঝে।

কতোদিন স্বপ্নে দেখেছি তোমাকে
তোমার পা দুটি বাঁশি বাজায়
ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখি তোমাকে, আমার স্ত্রী

সব শান্ত, তার মধ্যে ঝড়
সব সবুজ, তার মধ্যে প্রেত
সব নীল, তার মধ্যে পতন

কে জানে? কেউ কি জানে?
আমরা কেউ জানি না। ঈশ্বরও জানেন না।

কালি ও কলম, সেপ্টেম্বর ২০০৪
.
.

ঘুমভাঙা চোখে
যুদ্ধের সময় মেশিনগানের আওয়াজ শুনলে
ভাবতাম
যুদ্ধ কবে শেষ হবে,

এখন ভাবি আর একটা মুক্তিযুদ্ধ কবে শুরু হবে

ঘুমভাঙা চোখে আমি এসব ভাবি

তুমি আমার হাত টেনে নিয়ে বলো
আর যুদ্ধ নয়
আর উদ্বাস্তুর মিছিল নয়
সু চি-র মতো নিজ বাড়িতে অন্তরীণ নয়,

তুমি ঘুমভাঙা চোখে নিষ্ঠুর পৃথিবীটা আমাকে দেখাও।

কালি ও কলম, জুলাই ২০০৯
.
.

ঈশ্বর রায় স্থগিত করে রেখেছেন
ঈশ্বর এখান থেকে বিদায় নিয়েছেন

এখন এখানে নানা জাতের মানুষ
তাদের ভিতর দিয়ে
রোমান সৈন্যরা কুচকাওয়াজ করে চলেছে,

ক্রাইস্টকে হত্যা করেছে রোমান সৈন্যরা

হত্যার বিরুদ্ধে করার কিছু নেই
ইতিহাসের বই আমার হাত থেকে পড়ে যায়
আমার ঘুমঘুম চোখে
ফিরে ফিরে বাজে রোমান সৈন্যদের কুচকাওয়াজ,

আমার চোখের দিকে তাকিয়ে
তুমি বলো
হত্যার বিরুদ্ধে করার কী আছে
জানো তো
ঈশ্বর এখান থেকে বিদায় নিয়েছেন
তার জায়গায় কেউ আসেনি,
আমাদের চোখে বিষাদ
সৈন্যরা কুচকাওয়াজ করেই চলেছে
সর্বত্র আর্মি ক্যাম্প,
আমাদের চোখে ভয়।

হত্যার বিরুদ্ধে করার কিছু নেই
ভয়ার্ত চোখে ও অবাধ্য চোখে আমরা ইতিহাসের দিকে
.                             চেয়ে আছি
কনসাল জেনারেল ইতিহাসের বিচার করছে,

ইতিহাসের বিচারের বিরুদ্ধে
ক্রাইস্ট ভয়ার্ত চোখে ও অবাধ্য চোখে চেয়ে আছেন,
আর ঈশ্বর রায় স্থগিত করে রেখেছেন তিন হাজার বছর ধরে।

(কবিতা সংখ্যা) কালি ও কলম, অগাস্ট ২০০৮
.
.

আকাশে ডালপালা মেলে
রুশো বিষণ্ণ চোখে চেয়ে আছেন
কোথাও আনন্দ নেই
সবকিছুতে দুঃখ, সবকিছু নস্টালজিক, সবকিছুতে অপরাধ।

রুশোর চোখে সত্য নেই
.       উৎস নেই
রুশো বিষণ্ণ চোখে চেয়ে আছেন।

.       মৃত ঈশ্বর কি বেঁচে উঠছেন কোথাও

এই প্রশ্নের জবাব কে দেবে

একটা পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছে শীতের তীব্রতায়
আর একটা পাতা ঝরে যাবার আবেগ ঠেকিয়ে রাখছে
বাতাসের ভিতর,
মানুষ তো স্মৃতি : এসব দেখে আমি ভাবি
রুশোর চোখ বিষণ্ণ কেন।

সবকিছুতে দুঃখ আছে
.       সবকিছুতে নস্টালজিয়া আছে
.         সবকিছুতে অপরাধ আছে
.            মৃত ঈশ্বর কি বেঁচে উঠছেন কোথাও,

যখন আমি চুপচাপ নিজের সঙ্গে কথা বলি
একটা চিন্তা তৈরি হয়
আকাশ তরুর মতো,

আকাশে ডালপালা মেলে তরুটি উড়তে থাকে
শূন্য থেকে শূন্যে
ডালপালায় ছড়ানো দুঃখ, নস্টালজিয়া, অপরাধ

অপরাধ কার কাছে করেছি?
মৃত ঈশ্বর ছিন্নভিন্ন ভালোবাসার ভিতর কী করে
জেগে উঠবেন?

ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা কালি ও কলম, ফেব্রুয়ারি ২০০৯
.
.

যখন বাতাস ও পাথরের মধ্যে
যখন বাতাস ও পাথরের মধ্যে
বিদ্যুৎ চমকায়
সেখানে পাথর ও স্তব্ধতার মধ্যে
আমাকে খোঁজ করো

বেঁচে থাকা ছাড়া আমার কোনো বিকল্প নেই
আমি গতকালও বেঁচেছিলাম
আজও বেঁচে আছি
আগামীকালও বেঁচে থাকব

বিদ্যুৎ চমকাবে আমার তৈরি
বাতাস ও পাথরের মধ্যে
দরজা খুলে আমি পৃথিবীর দিকে
বেরিয়ে যাব

যে পৃথিবী স্তব্ধ
কিংবা আগুন
কিংবা আমার কবিতা

আমি ফিরে আসি বারবার
কবিতার ভিতর দিয়ে তোমার কাছে

তুমি তো স্তব্ধ নও
স্তব্ধতাও নও

তুমি বাতাসের মতো জীবন্ত
আমার হৃদয়,

দরজা খুলে আমি পৃথিবীর দিকে
আমার হৃদয়
নিয়ে বেরিয়ে যাই।

সপ্তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা কালি ও কলম ফেব্রুয়ারি ২০১০
.
. 

এত ঐশ্বর্য কেন
তোমার দুই স্তনের সীমামেত্ম এতো ঐশ্বর্য কেন
আমি দেখি আর ভাবি
বিধাতা এত ঐশ্বর্য কেন দিয়েছেন,

এক সময় ভাবতাম আঠারো হচ্ছে মহাকাব্য
এখন নব্বুইতে পৌঁছে ভাবি
মহাকাব্য কোনো কাজে লাগে না,

আমি যত মহাকাব্যের কথা ভাবি
নিজেকে ঘৃণা করি
আমি ভাষা ভুলে যাচ্ছি শব্দ ভুলে যাচ্ছি
দুই স্তনের সীমান্ত ভুলে যাচ্ছি

তোমার চারপাশে তারকাঁটার বেড়া
আমি নিরাপদ নই

আমার থাকবার জায়গা হচ্ছে কবরের মাটি,

এই হচ্ছে শেষ ঐশ্বর্য।

কালি ও কলম, ফেব্রুয়ারি ২০১৯
.
.

ওঠো, আমার নাওয়ে ওঠো
ওঠো, আমার নাওয়ে ওঠো
আমরা অনেকদূর যাব
পদ্মা পেরিয়ে মেঘনা পেরিয়ে।

সারারাত নাওয়ে বাতি জ্বলবে
ঝড় এলে বাদাম নামিয়ে দেবো
তুমি আমার পাশে গুটিসুটি হয়ে বসে থাকবে
আর মাটির চুলায় ভাত বসিয়ে দেবে।

ওঠো, আমার নাওয়ে ওঠো
আমরা অনেকদূর যাব
অনেক অনেক নদী পেরিয়ে ছোটবড়ো নদী পেরিয়ে
তোমার গলা জড়িয়ে আমরা ঝড় দেখব
তোমার কাঁথা গায়ে জড়িয়ে আমরা নকশীকাঁথা বুনব।

ভালোবাসার নকশীকাঁথা তুমি আমাকে উপহার দেবে
আর
আমি তোমাকে উপহার দেবো নিঝুম দ্বীপের শাড়ি।

ওঠো, আমার নাওয়ে ওঠো,
আমাদের অনেকদূর বিশাল দূর পার হতে হবে।

.
.

এভাবেই গল্পের শুরু
এভাবেই গল্পের শুরু
যখন বাতাস স্পর্শ করো পানি স্পর্শ করো
তখন একসঙ্গে পাখিগুলি জেগে ওঠে।

দিনটা আস্তে আস্তে অন্ধকারের দিকে যায়
তারপর সন্ধ্যা তারপর রাত।
অন্ধকারের শিল্প যারা করেছেন তাদের অন্যতম রামব্রান্ট
আমি রামব্রান্টের কাজ ভাবতে ভাবতে তোমার কথা ভাবি।

এভাবেই শুরু হয় ভালোবাসার গল্প

গাংচিল সমুদ্রের দিকে উড়ে যায়
গাংচিল পাড়ের দিকে উড়ে যায়
সূর্যাস্ত জাহাজে করে সকল আলো তুলে নিয়ে যায়
আমি রামব্রান্টের মতো অন্ধকারে তোমার ভালোবাসা
খুঁজতে খুঁজতে জাহাজের পিছন পিছন যাই।

আমাদের হৃদয় কিছুতেই মূর্ত না
রামব্রান্ট অন্ধকারকে শিল্প করেছেন
আর আমরাও ভালোবাসাকে শিল্প করেছি।

এভাবেই শুরু হয় ভালোবাসা এভাবেই একসঙ্গে পাখিগুলি জেগে ওঠে

তুমি আমাকে ভালোবাসতে শুরু করো আমি তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করি
এভাবেই গল্পের শুরু। এভাবেই পাখির ডাকাডাকি।

… …

COMMENTS