মিনিং অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স

মিনিং অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স

চলো আজ কিনব স্বাধীনতা / ঝরিয়ে অনেক চোখের জল …
স্বাধীনতার একটা ভালো অর্থ বুঝতে পেরেছিলাম কবেকার সেই উনিশশ’ অতীত কোনো সালে, একেবারে আচমকা এক দুপুরে, সেই ঘটনাটি স্টিফেন্ হকিং মশাই কৃষ্ণবিবর আবিষ্কারের বছরেই চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে। প্র্যাক্টিক্যালি ইন্সিডেন্টটা আজও মরিয়া যায় নাই, থিয়োরি স্পিকিং, নিখিল মহাস্পেসে একা একা ভাসিয়া বেড়াইতিসে। এবং নাকি চিরদিনই তিনি নীরবতাপারাবারে সাঁতরাইতেই থাকিবেন। পঞ্চভূতে বিলীন হইবার বাংলা ফ্রেজটাকে চ্যালেঞ্জ করিয়া তার হেন মহাশূন্যসামুদ্রিক স্যুইমিং চলিতেই থাকুক, আমাদের অন্য অ্যাজেন্ডা আছে, আমরা প্যারান্তরে যাই এইক্ষণে।
.

চলো আজ পরীক্ষা শেষ আমার / চলো শেষ আমার ফলাফল …
গত শতাব্দীতে, না, গত শতাব্দীতে না, ভালো হয় এভাবে বললে যে গত সহস্রাব্দে, আমি ইশকুলে যেতাম জগতের সমস্ত দুঃখ বহন করে দুইকাঁধে শ্রমণ গৌতমের সাধনা স্মরণ করতে করতে। সেই দীর্ণ অনিচ্ছেগুলোকে এখন কত উজ্জ্বলতর বহুরঙিন মনে হয় যে সেসব প্রকাশের সাধ্য রপ্ত করছি রোজ। বোর্ডে শেখানো সমাস, কারক, প্রত্যয়, বিভক্তি ও সন্ধির নিয়মাবলি শিখতে যেয়ে পাঁজরের হাড্ডি ভাঙার পূর্বক্ষণে একদিন চোখের সামনে দেখেছিলাম বোধিবৃক্ষ এবং খোদ বুদ্ধকে। সেই অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা কাউকে বলি নাই পাবনাপ্রেরণজনিত ভয়ে। অ্যানিওয়ে। এহেন অভিজ্ঞতা আরও অনেকেরও হয়েছে, একলা আমারই বিস্তর অভিজ্ঞতা আর গিয়ানবুদ্ধি মজুত রয়েছে এমনটা ভাবার মতো বুদ্ধিবৃত্তিনৃত্য অনুশীলনের সিলেবাস আমার হাতে আসে নাই, সেকালে আমরা বেবাকেই ইশকুলে একসঙ্গে যেতায়াত করেছি কিছুদিন। ছুটি পেতাম সে-সময়, একদিন, স্বাধীনতাদিবসের ছুটি। দিবসে তখনও মনের হরষে মোমের বাতি প্রজ্জ্বলনের উন্নত চৈতন্য উদয় হয় নাই আমাদের মধ্যে। অনুষ্ঠান হতো, পাড়ায় পাড়ায়, মনোজ্ঞ সংগীতের, চোঙা মাইকে, ম্যারাপ-বাঁধা গাছতলার মঞ্চে, এবং সারাদিন গমগম করত দুনিয়াটা মানুষের সত্যিকারের গানে। বেসুরো গলার সঙ্গে হার্মোনিয়্যমের হাঁপর-টানা আওয়াজের কারুণ্য সন্ধেবেলাটাকে মেটালিক মনখারাপে মেদুর ও মদির করে রাখত। প্রধানত প্রণয়েরই গান হতো সন্ধ্যার পরখনটায়। শাওনরাতে যদি স্মরণে আসে মোরে … ইত্যাদি।
.

আমার এই গিটারচিৎকার / কতদিন সইবে গুমট খাঁচা …
শামসুর রাহমান স্বাধীনতার শব্দার্থফর্দ তৈয়ার করেছিলেন একটা। লাম্বা ব্যাপার। আবৃত্তিকিন্নর ও অভিনয়কিন্নরীদিগের ব্যাপক পছন্দের ছিল গোটা তালিকাটা। স্বাধীনতা মানে হলো রবিঠাকুরের অজর কবিতা আর অবিনাশী গান, নজরুলেরও চুলের বাবরি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু শুরুর দুই লাইনেই নাদান-নালায়েক সেই আমাদের বোঝা সারা হয়ে যেত স্বাধীনতা ব্যাপারটা স্পাইরাল্ এক বস্তু, জটিল, অনেক লম্বাচওড়া। ঠাকুরের উল্লেখ শুরুতেই থাকায় পিলে একেবারে চমকে যেয়ে চুপসে যেত। কম নয় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, ঠাকুরের তালগাছ  আর কাজীর সঙ্কল্প  আটলাইন সাকুল্যে মুখস্থ করতে যেয়ে ব্যক্তিগতভাবে এগারোখণ্ড দুপুর ব্যয় হয়েছিল, বঞ্চিত হয়েছিলাম এগারোটি দুপুরের বারান্দায় বোনেদের সঙ্গে ফুলগুটি খেলা থেকে। সেই দুঃখ জাগরূক অদ্যাবধি, নির্বাণসাধনার শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও। ফুলগুটিক্রীড়া আর কোনোদিন ফিরবে না জীবনে, ট্যাগোর-ইসলাম তো অমর। এদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে লাভ নাই, এরা আপনার পিছু ছাড়বেন বলে মনে হয় না।
.

জানোই তো আকাশপ্রেমিক আমি / আকাশকে স্পর্শ করতে বাঁচা …
তারপর, দ্যাখো, তোমার মালিক তোমারে একদিনের ছুটি একখানা দ্যায় বটে এখনও, তোমার মালকিন তোমারে তেপ্পান্ন গলির বাজারে পাঠায় ভেড়ার বুকের মাংশ কিনে আনতে। একটা আস্ত দুপুর লেগে যায় কসাইয়ের দুয়ারে ব্যাগের হাতল ঝুলিয়ে খাজুল মুখে তেষট্টি টাকা হ্রাসকৃত মূল্যে ভেড়ামাংশ পৌনেদুইকিলো খরিদের জন্য দরদস্তুর করতে করতে। ফেরার পরেও ভবতারিণীর মুখঝামটামালা থেকে নিস্তার নাই। বিটিভির স্ক্রিনে মেদস্ফীত মুহতারিমা সামিনা নবিজির ঝলমলে শাড়িবিলোড়িত সংগীতের আঁচল বাতাসে একটু উড়েছে কি উড়ে নাই হেন ক্ষণে উদিলা প্রাসাদশিখরে রাক্ষসপত্নী তিরিশবছর আগেকার পুরনো প্রেমিকার খোঁটা হাতে গজগজ মুখের অকথ্য খিস্তি নিয়ে। এককালে সামিনাকে ভালোবাসতাম, কুক্ষণে যে হেন সর্বনাশা সংবাদ অশ্লেষার রাক্ষুসীকে গেছিলাম দিতে, জিন্দেগি-বন্দেগি হেরপর থেকে খোঁটায়-খোঁটায় মুখঝামটায় তামা। সামিনাকে ভালো তো বাসিতাম বটে, এককালে, এখনও কি বাসিনে? সেইটে অবসরে ভাববার কথা। স্বাধীন অবসর কী ফিরিবে এ-জনমে?
.

চলো দিই অনেক পথের পাড়ি / ফেলে যাই অতীত এ-শহর / শহরেই মৃত্যু আসবে জানি / অবশ্য জীবন চেনার পর …
এপিগ্রাফে — প্যারাগ্র্যাফ প্রত্যেকের সঙ্গে সাঁটানো — ব্যবহৃত পঙক্তিগুলোর উৎস একটি ইন্ডিয়ান বাংলা গান, রূপম ইসলাম কর্তৃক সৃজিত, ফসিল্স্  ব্যান্ডের, ‘তোর ভরসাতে’ অ্যালবামে ব্যাপারটা পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৩ অব্দের ছাব্বিশে মার্চে এই নিবন্ধনকশাটি লিখিত ও সোশ্যাল মিডিয়ার পার্সোন্যাল পেইজে প্রচারিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বদেশ অভ্যুদয়ের অর্ধশতক উদযাপিত হচ্ছে বাংলাদেশে ২০২১ প্যান্ডেমিক ইয়ারে। এই নিবন্ধ সকল স্বাধীনতাকাঙ্ক্ষী বাংলাদেশিদের চিরসফলতা চায়। ইতি ভবদীয়।

জাহেদ আহমদ

… … 

COMMENTS

error: