সিনেভাষার সাতকাহন ২ || আহমদ মিনহাজ

সিনেভাষার সাতকাহন ২ || আহমদ মিনহাজ

‘আরূঢ় ভণিতা’ : সিনেভাষার সাতকাহন
গানপার-এ ‘সিনেভাষার সাতকাহন’ শিরোনামে ধারাবাহিক আলাপ জোড়ার পেছনে অধমের সিনেমা দেখার মৃতপ্রায় উৎসাহ পুনরায় জিন্দা হওয়ার দায় আগে স্বীকার যাইতে হয়। সেইসঙ্গে সাইট সঞ্চালকের ই-মেইল প্রেরিত উসকানি গোড়ায় কিঞ্চিৎ ধোঁয়া দিয়া যায়। জাতির বিনোদনতিয়াস মিটানোয় নিবেদিত সিনেমার ভালোমন্দ নিয়ে পাঠচর্চার খরা দেশে বিদ্যমান! — পুরাতন সত্যটি সঞ্চালকের মেইলভাষ্য পাঠের ক্ষণে মনে চাপ দিয়া বসে। সিনেভাষা সৃজনের যজ্ঞে মায়েস্ত্রো বা মহীয়ান নির্মাতাদের কামিয়াবি সম্পর্কে লেখার দায় এ-জীবনে মিটবার নয়। বিপরীতে এই কথাটাও সমান সত্য বটে, — চিরাচরিত ছকে বসে বানানো যেসব সিনেমা নিজ প্রসাদগুণে ব্যতিক্রমী সিনেভাষায় ঝিলিক দিয়া ওঠে তাদেরকে তাচ্ছিল্য করা বা পাশ কাটানো গোনাহর শামিল।

মহান নির্মাতার হাতে সৃষ্ট সিনেভাষার শৈল্পিক অপূর্বতার ভক্ত সংখ্যালঘু দর্শক আর সংখ্যায় গুরুভার আমজনতাকে বিনোদন দানের উদ্দেশ্যে নির্মিত সিনেমার হালচাল নিয়ে ভাবতে বসে থট এক্সপেরিমেন্ট ট্রলিকাণ্ড মনে তাই উঁকি দিয়া যায়। ঘটনায় প্রকাশ, হাত-পা বান্ধা পাঁচজন মানুষকে ট্রলির লাইন বরাবর শুইয়ে রাখা হয়েছিল। মানুষগুলাকে বাঁচাতে ট্রলি থামানো ছাড়া চালকের উপায় নাই। সমস্যা হইল বদ কিসিমের এক লোক ট্রলিটা তৈরি করেছে। চলমান যন্ত্রযান থামানোর উপায় সেখানে রাখে নাই। হাতের নাগালে একখানা সুইচ সেতুর ওপর ফিট করে দায় সেরেছে। সুইচে চাপ দিয়া ট্রলি থামানো সম্ভব কিন্তু সেজন্য ট্র্যাকের প্রায় অর্ধেক রাস্তা চালকের যাওয়া লাগে। সে অবশ্য অর্ধেকের কাছাকাছি চলে এসেছে আর সুইচখানাও হাতের নাগাল ছুঁইছুঁই। সুইচ টিপে পাশের ট্র্যাকে ট্রলি নিতে পারলে মানুষগুলাকে বাঁচানো সম্ভব। ট্র্যাকের শেষ মাথায় পৌঁছে ট্রলি নিজ থেকে থেমে যাবে, যেহেতু কারিগরের পরিকল্পনায় এভাবে সব সেট করা ছিল।

পাশের ট্র্যাকে যাওয়া চালকের জন্য ব্যাপার না হইলেও মোটু কিসিমের এক আদম সেখানে ঝামেলা পাকিয়েছে। সংকীর্ণ ট্র্যাকের ওপর থপথপ পা ফেলে সে হাঁটে! জায়গাটা সংকীর্ণ হওয়ায় ট্র্যাক থেকে নেমে ট্রলিকে সাইড দেওয়া তার পক্ষে নামুমকিন। মোটুর জান রক্ষায় পাশের ট্র্যাকে ট্রলি তোলার সুযোগ চালকের নাই। ওদিকে হাতে সময় অল্প। যা করার ঝটপট করতে হবে। সমষ্টির স্বার্থ ও মনোবাসনা মানবসংসারে অহরহ যেসব উপযোগ পয়দা করে যায় তার সুরক্ষায় ব্যষ্টিস্বার্থের প্রয়োজন হইতে সৃষ্ট উপযোগকে বলি দেওয়া নীতিসংগত, অন্যথায় ভবে সুবিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না; — আংরেজ ভাবুক জেরেমি বেন্থামের কথায় সায় দিয়ে মোটুর ওপর ট্রলি উঠানোর ভাবনা প্রাগুক্ত সিনারিতে সকলের আগে মনে আসে। মোটুকে বলির পাঁঠা বানানোর সিদ্ধান্ত চালক তাই নিয়াছিল। এখন সিঙ্গেল হওয়ার দোষে লোকটাকে মেরে ফেলা ঠিক হবে কি না সেই ভাবনার পোকা তার মাথায় কামড় দিয়া বসে। বেচারা মনে-মনে ভাবে, — ‘সিঙ্গেল বলে কি লোকটার বাঁচার হক নাই? পাঁচজনের জান বাঁচাতে একজনকে খতম করা কি নৈতিক দোষে দুষ্ট নয়? আমি এখন ক্যামনে তার ওপর ট্রলি উঠাই!’

ট্রলিকাণ্ড নামের উপায় নাই গোলাম হোসেন টাইপের আজব সমস্যা যে-লোকের মাথায় প্রথম ভর করেছিল গালি ও চুমা দুটোই তার পাওনা বটে! তালগোলে প্যাঁচ খাওয়া দুনিয়ায় দিগদারির অন্ত নাই, সেখানে হুদাহুদি আরেকখান প্যাঁচ হাজির করার আকাম যে করে তার ওপর খাপ্পা হওয়া স্বাভাবিক। সমাজে নৈতিক উপযোগ কোন গজফিতা দিয়া পরিমাপ করা হবে এই প্রশ্ন সেখানে ওঠে বিধায় ট্রলিকাণ্ডকে খতরনাক ভাবা ছাড়া উপায় থাকে না। এক আদমের জানমাল বাঁচাতে আরেক আদমের বারোটা বাজানোর পন্থাকে লোকে সুনীতি নামে জগতে প্রচার করে কি না সেই সন্দেহ মনে খোঁচা দিয়া যায়! নীতিবিদ্যার এই প্রস্তাবনা মানুষকে ধাঁধায় রেখে নিশ্চিত হইতে চায় গরিষ্ঠের জান-মাল-ইজ্জত রক্ষার প্রয়োজনে লঘিষ্ঠকে বলি দিতে যারা সম্মত আছেন তারা এইবেলা হাত তোলেন!

ট্রলিকাণ্ডের ছুতো ধরেই ভাবি, — মায়েস্ত্রো বা কীর্তিমান নির্মাতার সিনেভাষাকে সংখ্যালঘু দর্শকের খোরাক গণ্য করে তার ওপর ট্রলি তুলে দেওয়া সমীচীন নয়। ওদিকে সংখ্যায় গুরুভার দর্শকের বিনোদন পিয়াস মিটানোয় নিবেদিত নির্মাণকে উপহাস বা ট্রলির নিচে তাকে পিষে মারার ভাবনাও হিটলারির সমতুল। বিস্তারে যাওয়ার আগে মনে-মনে তাই জপি, — দুই কুলমান রক্ষা করে সিনেভাষার আলোচনায় হাজির-নাজিরের ঘটনা চমৎকারা হইলেও আলোচক যেন উভয়সংকটে পতিত ট্রলিচালকের পরিণতি এইবেলা না ভোলে।

সঞ্চালকের মেইলভাষ্য আরেকটি কারণে মাথায় পেইন ওঠায়; — বঙ্গে সিনেভাষার হালত সম্পর্কে জাতিকে লেখা, বক্তিমা ইত্যাদি উপহার দানের বদৌলতে সিনে-আলোচক বা ক্রিটিকের খেতাব যাঁরা সগৌরবে বহন করেন তাঁদের খাসলত সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা মেইলে খানিক ব্যক্ত করেছিলেন। শৈল্পিক রসে অপূর্ব সিনেমার আলোচনায় বঙ্গদেশের আলোচকদের ভাবনা ও ভাষ্যে কত কিসিমের চালিয়াতি বিরাজ করে সে-ব্যাপারে অধমের ধারণা পোক্ত ছিল না। দুনিয়াজোড়া মহান নির্মাতাদের সিনেমা সৃজনের পদ্ধতি দেশে বসে যাঁরা পাঠ করেন ও জাতিকে সিনেভাষা কী বস্তু শেখান তার ষোলআনা নাকি কপিক্যাটে ভর দিয়া চলে! ঘটনাটি আগে খেয়াল হয় নাই! বাংলাদেশের সিনেমায় মারিংকাটিং নতুন ঘটনা না হইলেও সিনেবীক্ষণের আলোচনায় কপিক্যাটের আসর পীড়াদায়ক বটে। বিমারটা ধরায়া দিতে বুঝি রজার ইবার্টদের লেখাপত্রের তরজমা গানপার-এ মাঝেমধ্যে কেন আপ হয়? সিনে-আলোচকরা গানপার-র এই কাণ্ড নজর করেন কি না সে-সম্পর্কে সঞ্চালক কিছু ঝেড়ে কাশেন নাই। যদি করে থাকেন তবে চক্ষুলজ্জার খাতিরে এহেন কর্মে দু-আরা নিযুক্ত হওয়ার কথা নয়। অবশ্য যে-লোক নির্লজ্জ তাকে শোধরানো কঠিন।

এইসব চক্করে বক্ষ্যমাণ রচনা নিজের পূর্ব-সুস্থির গতিপথ থেকে ভিন্ন খাতে মোড় নেয় দেখে মনে-মনে পেরেশান হই। শিল্পভাবনায় অভিনব আর ওদিকে জনরুচির চাহিদা পূরণের মোক্ষম আয়ুধ…বিপরীত দুই স্রোতে নাও বেয়ে ঘাটে পৌঁছানোর ভাবনা মারহাবা পাওয়ার যোগ্য হইলেও পাঠকের গালিমন্দ থেকে নিজের পিঠ বাঁচানো আলোচকের পক্ষে দুষ্কর। সিনেভাষার আলোচনা এমনিতেও কৃমিকীট ঘাঁটার সমতুল কাজ! কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতার রস বুঝতে না পারায় জনৈক অধ্যাপক কাম আলোচককে (*তাঁর নাম আর এইবেলা না প্রকাশি) সমারূঢ় কবিতায় একহাত নিয়াছিলেন। কাব্য-সংবেদনের জায়গা থেকে চিন্তা করলে কবির ক্ষোভ অযৌক্তিক নয়। অন্যদিকে অর্বাচীন অধ্যাপকের পাঠ-স্বাধীনতাকে বিবেচনায় নিলে কবি সম্পর্কে তাঁর নেতিবাচক মনোভাবকে বেঠিক বলি কী করে!

উত্তম কবিতাও সমালোচকের পাল্লায় পড়ে অতিশয় বাজে বা ব্যর্থ গণ্য হইতে পারে; — এই মনোবেদনা সহে কবির তাঁকে উপেক্ষা যাওয়াই হয়ত সংগত ছিল। সৃষ্টিশীল কবিশিল্পীরা আলোচকের নিকট প্রায়শ যেমন আশা করেন আলোচক উল্টাপথে গমন করে সেখানে রসভঙ্গ ঘটান। দুই পক্ষের অহিনকুল সম্পর্কের ধারায় আজো তাই ছেদ ঘটে নাই। সৃজনকুশল শিল্পী নিজের কারুবাসনা সম্পর্কে দু-কথা শোনার আশায় মনে-মনে গুমরে মরলেও আলোচক-সমালোচক নামধারী দ্বিপদ জীবকে সুনজরে দেখেন এই নজির জগৎসংসারে বিশেষ সুলভ নয়। আলোচক, সমালোচক ও নিন্দুকের মাঝে তফাত অতীতে নগণ্য ছিল এবং আজো চিত্রনাট্য পাল্টায়নি। তিক্ত এই সত্য মনে সদা জাগরুক থাকায় ট্রলিকাণ্ডের দশায় পতিত লোকের ছবি মাথায় গুরুভার চেপে বসে। ‘সিনেভাষার সাতকাহন’ শিরোনামের ধারাবাহিক আলাপ-সালাপ অগত্যা নিন্দামন্দ ও গালিগালাজের ঝুঁকি সয়ে আগে বাড়ার কোশেশ করবে। যাই হোক, ভণিতা ছেড়ে এইবেলা বিস্তারে যাই।

বলিসিনেমা : নিকট ও সাম্প্রতিক : জনরা  ও বিবিধ আলাপ

মনে ছিল হায় জাপানি ইয়াকুজা ওরফে গ্যাংস্টা মুভির কাজ-কারবার নিয়ে দুছত্র লিখি। সামুরাই থেকে ইয়াকুজায় বিবর্তিত জাপানি সিনেভাষার রূপান্তর ফিরে দেখতে বসে ট্রলিকাণ্ড মনে কুটুশ করে কামড়ায় দেখে নিজেকে বেকুব বোধ হচ্ছিল। কুরোশাওয়ার বিখ্যাত রশোমন ইফেক্টের সঙ্গে জুড়ি বেঁধে সেইজুন সুজুকির খুনি প্রবৃত্তির কড়চাও দেখি সে-বেকুবির পালে খানিক হাওয়া দিয়া যায়! রশোমন শেষ কবে দেখেছি সে এখন ইয়াদ নাই। যতদূর মনে পড়ে সিডি-ডিভিডির যুগ চলে তখন। জিন্দাবাজারে লতিফ সেন্টারের দোতলায় সিডি-ডিভিডিতে ঠাসা দোকানগুলা সেই সময় বেশ জমজমাট ছিল। সিনেমা দেখা বা গান শোনার বাই চাপলে বন্ধুরা মিলে সেখানে ঢুঁ মারার নেশা মনকে তাড়া দিয়া যাইত। ভিসিআর প্রযুক্তির যুগ তখন মোটামুটি মরহুম বলা চলে। ভিসিআর সেট ও ভিসিডি ক্যাসেট ভাড়া দেওয়া দোকানগুলা ব্যবসার ধারা পাল্টে সিডি-ডিভিডি আর কম্পিউটারকে আপনা করে নিয়াছিল। দোকানের তাকে সাজানো বইয়ের মতো দেখতে ভিসিডি ক্যাসেট হটিয়ে শীর্ণ প্লাস্টিকের কভারবন্দি গোল চাকতির রাজ চলে তখন। নব্বইয়ের আদিঅন্ত জুড়ে প্রিয়জন মোস্তাক, কায়সার ও অবরে-সবরে লুৎফর ভাইয়ের সঙ্গে জোট বেঁধে হলে ছবি দেখার অভ্যাসে মরিচা ধরেছিল। সিনেমা হলে বাংলা-ইংরেজি ছবি চালানোর প্রথা আশির দশক অবধি নিজের দাপট ধরে রাখতে পেরেছিল বোধহয়। ভিসিআর প্রযুক্তির আগমন দর্শকের হলমুখী থাকার অভ্যাসে বড়ো বাধা হইতে পারে নাই। ঘরে বসে ছবি দেখার সুবিধা থাকায় প্রবল জনপ্রিয় হইলেও হলের আন্ধার কোঠায় বসে একা বা সপরিবারে সিনেমা যাপনের অভ্যাস মোটের ওপর তখনো টিকে ছিল। নব্বইকে অতিক্রমের দিনগুলায় সেখানে ভাটা শুরু হয় আর পরে তো হলগুলা রীতিমতো ধুঁকতে শুরু করে!

ষাট থেকে আশির কালপর্বে বাংলাদেশের সিনেভাষায় যে-লিগ্যাসি তৈরি হয় নব্বইয়ের দশকে সে আর বজায় থাকেনি। তার অতীত জেল্লায় তখন জং ধরেছে। সময়ের চোরাটানে বদলে যাওয়া সিনেভাষার লক্ষণ সঠিক পড়তে না পারার দোষে লোকের কাছে ঢাকাই ছবির আবেদন ফিকে হইতে থাকে। একঝাঁক নির্মাতা ও কলাকুশলীর বাহারে গড়া স্টারডম আগের চেহারায় আর কখনো ফেরত যাইতে পারে নাই। ঢাকাই সিনেমার প্রেরণা-উৎস হিন্দি বা বলিউড ওদিকে এই কালপর্বে গায়েগতরে হৃষ্টপুষ্ট হইতে শুরু করে। সত্যজিৎ রায় যাঁকে Best method actor বলে স্বীকৃতি দিয়াছিলেন সেই ট্রাজেডি কিং দিলীপ কুমারের সঙ্গী রাজ কাপুর, দেব আনন্দ, শাম্মী কাপুরদের যুগ অস্ত যাওয়ার ক্ষণে অমিতাভ বচ্চনের স্টারডম পুরুষ্ট হইতে আরম্ভ করেছিল। শশী কাপুর, রাজেশ খান্না, ধর্মেন্দ্র, বিনোদ খান্না বা তারো পরে ঋষি কাপুর, জিতেন্দ্র, জ্যাকি শ্রফ, মিঠুন চক্রবর্তীর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও সত্তর-আশি জুড়ে অমিতাভের প্রতিনায়কসুলভ (Anti Hero) এ্যাংরি ইমেজের জয়জয়কারের নিকট সবকিছু ম্লান মনে হইত। অবশিষ্টরা যেমন ধরা যাক সুপারস্টারের মহিমায় সিক্ত রাজেশ খান্না অথবা অমিতাভের সহনায়কের ভূমিকায় বেশ নিয়মিত বিনোদ খান্না ও লাভারবয় ঋষি কাপুর কিংবা ডিস্কো ড্যান্সার­ দিয়া ঝড় তোলা মিঠুন চক্রবর্তী এই আধিপত্যে হুমকি রূপে দেখা দিলেও তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করা সম্ভব হয় নাই। দিলীপ কুমারের মেথোডিক্যাল অ্যাক্টিংয়ের সমকক্ষ না হইতে পারেন কিন্তু দিলীপ-লিগ্যাসির গুরুভার বহনে অমিতাভ পিছু হটার পাত্র ছিলেন না।

অমিতাভ বচ্চনের এই ওয়ান ম্যান আর্মিতে বাঁক নেওয়ার ঘটনা দক্ষিণী সিনেমার রাজাধিরাজ রজনীকান্ত ও মোহনলালের সঙ্গে খানিক তুলনীয় হইতে পারে। সেইসঙ্গে স্মরণ রাখা দরকারি, হিন্দি সিনেমার রদ্দিমার্কা (*গণ্য ব্যতিক্রম বাদ দিলে।) কাহিনিচিত্রে বৈচিত্র্যের ঘাটতি ও নতুন জনরা বা ধারা সৃজনের পথে বলিউড শাহেনশাহর লোকপ্রিয় ইমেজ অন্যতম প্রতিবন্ধক ছিল। ওয়ান ম্যান আর্মির এই বলয় নব্বইয়ে এসে আর বজায় থাকেনি। একের জায়গায় অদ্য সেখানে তিন দেখা দিলেন। গত ত্রিশ বছর ধরে হিন্দি সিনেমার বাজারকে তিন খান মিলে টানলেও তাঁদের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের বাইরে অনিল কাপুর, সঞ্জয় দত্ত থেকে শুরু করে সানি দেওল, অক্ষয় কুমার, অজয় দেবগন, সাইফ আলী খান, হৃতিক রোশন, বিবেক ওবেরয়, অক্ষয় খান্না, অভিষেক বচ্চন, জন আব্রাহামের স্টারডম অতীত নায়কদের তুলনায় অধিক পোক্ত ছিল।

আশি ও নব্বইয়ের সন্ধিক্ষণ অতিক্রমের ক্ষণে ক্রমশ পরিচিত তারকার মধ্যে অক্ষয় খান্না ও অভিষেক বচ্চন চমৎকার অভিনয়শিল্পী হিসেবে বলিপাড়ায় পা রাখলেও হিন্দি সিনেমা তাঁদের প্রতিভাকে ব্যবহার করতে পারে নাই। রিফিউজি, যুবা বা মনমর্জিয়ার মতো ছবিকে খানিক ব্যতিক্রম ভাবলে নিজের অভিনয়ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ বক্স অফিসে অ-ধারাবাহিক অভিষেকের কপালে বিশেষ জোটে নাই। উপরন্তু পিতা অমিতাভের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার যুদ্ধে তাঁকে নাকাল হইতে হয়। ওদিকে সুভাষ ঘাইয়ের তাল বিনোদপুত্র অক্ষয় খান্নার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করলেও অনিল কাপুর, ঐশ্বরিয়া রায় এবং একমেবাদ্বিতীয়ম এ. আর. রাহমানের সংগীত-প্রতিভার বিস্ফোরণের তোড়ে বাকি সব গৌণ হয়ে পড়েছিল। নব্বই ও অনতি পরবর্তী দশক জুড়ে বলিউড শাসনে দড় তারকাদের তুলনায় গুলজার, জাভেদ আখতার বা সালমান খানের পিতা সেলিম খান বলিসিনেভাষার চিত্রনাট্য ও গীত-আয়োজনে প্রভাববিস্তারী ঘটনা ছিলেন। বম্বে টকিজ-র যুগে সাদত হাসান মান্টো বা ইসমত চুগতাই-র মতো বরেণ্য লেখক এই সিনেকারখানায় বিচরণ করেছেন। উনারা যে-ঐতিহ্য জন্ম দিয়াছিলেন গুলজার বা জাভেদ আখতার তার উত্তরাধিকার বটে। বিধু বিনোদ চোপড়ার 1942: অ্যা লাভ স্টোরি খুব সম্ভবত কিংবদন্তির সুরকার আর. ডি বর্মণের শেষ মাস্টারস্ট্রোক ছিল। জাভেদ আখতারের কথায় আর. ডি-র সুর এক লাড়কি কো দেখা তো এ্যায়সা লাগা  হিন্দি সিনেভাষায় রোমান্টিক গানের ধারায় অভাবনীয় আবেদন রাখলেও নতুনত্বের খরা ঢাকা দিতে যথেষ্ট ছিল না। তো এরকম সন্ধিক্ষণে এ. আর. রাহমানের আবির্ভাব বলিসিনেমার জন্য আশীর্বাদ মানতে হয়। গুলজার ও জাভেদ আখতারের গীত-আয়োজন সৃষ্টির পালে রাহমানের আবির্ভাব নতুন হাওয়া এনে দিয়াছিল।

কিংবদন্তির সুরকার যেমন পি নায়ার, আর. ডি. বর্মণ, কল্যাণজি-আনন্দজি, যতিন-ললিত বা লক্ষ্মীকান্ত-প্যায়ারেলাল জুটির কাতারে নিজের নাম সংযোজনে অস্কারজয়ী রাহমানকে অধিক অপেক্ষা করতে হয়নি। অক্ষয় খান্না অভিনীত তাল তার ব্যতিক্রম ছিল না। ইশক বিনা কিয়া মরনা ইয়ারো, তাল সে তাল মিলা বা রামতা যোগীর মতো গানের কলি রাহমানের সুর সংযোজনের কেরামতির গুণে তখন লোকের মুখে-মুখে ঘুরতে শুরু করেছে। মণি রত্নমের বম্বে, রোজা বা দিল সে-র সুর-যোজনায় রাহমান-সৃষ্ট ফিউশনের ধারা সুভাষ ঘাইয়ের তাল-এ পরিণত আকার নিয়াছিল। ওদিকে সরোজ খানের কোরিওগ্রাফি নৃত্যপটু ঐশ্বরিয়ার যৌনাবেদনকে জাগায়া তোলার কামে বাজিমাত ঘটায় আর ফ্লপ ছবির কুফা কাটিয়ে বিশ্বসুন্দরীর স্টারডম দুর্বার গতিতে আগাইতে শুরু করে। এইসব ঘোরচক্করে অক্ষয়ের সুঅভিনয় বলাবাহুল্য দর্শক আলাদা করে নজর করতে ব্যর্থ হয়। বর্ডার, নেকাব বা সেকশন-375-এ তাঁর অভিনয়ক্ষমতা প্রকাশ্য হইলেও দর্শক সেটা নজর করেছেন এই প্রত্যয় হয় না। শুরু হইতে আর্টহাউজ ফিল্মে স্বচ্ছন্দ রাহুল বসুর কপালে তবু গতানুগতিক সিনেমার বাইরে নির্মিত বাংলা-হিন্দি-দক্ষিণী ঘরানার ছবিতে নিজের অভিনয়ক্ষমতা প্রমাণের মওকা মিলেছিল, অক্ষয় বা অভিষেক বচ্চনকে সেদিক থেকে দুর্ভাগা মানতে হয়!

সে যা-ই হোক, প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক ভারতীয় সিনেকারখানার কাহিনিচিত্রে বৈচিত্র্য আনার ভাবনা নব্বইয়ে পা রাখার দিনক্ষণ থেকে গতি পাইতে থাকে। নতুন জনরার ছবি তৈরির ঝোঁক দশকের মধ্যপর্বে শিকড় ছাড়লেও পরবর্তী দুই দশকে হিন্দি সিনেভাষার চরিত্র নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল। গেল দেড়-দুই দশকের বলিসিনেমায় গল্পের সঙ্গে অভিনয়ে তাই বৈচিত্র্যের বাহার চোখে পড়ে। সিনেমাটোগ্রাফির পালাবদল অতীতের তুলনায় দুর্বার মানতে হয়। নায়ক-নায়িকার লোকপ্রিয় ইমেজকে তছনছ করে নতুন ইমেজ তৈয়ারের ঘটনায় পরিচালকদের ডরভয় কমে আসা সুলক্ষণ বটে। নেতিবাচক চরিত্রে স্টারদের কাস্টিং আর পার্শ্ব অভিনয়শিল্পীর (*যেমন ধরা যাক নানা পাটেকর, পরেশ রাওয়াল, ইরফান খান বা নওয়াজুদ্দীন সিদ্দিকী।) পৃথক স্টারডম তৈরি হওয়ার ঘটনাও স্মরণ করতে হয়। নায়ক-নায়িকা প্রধান গল্পের ধারাকে উহ্য করে অমিতাভের মতো সিনিয়র আর্টিস্টকে প্রধান চরিত্র করে তোলার ভাবনায় গমন ছবির গল্প বা চিত্রনাট্যে নতুনত্বের চল বাড়িয়েছে। অমিতাভ তাঁর স্বর্ণযুগে যেসব রোল করতে পারেন নাই এখন সেই স্পেস তৈরি হওয়ার কারণে তাঁর অভিনয় ক্ষমতা নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।

ওদিকে ক্যাবারে নৃত্যে আটক দৃশ্যায়নের ধারা থেকে আইটেম সংয়ে উত্তরণ ও নাচাগানায় নায়ক-নায়িকাকে ঘাড় ধরে নামানো বা তাদের তারকাখ্যাতিকে ম্যানিপুলেট করার প্রভাবে হিন্দি সিনেমার ভাষা অতীতবৃত্তে আর দাঁড়ায়া নাই। দক্ষিণী অর্থাৎ তামিল-তেলুগু-কন্নড়-মালায়ালাম (*এমনকি প্যারালাল সিনেমা আন্দোলনের প্রেরণায় গড়ে ওঠা শক্ত পাটাতনে ছবি বানাতে বরাবর স্বচ্ছন্দ ও সফল কলকাতার সিনেমায় আমাজন অভিযান, চাঁদের পাহাড় বা নবাব-র মতো বাণিজ্যসফল ছবির জন্ম।) ছবির দাপটে অদ্য তাকে কোণঠাসা ও রিমেক নির্ভর মনে হইলেও বলিকারখানায় বিচিত্র সিনেভাষার তরঙ্গে রিমেকের অভিঘাত একচ্ছত্র ঘটনা নয়। ব্যবসা টানতে রিমেকে ব্যাপক হইলেও গেল দুই দশক ধরে বিচিত্র ধারার সিনেভাষায় গমনের ঘটনাকে বরং বলিসিনেমার কামিয়াবি গণ্য করা উচিত।

The Financial Express-র খতিয়ান অনুসারে বক্স অফিসে ভারতের আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত সিনেমার অবদান ৪৭ শতাংশের অধিক। ওদিকে গেল এক-দেড় দশকে দৃশ্যম, পুলিমুরুগান, বাহুবলি, টু পয়েন্ট জিরো, এনথিরান, কাবালি, অর্জুন রেড্ডি-র মতো একের-পর-এক ব্যবসাসফল ছবির জন্ম দিতে ব্যর্থ বলিউড বিচিত্র অঙ্গের সিনেমা তৈরির পণ থেকে পিছু হটে নাই। বক্স অফিসে তার ৪০ শতাংশ কাটতি মোটের ওপর ওইসব অপেক্ষাকৃত কম বাজেটে তৈরি ছবির বদৌলতে ঘটিয়া থাকে। এতে প্রমাণ হয় মেগাস্টার নির্ভর কাস্টিংয়ের পুরানা অভ্যাস থেকে কারখানাটি ক্রমশ সরে আসার রাস্তা তালাশ করছে। ওটিটি প্লাটফর্মে বিচিত্র ধারার ছবি রিলিজের মাধ্যমে বাজিমাত করার সমীকরণকে ছবির পর্দায় ভাষা দেওয়ার আগ্রহ বলিউড টিনসেলে অতীতের তুলনায় দুর্বার বৈকি। স্বকীয়তায় ভরপুর সাইকো থ্রিলার, ফ্যান্টাসি আর মারপিটের কারিগরি ভাবনায় তরতাজা দক্ষিণী ছবির দাপটের কাছে এই ইন্ডাস্ট্রির পরাভূত হওয়ার নিদান যারা হাঁকেন তাদের বীক্ষণে সার্বিক দৃশ্যপট বোধহয় ধরা দিয়া যায় না। হইতে পারে, বিচিত্র জনরায় সওয়ার বলিসিনেমার ইতিবাচক পালাবদলকে অতিকায় সিনেকারখানার বাণিজ্যসাফল্যের জায়গা থেকে লক্ষ্যভেদী ঘটনা রূপে তাঁরা আজো মানতে নারাজ।

বলিসিনেমার হালত সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের নেতিবাচক মনোভাব চোখে পড়লেও বিগত দুই দশকে সংঘটিত রূপান্তরকে অদূর ভবিষ্যতে ইতিবাচক ঘটনায় পাঠের সুযোগ সিনেকারখানাটি এখনো হারায় নাই। যুগান্তকারী কয়েকখানা ঘটনাকে এখানে তাই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, নায়ক-নায়িকার স্টারডমে ভর করে ছবি বানানোর ধারা গেল এক দশকের কালপর্বে হিন্দি সিনেজগতে একপ্রকার খতম হওয়ার পথে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বুঝি প্রধানচরিত্র বা প্রোটাগনিস্টের সংখ্যা এখন আর ছবিতে সুনির্দিষ্ট নেই! বজরঙ্গি ভাইজান-এ যেমন সালমান-কারিনা পর্দা জুড়ে বিচরণ করলেও শিশুশিল্পী হার্শালি মালহোত্রা ও নওয়াজুদ্দীন সিদ্দিকী সকল আলো কেড়ে নিয়াছেন বলে মনে হয়। মানবিক আবেদনে সমৃদ্ধ গল্পের সঙ্গে সালমান-কারিনা-হার্শালি-নওয়াজুদ্দীনের চতুর্ভুজ রচনার শৈল্পিক কুশলতায় পরিচালক কবির খান স্টারডমের সনাতন প্রথাকে জখম দিয়া বসেন।

দ্বিতীয় লক্ষণীয় বিষয় বোধহয় জনরার বৈচিত্র্য! প্রায় দেড় দশকের অধিক সময় ধরে বিচিত্র বিষয়বস্তু নিয়ে কাহিনিচিত্র ফাঁদার চল বাড়ায় দক্ষিণী ধাঁচের লার্জার দ্যান লাইফ (*দাবাং খ্যাত সালমান খানের স্টারডম এখনো যাকে খুঁটি ধরে টিকে আছে।) সিনেমার সমীকরণ থেকে বেরিয়ে সৃজনশীল গল্পভাবনা আর বাজেটের গুরুভার লাঘবে সক্ষম ছবি বানানোর প্রবণতা বলিসিনেমায় ব্যাপকতা পেয়েছে। তথাকথিত মুক্ত চলচ্চিত্র-র (Independent Film) তকমা বহনকারী মকবুল, গ্যাংস অব ওয়াসেপুর, দেব-ডি, বর্ফি, রাজি, আর্টিকেল-15, মুল্ক, এনএইচ10, বেরেলি কি বর্ফি, চিচোড়ি, তনু ওয়েডস মনু, জাজমেন্টাল হ্যায় কিয়া, গাল্লি বয়-র মতো ছবিগুলা খান ভাইজানদের কাস্টিংয়ে তৈরি বিগ বাজেটের নাভিশ্বাস চাপে ধরা না দিলেও ব্যবসা তুলে অনতে ব্যর্থ হয় নাই। অন্যদিকে সঞ্জয় দত্তের বায়োপিক সঞ্জু-র মতো বড়ো বাজেটের ছবিও সেখানে তৈরি হয় বটে। সঞ্জুবাবা এমন একখান ক্যারেক্টার যাকে নিয়ে গল্পটা ঠিকমতো ফাঁদতে পারলে ব্যবসায় লস খাওয়ার ঝুঁকি থাকে না। গল্পভাবনায় নতুনত্বের সঙ্গে রনবীর কাপুরের চরিত্রানুগ অভিনয়ের গুণে রাজকুমার হিরানীর ছবিখানা হলে দেদার কাটতে গাড্ডায় পড়ে নাই।

বলিউড সিনেমায় এই ধারার সংযোজন নতুন তারকা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে এখন। খান ভাইজানদের পিছনে ফেলে রণবীর কাপুর, রণবীর সিং, আয়ুষ্মান খোরানা, রাজকুমার, আনুশকা শর্মা, আলিয়া ভাট, কঙ্গনা রানাউত, কৃতি সেনন, তাপসী পান্নুদের উত্থান মূলত সে-কারণে। অন্যদিকে পুরাতন তারকার নবআঙ্গিকে জীবনলাভ সিনেভাষার প্রচল অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার কারণে সহজ হইতে পেরেছে। খিলাড়ি খ্যাত অক্ষয় কুমারের জংধরা ক্যারিয়ারের পুনরুত্থান সাম্প্রতিক সময়ের স্মরণীয় ঘটনা হয়েই থাকবে। টয়লেট : এক প্রেম কথা, প্যাড ম্যান বা মিশন মঙ্গল (*গল্প-ভাবনায় বিশেষত্ব থাকলেও সায়েন্স ফিকশন ঘারানার ছবি হিসেবে ধর্তব্যের কাতারে পড়ে না।) এবং এরকম একাধিক ছবি তাঁর ক্যারিয়ারে নতুনত্ব নিয়ে আসার সঙ্গে সেই স্পেস এনে দিয়াছে যা নিজের স্ট্রাগলের দিনকালে তাঁর জন্য সুলভ ছিল না। এইট ইন্টু টেন তাসভির-র মতো হলিউড ধাঁচে বোনা ব্যতিক্রম কাহানি অক্ষয়ের পড়ন্ত ক্যারিয়ারকে শূন্য দশকের অন্তে এসে তুলতে পারে নাই। সামাজিক বার্তা নির্ভর গোল্ড, প্যাড ম্যান বা টয়লেট সেখানে অভিনয়কুশলতা প্রমাণের সঙ্গে বক্স অফিসে কামিয়াবির সুযোগ তাঁকে দিয়াছে। অ্যাকশন ও কমেডি ঘরানায় করে খাওয়া অক্ষয়ের স্টারডমকে নবঅঙ্গে রূপ দিতে পারার কারণে ছবিগুলা তাঁর ও বলিপাড়ায় ঘনীভূত ব্যবসায়কি মন্দা কাটানোর জন্য বিশেষ ঘটনা ছিল।

পুরুষনির্ভর স্টার কাস্টিংয়ের ভরসায় ব্যবসা উঠানোর ধারায় বিচ্ছেদের ঘটনা এইবেলা স্মরণ করতে হয়। বিদ্যা বালানের ডার্টি পিকচার-র মাধ্যমে ধারাটি বিশেষ গতি লাভ করে এবং তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নাই। দূর ও নিকট অতীতে নারীপ্রধান কাহিনিচিত্রে ভর করে বলিসিনেমা কথা বলে নাই এমন নয়। নার্গিস দত্তের মাদার ইন্ডিয়া থেকে নব্বই অবধি লিস্টি স্মরণ করলে নারীপ্রধান ছবি গুনতিতে কম হয় না। তথাপি মি. ইন্ডিয়া, চাঁদনী, চালবাজ, লামহে খ্যাত শ্রীদেবীর অবিস্মরণীয় একক উত্থানকে ব্যতিক্রম ধরলে ডার্টি পিকচার-র আগে অবধি এই ঘটনা বোধহয় ঘটে নাই যেখানে কেন্দ্রীয় নারীচরিত্র পর্দা-স্বকীয়তার গুণে দর্শকচেতনায় আবেদন বহানোর সঙ্গে বক্স অফিসকে একলা টানতে পেরেছিল।

মধুবালা, বৈজয়ন্তীমালার যুগ হইতে ওয়াহিদা রহমান, রেখা, হেমামালিনী অবধি বিস্তৃত স্টারডমে দর্শকচিত্ত হরণে অনন্য নায়িকারা একে-একে দেখা দিলেও ডার্টি পিকচার-র জামানায় পা রাখার ক্ষণে গল্পের পুরাতন ছকে খানিক রদবদল নায়িকানির্ভর ছবির সাহায্যে হলে ঝড় বহাইতে সফল হয়। আশির গোড়ায় নির্মিত উমরাও জান মেধাবী নির্মিতির সঙ্গে নায়িকা রেখার চমকপ্রদ অভিনয় ও নৃত্যপটুতা সত্ত্বেও যে-সাফল্য হইতে বঞ্চিত হয় বিদ্যা বালানের যুগে সেটা ধরা দিয়াছিল। দক্ষিণী সিনেমার ক্যাবারে কুইন সিল্ক স্মিথার উত্থান আর চলচ্চিত্র জগতের আন্ধাইর অলিগলিতে সক্রিয় নোংরা রাজনীতির ভিয়েন মেশানো গল্প দিয়া সাজানো ছবিতে নাসিরুদ্দিন শাহ, ইমরান হাশমি ও তুষার কাপুরকে ছাপিয়ে বিদ্যাই অধিক সম্মোহন ছড়াইতে থাকেন।

সিল্ক স্মিথার চরিত্রে অভিনয়ের কারণে নিজের ওজন বাড়াইতে বিদ্যা বাধ্য ছিলেন, যা পরে হ্রাস করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় নাই। বলিসিনেমায় নায়িকার স্থূলতা নেতিবাচক ঘটনা হিসেবে বরাবর বিবেচিত হয়ে থাকে। বিদ্যাকে যারপরনাই মুটিয়ে যাওয়া ও নায়িকাসুলভ পোশাকে হাজির হওয়ার ঘটনায় খারাপ রুচির অধিকারী ইত্যাদি ট্রলের সম্মুখীন হইতে হয়। ট্রলে জেরবার নায়িকা বলিসিনেমার নির্মাতা ও দর্শককুলের বিচারকসুলভ মনোভাবকে একহাত দেখে নেওয়ার সিদ্ধান্তে উপনীত হন। তিনি ঠিক করেন, এখন হইতে লোকে তাঁর দেহকে যেভাবে দেখতে চায় সেভাবে নয় বরং নিজের দেহকে তিনি যে-অঙ্গে দেখাইতে আগ্রহী সেভাবে পর্দায় ভাষা দিয়া যাবেন। নিজের এই সংকল্পে বিদ্যাকে সফল বলা চলে। দক্ষিণী সিনেভাষার জগতে নায়িকার স্কিনি বা কারিনা টাইপ জিরো ফিগার পাবলিক খায় না। দর্শক সেখানে কঙ্কালসার বুইড়া নায়িকার পরিবর্তে স্বাস্থ্যবান (*ঢাকাই ছবির ন্যায় ধুমসী কিন্তু নয়।) নায়িকাকে পর্দায় দেখতেই বেশি ভালোবাসে। বলাবাহুল্য, দক্ষিণ হইতে আগত বিদ্যা তাঁর ক্যারিয়ারগ্রাফে নিজের দেহের স্বাস্থ্যবান পর্দা-উপস্থাপনায় অটল থাকেন ও সফল হন। বলিসিনেমায় গল্পের ধারা বদল এক্ষেত্রে তাঁর সহায় হয়েছিল তাতে সন্দেহ নাই। দক্ষিণ হইতে সেই সময় আগত রেখা গণেশন বা শ্রীদেবীর ভাগ্যে এই সুখ জোটে নাই। জনমনোরঞ্জক ধাঁচে নিজের দেহকে পর্দায় অবিরত ব্যবহৃত হইতে দিতে তাঁরা কার্যত বাধ্য ছিলেন। এই পর্দা-অভিযোজনের (Screen Adaptation) চাপে তাঁদের সহজাত অভিনয়ক্ষমতার অনেকখানি চাপা পড়ে গিয়াছিল।

যশ চোপড়ার লামহে ছবিতে মা ও মেয়ের দ্বৈত-চরিত্রে কিংবা বালু মহেন্দ্রর সদমা-য় স্মৃতিবৈকল্যের (Amensia) শিকার চরিত্রে শ্রীদেবীর অভিনয় দেখতে বসলে টের পাওয়া যায় হাওয়া হাওয়া-ই বা নাগিনকন্যা অথবা চালবাজ তাঁকে দর্শকের স্বপ্নের রানিতে পরিণত করলেও বলিসিনেমার নির্মাতারা তাঁর অভিনয়নৈপুণ্য নিয়ে বিশেষ ভাবনা করেননি। ছবির কাটতি যারা পরিমাপ করেন তাদের বিচারে লামহে বৈদেশে সফল হলেও ভারতে ঝড় তুলতে পারেনি। কারণটা অনুমেয়, দর্শক শ্রীদেবীকে সদা সেই অঙ্গে দেখতে আকুল ছিল যেখানে শাড়ি পরিহিত নায়িকা তাঁর অতুল চাহনি ও নৃত্যপটুতার গুণে পর্দায় সুতীব্র যৌনআবেদন সৃষ্টি করান। আশির দশকের সিনেভাষায় শাড়ি ও শ্রীদেবী অবিচ্ছেদ্য মেটাফোরে রূপ নিয়াছিলেন। মধুবালার চিরন্তন ধ্রুপদী সৌন্দর্য নির্দিষ্ট ড্রেসকোডে সীমাবদ্ধ না থাকলেও মুসলমান রমণীর সহজাত পরিচ্ছেদ সালওয়ার-কামিজ আর চুড়িদারেই তিনি অধিক আবেদনবহ ছিলেন। হেমামালিনী থেকে মাধুরী অবধি রাজস্থানী ঘাগরা অকাট্য ট্রেডমার্ক রূপে দর্শকচিত্তে শিহরন জাগানোয় কামে দিয়াছিল। জিনাত আমান বা নিতু সিং সত্তরের বেলবটম বা ট্রাউজার্সে চমৎকারা ছিলেন। শক্তি সামন্তের অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস ছবিতে শর্মিলা ঠাকুর সম্ভবত প্রথম বিকিনি পরিহিত দৃশ্যে আবির্ভূত হয়ে পর্দায় ঝড় তোলেন। পারভীন ববি, ডিম্পল কাপাডিয়া বা উর্মিলারা পরে বিকিনিকন্যা রূপে পর্দায় ব্যবহৃত হইতে থাকেন।

ড্রেসকোডের এইসব সিনেভাষায় নায়িকাদেহকে জব্দ রাখার ছক থেকে মুক্ত হইতে বলিসিনেমাকে নয়ের অন্ত পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয়। যারপরনাই লাল ও ফিনফিনে শাড়িতে আটক শ্রীদেবী নিজের অভিনয় সক্ষমতার প্রমাণ রাখলেও সিনেপর্দায় ফ্যান্টাসিঘন বাস্তবাতীত আবেদন বহানোর দাবির কাছে মাথা নত করতে বাধ্য ছিলেন। শাড়িতে যৌনাবেদন সৃষ্টির জোয়ারে লামহে বা সদমাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ভারতীয় দর্শক বিশেষ ভাবে নাই। বলা যায় দর্শক তখনো ছবির গল্পকে প্রাধান্য দিতে পুরোদস্তুর তৈরি ও পরিণত ছিল না। রেখার উমরাও জান-র ঘটনাও তদ্রূপ। সময়ের সঙ্গে কাল্ট ক্লাসিকে পরিণত মোজাফফর আলীর আর্টহাউজ ঘরানার ছবিখানা ঐশ্বরিয়া রায়ের কাস্টিংয়ে পরে রিমেক ও ব্যবসাসফল হইলেও মূল ছবির আবেদনকে অতিক্রম করা সম্ভব হয় নাই। ছবির ঘটনাপ্রবাহ জুড়ে রেখার অভিনয়পটুতার সঙ্গে ইন আঁখি কো মাস্তি কে মাস্তানে হাজারো হ্যায় গানের দৃশ্যায়নে দেহমুদ্রার সম্মোহন আজো মনে আবেদন বহায়। সে-তুলনায় ঐশ্বরিয়া খানিক পানসে ছিলেন।

প্রেমকাহানি, অ্যাকশন বা কমেডি ধাঁচের ছবির ক্ষেত্রে ধরাবাঁধা ছক থেকে বেরিয়ে আসার প্রেরণায় লগান, মুন্না ভাই এমবিবিএস বা ডার্টি পিকচার টাইপের ছবিগুলার অবদান তাই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় যুগান্তকারী মানতে হয়। বাণিজ্যসফল ছবির তুরুপের তাস গণ্য পরিচালক যশ রাজ চোপড়া, সুভাষ ঘাই, বিধু বিনোদ চোপড়া, রাজকুমার সন্তোষী, মহেশ ভাট, সুরজ বার্জাতিয়া, সঞ্জয় লীলা বনসালী, ডেভিড ধবন প্রমুখের হাতে বানানো ছবির সঙ্গে এইসব ছবির মাত্রাগত পার্থক্য বলিসিনেমায় নতুন ধারার কাহিনিচিত্র সৃষ্টিতে প্রেরণা দিয়াছিল। সুধীর মিশ্র, রাজকুমার হিরানী, বিশাল ভরদ্বাজ, রাম গোপাল ভার্মা, অনুরাগ বসু, নিতেশ তিওয়ারি, নবদীপ সিং, ফারহান আখতার, দিবাকর ব্যানার্জি, অনুরাগ কাশ্যপ প্রমুখের সিনেভাষা সৃজনের পদ্ধতি বা বক্স অফিসে ছবি হিট করানোর ভাবনার সঙ্গে প্রাগুক্তদের ভাবনার ভিন্নতা ইদানিং সহজে চোখে পড়ে।

তফাতটা বোঝার খাতিরে নারীপ্রধান কাহিনিছকে ছবি বানাতে ওস্তাদ সঞ্জয় লীলা বনসালীর নামখানাকে উদাহরণ হিসেবে প্রাসঙ্গিক করা যাইতে পারে। তাঁর সকল ছবি মোটের ওপর নারীকেন্দ্রিক টোন ক্যামেরায় ধরতে উন্মুখ থাকে। ব্ল্যাক, হাম দিল দে চুকে সনম, দেবদাস কিংবা পদ্মাবত-এ নারীকেন্দ্রিক গল্পের মোড়কে হাজিরা দিলেও বনসালীর ছবিতে নারীগণের ব্যক্তিত্ব পর্দায় কেন জানি প্রাণবন্ত হইতে চায় না! পরিচালকের মস্তিষ্ক হইতে জাত সবল পুরুষতন্ত্রের তাঁবে নিজ দেহমনের সাকিন তালাশে তাদের বেলা পার হয়। পুরুষ চরিত্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ঘটনায় প্রাণবন্ত হওয়ার পরিবর্তে পুরুষকারের ছায়াতলে রিক্ত হওয়ার নিয়তি এইসব নারীকে শাসন করে যায়। নব্বইয়ের অন্তে বানানো হাম দিল দে চুকে সনম আর ওদিকে করণ জোহরের কুছ কুছ হোতা হ্যায়-র মাত্রাগত তফাত বোধহয় সেই সময় এভাবে অকাট্য রূপ নিয়াছিল। বক্স অফিস কাঁপানো ছবি দুখানায় দর্শকমনে আবেদন বহানোর প্রশ্নে উভয় নির্মাতার ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরীত্য চোখে লাগে। রানী, কাজল, শাহরুখ, সালমানের চতুর্ভুজে গঠিত করণ জোহরের প্রেমকাহানির পর্দাভাষ্যে যে-ভারসাম্য সেটা বনসালীর ছবিতে মিসিং থাকার অনুভব দিয়া যায়।

করণের ছবিতে শান্ত-সুস্থির রানী আর টমবয় কাজলের সহজাত ব্যক্তিত্ব শাহরুখ ও সালমানের ছায়ায় নিঃস্ব হওয়ার অনুভূতিকে তীব্র হইতে বাধা দেয়। রানীর কারণে টমবয় কাজলের শাহরুখকে না পাওয়ার বেদনা ও পরে সালমানের বদান্যতায় তাকে ফিরে পাওয়ার প্রথানুগ কাহিনিছকে কাজলের ব্যক্তিত্বের দুটি লেয়ার দর্শকমনে অবিচ্ছেদ্য আকার নিতে থাকে। ছবির প্রথম ভাগে সে টমবয়ের প্রতীক; — ছটফটে, প্রাণবন্ত আর বহিমুর্খী। দ্বিতীয় ভাগে কাজলের টমবয় চরিত্রের আড়ালে বহমান অন্তর্মুখী স্বভাবের সঙ্গে দর্শক ঘনিষ্ট হয়। ছবির কাহিনিটানে কাজলের ব্যক্তিত্বের লেয়ারে সংগুপ্ত বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্ব কিন্তু তা-বলে ক্ষুন্ন হয় না। উভয় লেয়ারে যাওয়া-আসার মধ্য দিয়া সালমান ও শাহরুখের নিকট নিজের নারীত্বকে সে তুলে ধরে। ছবিতে রানীর অকালমৃত্যুর কারণে কাজলের জীবনে শাহরুখের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা পরিচালক জাগায়া তোলেন। কাজলের না পাওয়ার বেদনা রানীর অজানা ছিল না। বিপত্নীক শাহরুখের নিঃসঙ্গতা ঘোঁচাতে নিজের কন্যা সন্তানকে তাদের দুজনের মাঝে মিলন ঘটানোর কামে রানী নিয়োগ দিয়া যায়। দাদির সঙ্গে মিলে কন্যা ঘটকালির কামে নামে। তো এই সুবাদে শাহরুখকে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় দেখে তার মনে আবেদন জাগাইতে অকালমৃত রানীর স্বকীয়তাকে ধার করা অথবা রানীর আদলে নিজেকে পাল্টে ফেলার কথা কাজল কিন্তু ভুলেও ভাবে না। ছবির দ্বিতীয় ভাগের ঘটনাপ্রবাহে শাহরুখ বরং কাজলের ব্যক্তিত্বে বিরাজিত লেয়ারকে নতুন করে আবিষ্কার করে ও তার জন্য আতুর হয়।

মণি রত্নমের দিল সে কিংবা যশ চোপড়ার বীর-জারার মতো কুছ কুছ হোতা হ্যায় বলিসিনেমার অকাট্য মেলোড্রামাকে সঙ্গী করে যথারীতি আগুয়ান হইলেও ত্রিভুজ প্রেমের কাহানিতে নতুন ভাবনার দ্যোতক ছিল সেই সময়। বেদনার কাব্যিক নাটকীয়তার অন্তে পৌঁছে মিলনের সুর তুলতে পারঙ্গম পিতৃব্য যশ চোপড়ার প্রভাব করণ জোহরের ছবিতে ভালোই চোখে পড়ে। পিতৃব্যের ধারা মেনে নারীকে সহজ স্বকীয়তায় বিচরণের সুযোগ দিতে করণ তাই কঞ্জুসী করেন না। যশের এই এক গুণ, তাঁর অতিনাটকীয় চিত্রনাট্যের ছক চরিত্রের স্বাধীন গতিতে পারতপক্ষে আঘাত হানে না। ভাতিজা করণ এখানে যশের সাকরেদ। পুরুষাধিপত্যের ছায়ায় কাজলের নারীত্বকে ডমিনেট করার ঘটনা ছবিতে তাই বিশেষ চোখে পড়ে না। অন্যদিকে বনসালীর ছবি এছাড়া যেন কথা কইতে পারে না! মৈত্রেয়ী দেবীর ন হন্যতে-র ছায়ায় নির্মিত (*যদিও বনসালী সেটা স্বীকার করেন না।) হাম দিল দে চুকে সনম-এ নিজের নারী-স্বকীয়তায় পর্দাজুড়ে বিচরণের সুযোগ ঐশ্বরিয়ার কপালে লেখা ছিল না। বনসালী সেখানে যথারীতি ঘাপলা পাকান এবং নায়িকার পর্দা-স্বকীয়তাকে ভারতীয় জনমনের গভীরে প্রোথিত ভাবনাছকে টুইস্ট করতেই অধীর থাকেন। ছবির অন্তে পৌঁছে স্বামী অজয়ের কাছে ঐশ্বরিয়া ফেরত যায় আর ওদিকে সালমানকে ট্রাজিক হিরোর নিয়তিতে নিঃস্ব হইতে দেখা যায়।

ন হন্যতে-র সত্য-আখ্যানে মৈত্রেয়ী দেবী স্বামীর গুণকীর্তনে কৃপা করেননি। মির্চা এলিয়াদের সঙ্গে সদ্য-বিবাহিত স্ত্রীর সম্পর্কের ঘটনা অবগত হওয়ার পর তাঁদের দুজনকে মিলিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ তিনি নিয়াছিলেন। স্বামী এক্ষেত্রে উদার হইলেও মৈত্রেয়ীর মনে পুরানা প্রেমিকের সঙ্গে পুনর্মিলনের ইচ্ছা মৃতপ্রায় ছিল এবং সেটা মির্চার প্রতি ক্ষোভ ও অভিমানের কারণেও বটে। যে-পুরুষকে তিনি ভালোবাসেন তাকে পরে আর খুঁজে পান নাই। তাঁর মনে হয়েছিল মির্চা সেই মানুষ নহে যে একদিন তাঁর ভারতীয় নারীসত্তাকে পাঠ করার জন্য অধীর থাকত এবং পরে এই নারীসত্তার ওপর নিজের সন্দেহ, অবিশ্বাস ও ভ্রান্ত ধারণা আরোপ করতে দ্বিধায় ভোগে নাই। মির্চার বেস্ট সেলার লা ন্যুই বেঙ্গলী মৈত্রেয়ীকে সংক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। মানে অবশ্য এই নয় মির্চার প্রতি তাঁর ভালোবাসা নিভে গিয়াছিল অথবা স্বামীর প্রযত্ন, উদারতা আর সহিষ্ণুতার সম্মোহনে তিনি তাঁকে প্রত্যাখ্যানের কথা ভেবেছিলেন। দুজন পুরুষকে হৃদয়ের ভিন্ন দুই কোটরে গুম করে রাখার আন্তরদহন ন হন্যতে-র মূল সুর এবং মৈত্রেয়ীর বিবরণে কমপ্লেক্সটা শেষাবধি খোয়া যায় নাই।

মৈত্রেয়ী দেবীর ব্যক্তি-স্বকীয়তার জায়গায় ছবির নায়িকাকে বিচরণের সুযোগ দিতে বনসালী মোটের ওপর কৃপণতা করেন। স্বামী হিসেবে অজয়ের উদারতা ও ভালোবাসা টের পেয়ে সে যখন তার কাছে ফেরত যায় তখন সালমানের প্রতি তার কমপ্লেক্সের কী হয় দর্শক সেটা আঁচ করতে বিফল হয়। গুজব চাউর ছিল ছবিখানা তৈরি হওয়ার ক্ষণে অফস্ক্রিনে সালমান ও ঐশ্বরিয়ার জমাট প্রেমের সম্পর্কে ফাটল ধরতে শুরু করে। ঐশ্বরিয়া বা নিজের সকল প্রেমিকাকে বাস্তবে ডমিনেট করতে ভালোবাসেন; — সালমানকে নিয়ে বলিপাড়ায় এই গুজব দীর্ঘদিনের। গুজবটি সত্য হইতেও পারে। হাম দিল দে চুকে সনম-র দিনগুলায় সালমানের এই খাসলত হয়ত ঐশ্বরিয়ার মনে বিতৃষ্ণার পারদ তীব্র করেছিল। নিজের নারী-স্বকীয়তা বিপন্ন বুঝে সালমানকে প্রত্যাখ্যানের ভাবনা তাঁর মনে জাগ্রত হওয়া বিচিত্র নয়। প্রেমিকযুগলের অফস্ক্রিনে চলমান মানসিক টানাপোড়েনকে বনসালী নিজ ছবির প্লটে ব্যবহার করেন কি না সে-জিজ্ঞাসা মনে এইবেলা ওঠে।

বিদেশে বহুত কাঠখড় পুড়িয়ে ঐশ্বরিয়া শেষ পর্যন্ত সালমানের দেখা পায়। অজয়ের তৎপরতায় দুজনের সাক্ষাৎ ঘটে। ক্লাইমেক্সের মুহূর্তে সালমানের হাবভাব আর প্রাক্তন প্রেমিকের থেকে ঐশ্বরিয়ার বিদায় নেওয়া ও ভগ্নহৃদয় অজয়ের কাছে ফেরত যাওয়া ইত্যাদি দেখে মনে হইতে থাকে বনসালীর ছবিখানা এইবেলা বিশ্বসুন্দরীর জীবনে সালমানমোহ থেকে বেরিয়ে আসার উপলক্ষ হয়েই দেখা দিয়াছিল। একটা উপলক্ষ তাঁর প্রয়োজন ছিল যাকে ব্যবহার করে সালমানের ডমিনেট করার খাসলত থেকে তিনি এক্সিট নিতে পারেন। বলাবাহুল্য বনসালীর ছবির প্লট সুযোগটা অবারিত করে দিয়াছিল। জমাট প্রেমের বিষাদঘন পরিণতিকে কামে লাগিয়ে পর্দায় বাজিমাত করার ভাবনায় কাহিনির মোড় তিনি সচেতনভাবে অন্যখাতে চালিত করেন; — এমন একখান সন্দেহ ছবিটা দেখতে বসে মনে উঁকি দিয়া যায়।

গুজব রয়েছে বটে, হাম দিল দে চুকে সনম-র পর বনসালীর কোনো ছবিতে সালমানকে অভিনয়ে রাজি করানো যায় নাই। ছবিটা বোধহয় তাঁর ক্যারিয়ারে সেই জখম যার কথা বনসালীকে দেখলে তাঁর মনে উদয় হয়। সিনেমার অন্তভাগে ধ্বস্ত ও পরাজিত সৈনিক তো সালমান ছাড়া অন্য কেহ ছিল না! নিজ খাসলতের দোষে ঐশ্বরিয়াকে হারানোর অবস্থায় সেই সময় তাঁকে পতিত হইতে হয়েছিল। অক্ষয় কুমারের মতে সিনেমায় আবেগে কাতর হওয়া কিংবা কান্না করার দৃশ্যে সালমান এখনো লা-জবাব এবং বলিউডে এই জায়গায় তাঁর সমকক্ষ কেউ নাই। সত্য বটে, হাম দিল দে চুকে সনম-এ সালমানের কান্নাকাতর দৃশ্য অভিনয় মাত্র ছিল না। ঐশ্বরিয়াকে হারানোর সংক্ষুব্ধ বেদনা ভাইজানের অভিনয়সত্তার আড়ালে গোপন থাকা বিচিত্র নয়। বনসালী জাত জহুরির ন্যায় তাঁকে এই দৃশ্যে পরাজিতের কান্না ও হাহাকারে ধ্বংস হইতে বাধ্য করেছিলেন। সুতরাং সালমানের মনে বনসালী বা তাঁর ছবিতে অভিনয় ইত্যাদি নিয়ে রাগ জমে থাকা অবান্তর ঘটনা নাও হইতে পারে।

নারী চরিত্রকে পুরুষের তাঁবে ব্যবহার যাইতে বনসালীর শিল্পকুশল চাতুরীর তুলনা হয় না! দেবদাস-এ পার্বতী ও চন্দ্রমুখীর নারীত্ব সিনেস্ক্রিনে নতুন অঙ্গে হাজির করা হইলেও ভারতীয় পুরুষতান্ত্রিক ভাবনার চিরায়ত খোলসে পরিচালক তাদেরকে বন্দি রাখেন। এদিক থেকে অনুরাগ কাশ্যপের দেব-ডি­­কে ভিন্ন প্রকৃতির মানতে হয়। দেব ওরফে দেবদাসের ব্যক্তিত্বে সক্রিয় ইগো বা অহং অনুরাগের ছবিতে ক্রমে সর্বেসর্বা আকার নিয়াছিল। ভিত্তিহীন গুজব তাকে পারুর প্রতি বিক্ষুব্ধ ও নিজেকে নিঃস্ব করতে প্ররোচনা দিয়া গেলেও গুজব সত্যি নয় জানার পরে দেবের অহংসত্তায় সক্রিয় ক্ষোভ কিন্তু বিদূরিত হয় নাই। অহংয়ের নিবারণ ঘটিয়ে পারুর কাছে ফেরত যাওয়ার ভাবনা তাকে সেখানে উতলা করে না। পাঞ্জাবের পটভূমিকায় পরিচালক কাহিনির ছক সাজান। বনসালীর বিখ্যাত দেবদাস-র বিবিধ অনুষঙ্গ সেখানে ব্যবহৃত হয়, তথাপি দেব ওরফে দেবদাসের নিয়তি চিত্রায়নে অনুরাগ মূল গল্প বা বনসালীর সিনেভাষাকে পাত্তা না দিয়াই আগান। যুগ-যুগ ধরে নির্মিত দেবদাস-র প্রথাবন্দি অতিআবেগকে দেব-ডি সেখানে ধ্বংস হইতে বাধ্য করে। অনুরাগের ছবিতে চিত্রায়িত দেব মূলত জেদি, একরোখা আর মতিচ্ছন্ন প্রেমিক রূপে পর্দায় বিচরণের ক্ষণে তার ব্যক্তিস্বভাবের অতলে লুকানো স্বরূপসহ প্রকাশ্য রূপ নিতে থাকে। নিজের ইগো বা অহংসত্তার বিজয় ছাড়া দ্বিতীয় কিছুকে সে কেয়ার করে না; — ছবির এই বার্তা দর্শকবোধে জাগায়া তুলতে পারার কামে পরিচালক সফল বটে। পারু কিংবা চন্দা ওরফে চন্দ্রমুখীর প্রতি দেবের আকর্ষণ অহংসত্তার সার্বভৌম আধিপত্যের নিকট শেষতক নগণ্য প্রমাণ হওয়াতে অনুরাগের দেব-ডি মূল কাহিনির নতুন পাঠ রূপে দর্শকমনে আবেদন বহায়।

ছবির কাহিনিছকে অহংসত্তার জয় দেখতে উন্মুখ দেব পারুকে প্রত্যাখ্যান করে চন্দার নিকট ফেরত যায়। ওদিকে চন্দার তাকে প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া উপায় ছিল না। একাকী দেব অহংসত্তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে অনিকেত ভাবতে শুরু করে। সে বুঝতে পারে অধিক দিন তার পক্ষে নিজের ভার টানা সম্ভব নয়। ছবির অন্তভাগে তাকে পারু নয় বরং চন্দার তালাশেই গমন করতে দেখা যায়; যেহেতু সে মনে-মনে ভাবে নতুন করে জীবন শুরুর পথে চন্দাই একমাত্র যে তাকে ভরসা দেওয়ার হিম্মত রাখে। পুরুষ-মনস্তত্ত্বের অতলে ঢোকার ভাবনায় বনসালীর দেবদাস যথাবিহিত নীরব। দেবদাস এখানে চিরক্ষয়িষ্ণু রোমান্সের স্মারক রূপে গোল্লায় যাওয়ার ঘটনায় বহাল থাকেন। শরৎ বাবুর কাহিনির যুগ-প্রসঙ্গিক অর্থ খোঁজা অথবা সেরকম পাঠ-বিনির্মাণ বনসালীকে উতলা করে নাই। তাঁর দেবদাস ভারতীয় মনোবীজে শিকড় ছড়ানো মেলোড্রামার আবেশে ফেরত যায় ও হলকাটতির মাঝে নিজের সার্থকতা খোঁজে।

বঙ্গদেশের দর্শক-আলোচকের অনেকেই বনসালীর (*কিংবা ধরা যাক অনুরাগের দেব-ডি।) দেবদাস-র তুলনায় প্রমথেশ বড়ুয়া, কুন্দন লাল সায়গল, দিলীপ কুমার, উত্তম কুমার এবং বাংলাদেশে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মিত ও বুলবুল আহমেদ অভিনীত দেবদাসকে অধিক মূলানুগ রূপে স্বীকৃতি দিয়া থাকেন। তাঁদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন, — মূলানুগ থাকার বাধ্যবাধকতা চলচ্চিত্র নির্মাতার জন্য শর্ত হইতে পারে না। মূলানুগকে ধ্বংস করে নতুন স্বকীয়তার জন্ম দিতে তিনি ক্যামেরার পেছনে দাঁড়ান অথবা এর ভাও রপ্ত করার কামলা খাটেন। এই কাণ্ডজ্ঞান বজায় রাখতে গঁদার হইতে হয় না, তবে গঁদার কেন সিনেভাষাকে সাহিত্য হইতে বিযুক্ত করার তাগাদা দিয়াছিলেন সেটা লবজ করা সিনেশিল্পে তরক্কি অর্জনের খাতিরে জরুরি। বনসালী শরৎচন্দ্রের কাহিনিছকে নতুনত্ব আনার প্রয়াস নিয়াছিলেন কিন্তু কামিয়াব হইতে পারেন নাই।

ওদিকে অনুরাগ কাশ্যপের সিনেভাষা বয়নের পদ্ধতি বিবিধ কন্ট্রোভার্সির কারণে শুরু থেকে গোলমেলে বলে স্বীকৃত। মনমর্জিয়া-র ত্রিভুজ প্রেমের কাহানিতে দর্শক তাঁকে বনসালীর ছকে গমন করতে দেখে অবাক হয় বটে! ডাকাবুকো ও অস্থির স্বভাবের তাপসী পান্নু সেখানে নিজের আসলি প্রেমিকের লগ ছেড়ে বিয়ে করা বর অভিষেক বচ্চনের কাছে ফেরত যায়। পার্থক্য এই যে, ফেরত যাওয়ার ক্ষণে বুঝায়ে দেয় সে ও তার আসলি প্রেমিক স্বভাবে সমধর্মী বলের অধিকারী হওয়ার দোষে দুজনের পক্ষে একে অন্যকে অধিক সহ্য করা কঠিন। বিপরীত বলে থিতু অভিষেকের পক্ষে বরং তার নারীত্বকে নির্ভার রাখা সহজ। নারীমনের গহিনে প্রবেশ ও আত্মসঙ্গের ক্ষুধা মিটানোর হ্যাডম সে রাখে। তাপসীর টমবয় স্বভাবে সচল মাচোম্যান টাইপের কাজকারবারকে এই অভিষেক প্রত্যাখ্যান করে নাই। পরিবার ও সমাজের বিপরীতে দাঁড়ায়া এই স্বভাবকে সে প্রশ্রয় ও স্বাধীনতা দিয়াছিল। সুতরাং তার পক্ষে তাপসীর দেহে ঘুমন্ত বাসনাকে সামলেসুমলে রাখা বা অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় পাহারা দেওয়া সম্ভব। একজন অভিভাবক কাম দেহরক্ষী তার বিশেষ প্রয়োজন এবং অভিষেক সেই কামে যোগ্য বটে।

অনুরাগের এহেন ভাবনায় গমন মনমর্জিয়া-র গল্পকে ব্যাহত না করলেও গোলমেলে ও স্ববিরোধী ভাব মনে পয়দা করে। দেব-ডির বেলায় অবশ্য সেরকম কিছু ঘটে না। নতুন অঙ্গে দেবদাসকে হাজির করার ঘটনায় পরিচালকের ভাবনার নতুনত্ব মনকে টানে। উপমহাদেশে সাহিত্যের কপিক্যাট থেকে চিত্রায়িত সিনেমায় অভ্যস্ত দর্শককুলের জন্য ঘটনাটি যদিও সুখকর নয়। তা-সত্ত্বেও নির্মাতার সাহসকে স্বীকৃতি দিতে তারা কৃপণতা করেনি। বনসালীর ছবির ন্যায় মারকাট ব্যবসা না করলেও লঘু বাজেটের দেব-ডি বক্স অফিসে সফল হিসেবে সেই সময় বিবেচিত হয়েছিল।

নারীপ্রধান চরিত্রে বলিসিনেমার সাম্প্রতিক আবর্তনের সঙ্গে বনসালীর মতো মুরব্বিস্থানীয় নির্মাতাদের বিচ্ছেদ বুঝাইতে তাঁর সম্পর্কে আরো দু-চার কথা যোগ করা প্রয়োজন। হিন্দি সিনেমার অমিত প্রভাববিস্তারী এই নির্মাতা মূলত পূর্ব-নির্ধারিত ছকে বসে হলকাটতি ছবি বানান এবং সেখানে তাঁর সাফল্য ঈর্ষনীয়। মালিক মোহাম্মদ জায়সীর অমর কাব্যগাথা পদ্মাবত-র (*মধ্যযুগের বঙ্গে কবিকুল শিরোমণি আলাওল জায়সীর কাব্যরস ব্যবহার করে পদ্মাবতী-র জন্ম দিয়াছিলেন।) চিত্রায়নেও নিজের ছক কেটে বাহির হওয়ার প্রশ্নে তাঁর অনীহা গোপন থাকে না। লালসা, ষড়যন্ত্র, সহিংসতা আর ভালোবাসার ট্রাজেডিঘন নাটকীয়তার সঙ্গে রাজপুত গরিমার প্রশস্তি পদ্মাবত-র দেহ হইলেও জায়সীর অমরকাহিনির প্রতি মর্মে উচ্ছ্রিত মরমি ভাবরসের ব্যবহার হইতে বনসালী সেখানে বিরত থাকেন। সে তিনি থাকতেই পারেন। পদ্মাবত-র সিনেমা হয়ে ওঠার প্রশ্নে জায়সীর ভাবরস উপেক্ষা করা কোনো অপরাধ নয়। বনসালীকৃত ছবিখানা অস্বস্তি জাগ্রত করে অন্য কারণে। নাম-ভূমিকায় অবতীর্ণ দীপিকা পাডুকোনে পদ্মাবতীর ব্যক্তি-স্বকীয়তার ছিটেফোঁটাও পর্দায় প্রাণ পায় না দেখে দর্শকের উৎসাহ দপ করে নিভে যায়। জায়সীর মহাকাব্যে চিত্রায়িত রাজপুত রমণীর তেজ ও কোমলতাকে যুগ-প্রাসঙ্গিক ভাষায় বি-নির্মাণের ঘটনায় পরিচালকের অনীহা জায়সীর ম্যাগনাম ওপাস-র সিনেচিত্রায়নকে পানসে ভাবতে বাধ্য করে। আলাউদ্দিন খিলজি আর রাজা রতন সিংয়ের মাঝে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ সিনেপর্দাকে দখলে রাখে। অন্যদিকে যুযুধান দুই শক্তিকেন্দ্রের ছায়ায় নারীশক্তির কামঘন আবেদন ও সহমরণে গমনের মহিমা বাড়ানোর কামে দীপিকা ওরফে পদ্মাবতীর জীবনদীপ নিভে আসে! একুশ শতকে বসে পদ্মাবতীর ক্লিশে উপস্থাপনা মনে বিরক্তির সঞ্চার ঘটায়।

জায়সীর মহাকাব্য সাহিত্যের চিরায়ত নিয়মে ঐতিহাসিক সত্যে বিশ্বস্ত থাকার দায় বোধ করে নাই। ইতিহাসের রেশ থাকলেও নিজের কাব্যিক স্বকীয়তা ও ভাবনাকে তিনি সেখানে বিশিষ্টতা দানে অধীর ছিলেন। বলাবাহুল্য আলাওলও তাই করেছেন। বনসালীর ছবিতে এই দিকটা বিবেচনায় আসে নাই। পদ্মাবতকে ঐতিহাসিক কাহিনি রূপে চিন্তা করা ও সেই ছকে সিনেপর্দায় চিত্রায়ন তাঁর মনকে দখলে রেখেছিল। নেপথ্যে এই বাণিজ্যভাবনা হয়ত ছিল, — জায়সীর মহাকাব্যে আলাউদ্দিন খিলজি নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রতীক হওয়ার কারণে ভারতবর্ষে মুসলমান শাসনের পরিণাম নিয়ে বিজেপিপন্থী হিন্দুমানসে বিদ্যমান ধারণার অনুকূলে সে হাওয়া দিতে সক্ষম। দর্শকঅহংকে পরিতৃপ্ত করতে খিলজির পশুসুলভ কায়কারবার ভালো মওকা বটে! সর্বোপরি মহাকাব্যে মেহেরুন্নিসার সঙ্গে বিবাহের প্রাকক্ষণে দুরাচার খিলজির ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়া, রানী পদ্মাবতীর প্রতি দুর্বার কামবাসনা, যুদ্ধের নীতি লঙ্ঘন করে কাফুর কর্তৃক রাজা রতন সিংকে হত্যা, আত্মমর্যাদা রক্ষায় পদ্মাবতী ও নাগমতিসহ রাজপুত রমণীদের জাওহর বা গণ-আত্মবলিদান ইত্যাদি ঘটনা হলকাটতির জন্য তোফা।

কাহিনির প্রতি মূলানুগ থাকার বাহানায় পদ্মাবতী ও নাগমতিকে বনসালী সেই নারীশক্তির প্রতীক রূপে পর্দায় হাজির হইতে বাধ্য করেন যারা নিছক পতিঅন্তপ্রাণ এবং মুসলমান রাজন্যের লালসা ও কুটিলতায় স্বামীর পতন সইতে না পেরে সহমরণে অকুতোভয়। সিনেভাষা বয়নের ক্ষণে আলাউদ্দিন খিলজি ও রানী পদ্মিনী ওরফে পদ্মাবতীর ঐতিহাসিক ঘটনার সত্যমিথ্যা যাচাইয়ের ভাবনা তাঁকে তাড়া দিয়াছিল বলে বিশ্বাস হয় না। জায়সীর মহাকাব্য কাহিনির অন্তে পৌঁছে কী কারণে সকল ঘটনাকে মহাভারতের ন্যায় মায়া রূপে সম্বোধন করে যায়? — এই জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার তাগিদ পরিচালকের চিত্তে আলোড়ন ঘটাইতে বিফল হয়। ধুরন্ধর ব্যবসাবুদ্ধি মগজে পুরে ইতিহাস ও জায়সী উভয়কে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার জায়গা হইতে পাঠ ও ব্যবহারে নিজের শক্তি খর্চায় দর্শক তাঁকে নিমগ্ন হইতে দেখে। অহংতৃপ্তির সকল উপাদান সগৌরবে হাজির থাকায় সিনেহলে রিলিজের পর বিজেপিপন্থী হিন্দু দর্শকের কাছে ছবিখানা প্রবল সমাদার লাভ করেছিল। ওদিকে মুসলমান দর্শক খিলজির চরিত্রে রনবীর সিংয়ের নারকীয় ক্রুরতার পর্দাভাষ্য মেনে নিতে বিমুখ ও ক্ষুব্ধ বোধ করে। সাহিত্যের মূলভাবের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা সিনেনির্মাতার জন্য অনিবার্য নয়; তবে হ্যাঁ, সাম্প্রদায়িক উসকানি ও সংকীর্ণতার জায়গা হইতে মূলভাবকে ব্যবহার অপরাধ বটে।

আলাউদ্দিন খিলজির হাতে চিতোরের পতন অনিবার্য দেখে আত্মমর্যাদা রক্ষায় রাজপুত রমণীগণের গণ-আত্মবলিদান আর পদ্মাবতী ও নাগমতির সহমরণ লাভের মর্মান্তিক বেদনাকে জায়সী মরমি আবেগ মিশায়ে সুষমা দান করেছিলেন। মানবচরিত্রের রিপুতাড়না হইতে সংঘটিত পরিণাম সেখানে প্রতি পরতে উন্মোচিত হয় ও পাঠককে জীবনের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে প্ররোচিত করে যায়। বনসালীর কাহিনিচিত্রে দর্শক মর্মভেদী আবেগে সংক্ষুব্ধ বোধ করার পরিবর্তে সহমরণ ও গণ-আত্মবলিদানের মতো ঘটনাকে মহান ভাবতে অধিক উৎসাহী হয়। আলাউদ্দিন খিলজির চিতোর আক্রমণের ঘটনায় কাহিনির প্রতি পরতে সংঘটিত নারীত্বের অশেষ অবমাননা, যৌনহেনস্থা, সহমরণ ও গণ-আত্মবলিদানের নেপথ্য-কুশীলব রূপে মানবচরিত্রে বিদ্যমান লালসা-ক্রুরতা ও পরিশেষে এসবের অন্তঃসারশূন্যতা তুলে ধরতে জায়সীর মহাকাব্য দ্বিধা করে নাই। রাজ্যবিজেতা আলাউদ্দিন খিলজির লালসা ও ক্রুরতা অন্তে পৌঁছে নিছক অসারতা ছাড়া অন্যকিছু তাকে উপহার দিতে ব্যর্থ হয়; — মর্মভেদী এই ইশারায় নিহিত জীবনবেদ বনসালীর সিনেভাষ্যে জায়গা করে নিতে পারে নাই। মহাকাব্যের নাগমতি ও পদ্মাবতীর সহমরণ পর্বের অন্তভাগে কবি অকপটে জানান দিয়াছিলেন :—

When the Shah heard, he came to the place of assembly : night had fallen in bright daylight. He took up one handful of ashes and threw it in the air, saying: ‘Earth is vanity.’…All the women committed Jauhar, : all the men persihed in the battle. The Emperor demolished the fortress. Chitaur became Islam. [Padmavat By Malik Muhammad Jayasi, Translation of the epic as prose by A G Shirreff; PDF Edition]

আলাওল তাঁর অনুপম স্বকীয়তায় জায়সীর কাব্যের ভাবরসকে দিল্লীর শাহ-র আপন দেশে যাইবার বিবরণ পর্বে জোড়েন :—

পদ্মাবতী নাগমতী সহ মৃত গেল। মাগনেতে আলাওল বিস্তারি কহিল।। কোথা গেল দিল্লীশ্বর কোথা কামভাব। কোথা গেল পাত্রমিত্র বল ছত্র সব।। কোথা গেল গন্ধর্ব্বসেন সঙ্গে মন্ত্রীগণ। কোথা গেল রত্নেসেন সঙ্গের রাজন।। কোথা গেল চিতওর রত্নচিত্রসেন। কোথা গেল পদ্মাবতী ত্রৈলোক্যমোহন।। কোথা গেল হীরামণি শুক সে পণ্ডিত। চিরদিন যার কীর্ত্তি আছে পৃথিবীতে।। কোথা গেল দিল্লীশ্বর উমরাগণ। পরিণামে হেতু কিছু করহ যতন।। একে একে গরাসিল দারুণ শমনে। এতেক ভাবিয়া চাহ বুদ্ধিমন্ত জনে।। সে সুখ সম্পদ কোথা গিয়াছে এখন। কিছু না রহিবে রৈবে কীর্ত্তির কথন।। কৃশাল চরিত্র কেহ বুঝিতে না পারে। একের মানস লাগি লক্ষ প্রাণী হরে।। [আলাওল বিরচিত পদ্মাবতী; হাবিবী প্রেস, কলকাতা, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ; পিডিএফ সংস্করণ।]

জায়সী বা আলাওল তাঁদের বাখানে পদ্মাবতীর ব্যক্তিত্বে সচল তেজ ও ভালোবাসার শক্তিকে ক্ষুন্ন না করে সহমরণে বিরাজিত ভাবরস ও রাজপুত রমণীর আত্মমর্যাদাকে একত্রে জুড়েছিলেন। বনসালীর সিনেভাষ্যে পদ্মাবতীর নাম-ভূমিকায় সচল দীপিকায় তার কিছুই দৃষ্টে না! যারপরনাই জায়সীর কাব্যকে যুগ-প্রাসঙ্গিক মনে হইলেও বনসালীর সিনেভাষাকে অদ্য ঢের পশ্চাদগামী ও সংস্কারাচ্ছন্ন মানতে হয়। পদ্মাবতীকে সতী-সাবিত্রীর পুরানা ছকে গ্লোরিফাই করার কামে পরিচালক মহাশয় মগ্ন থাকেন। যারপরনাই ভারতীয় জনমানসে অবিচ্ছেদ্য সংস্কার হয়ে বিরাজিত সতীদাহ কিংবা নারী-স্বকীয়তার প্রতি ভারতীয় পুরুষকুলের জরায়ুপরায়ণ শিশ্নগূঢ়ৈষা আরো একবার সিনেপর্দায় মহিমান্বিত হওয়ার দায় মিটায়ে যায়।

মনে পড়ে ছবিখানা রিলিজের পর অভিনয়শিল্পী স্বরা ভাস্কর বনসালীর প্রচণ্ড বাণিজ্যসফল ম্যাগনাম ওপাস নিয়ে লম্বা একখান প্রতিক্রিয়া উন্মুক্ত সাংবাদিকতার চর্চায় বিশ্বাসী The Wire-এ আপ করেছিলেন। সিনেভাষা বয়নে পরিচালকের প্রযত্নকে প্রশংসাবাক্যে সুখী করলেও একজন নারী দর্শক হিসেবে পদ্মাবত  স্বরাকে হতাশ ও সংক্ষুব্ধ করেছিল। বিচিত্র উপায়ে নারীর স্বকীয়তাকে দমিয়ে রাখতে পটু একুশ শতকের ভারতবর্ষে সতীদাহ ও গণ-আত্মবলিদানকে মহীয়ান প্রমাণে সচেষ্ট পদ্মাবতকে তিনি মেনে নিতে পারেন নাই। সিনেপর্দায় দীপিকাসহ নারীচরিত্রের ভূমিকা অবলোকনের পর যোনিসর্বস্ব রমণী ছাড়া নিজেকে অন্যকিছু ভাবার রুচি তাঁর লোপ পেয়েছিল। যোনিমধ্যে সংকুচিত ও সীমায়িত (দ্রষ্টব্য : ‘At The End of Your Magnum Opus… I Felt Reduced to a Vagina Only’ by Swara Bhasker) সিনেভাষ্যে গমনের কারণে ইতিহাসের প্রতিকূল স্রোত পাড়ি দিয়া ভারতীয় রমণীর স্বকীয়তা অর্জনের লড়াই ও তিল-তিল করে নিজেকে পুরুষের সহগ করে তোলার মরণজয়ী সংকল্প অগত্যা অর্থহীন বোধ হইতে থাকে!

স্মরণ রাখা সংগত, মধ্য-নব্বইয়ে ঝড় তোলা সুরজ বার্জাতিয়ার হাম আপকে হ্যায় কৌন ছবির ভাবকেন্দ্র থেকে সঞ্জয় লীলা বনসালীর মনোজগৎকে পৃথক করা মুশকিল। বার্জাতিয়ার আধুনিকা মাধুরী পরমাশক্তির দ্যোতক রূপে পর্দায় বিচরণের ক্ষণে চিরপুরাতন সেবাদাসীর ভূমিকায় নিজের পাট চুকায়। বনসালীর দীপিকাও তথৈবচ। এইসব কারণে তাঁর ছবিগুলা নারীপ্রধান হইলেও নারী সেখানে ভরকেন্দ্র রূপে ঝিলিক দিয়া ওঠে না। মাধুরী, ঐশ্বরিয়া বা দীপিকার কারণে বক্স অফিসে তারা বাজিমাতও ঘটায় না। তাঁর ছবির বাণিজ্যসাফল্যের মূল নায়ক তিনি নিজে। পর্দায় নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হইলেও দিন শেষে তিনি সেই পুরুষ রূপে দেখা দিয়া থাকেন যিনি ভারতীয় দর্শকের মন পড়তে পটু। নারীশক্তির মহিমা পুরুষতান্ত্রিক খোলসে সুরক্ষিত এই বার্তার জোরে তাঁর সকল ছবি হলে দর্শক টানে।

বনসালীর ছবির নায়িকাগণ যৌনপুতুলের অধিক আবেদন কি মনে বহায়? তাঁদের গ্ল্যামারকে তিনি পর্দায় নির্মমভাবে শোষণ করেন। যারপরনাই বিদ্যা বালান অভিনীত ডার্টি পিকচার, পরকীয়া ঘটিত ঘটনায় আবিল জিসম, মার্ডার ইত্যাদি কিংবা নারীর সর্বজায়া হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে বিরচিত সাম্প্রতিক পর্দা-আখ্যান থেকে বনসালীর কাহিনিচয়ন পৃথক অঙ্গের হয়ে থাকে। মানবিক আবেদনে সমৃদ্ধ ব্ল্যাক ব্যতীত পারতপক্ষে সেই কাহিনিচিত্রে গমনের কথা তিনি ভাবেন নাই যেখানে নারী একই অঙ্গে প্রতিবাদী, সংগ্রামী, সর্বজায়া ও পুরুষের সহগামী। মানবিক রিপুদোষে একজন পুরুষের ন্যায় সে হয়ত সেক্সিস্ট অথবা মনোবৈক্যলের শিকার খুনি বা অপরাধী, সোজা কথায় মানবচরিত্রে বিদ্যমান বিচিত্র স্বভাবের প্রতীক রূপে নারীকে পর্দায় হজির করার ঘটনায় দোষ ধরার কিছু নাই, বরং দেশকাল বিবেচনায় সেটা ঘটাই উচিত। পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয়, বনসালীর সিনেভাষা আজো এই বিচিত্র অঙ্গে নিজেকে ভাষা দেওয়ার কথা ভাবে না। সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন-র পুরানা মোঘল রূপে ক্যামেরার পেছনে ফিরে-ফিরে আবিভূর্ত হওয়ার কারণে তিনি বা তাঁর প্রজন্মের একাধিক নির্মাতার সঙ্গে গত এক-দেড় দশকে দেখা দেওয়া তরুণ অথবা নতুন ভাবনায় গমনে আগ্রহী প্রবীণ নির্মাতাদের ফারাককে অমোচনীয় মানতে হয়।

ডার্টি পিকচার হয়ত শুরুয়াত ছিল, অতঃপর গোলাব গ্যাং (*মাধুরী দীক্ষিত ও জুহি চাওলা তাঁদের ক্যারিয়ারে সুবর্ণ সময় পার করার দিনে এই ধাঁচের চরিত্রে নিজের অভিনয় ক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ বিশেষ পান নাই। ভিলেনের চরিত্রে জুহির অভিনয় গল্পের দাবি ভালো করেই মিটায়।), কুইন, পিঙ্ক, ফ্যাশন ইত্যাদি ছবি বিচিত্র পথে নারীর সর্বজায়া হয়ে ওঠার গল্প দিয়া মোড়ানো। আমির খানের বক্স অফিসে ঝড় তোলা দঙ্গল বা সিক্রেট সুপারস্টার-র ভরকেন্দ্রও নারী। ছবি দুটির ব্যাপক সাফল্যের পেছনে মি. পারফেকশনিস্ট আমিরের পরিমিত অভিনয়কুশলতা গণ্য কারণ ছিল সন্দেহ নাই। সেইসঙ্গে গল্প-বাছাইয়ে নতুনত্ব আর গল্পের আধারকেন্দ্র নারী চরিত্রের স্বকীয়তাকে পর্দায় বাধাগ্রস্ত না করায় ছবি দুখানা যুগের ভাষাকে অবারিত করে যায়। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত দঙ্গল-এ কুস্তিগির দুই কন্যা সন্তানের মেন্টর রূপে আমির খানের দাপুটে পর্দা-উপস্থিতি গীতা পোগাতের চরিত্রে জায়রা ওয়াসিমের কুস্তিগির হয়ে ওঠার স্বকীয়তাকে জখম দিয়া বসে না। নারীপ্রধান গল্পের উত্থানের জায়গাটি এখানে দক্ষিণের পুরুষশাসিত গল্পছক থেকে বেশ এগিয়ে। বলিসিনেমার নতুন এই জনরার কল্যাণে আলিয়া, কঙ্গনা, তাপসী পান্নুরা পুরুষ চরিত্রের সঙ্গে জুড়ি বেঁধে অথবা জুড়ি ছাড়া মোটের ওপর একলা ছবির লগ্নি উঠানোর ভার টানার হিম্মত রাখে। ঘটনাটি রজনীকান্ত, মোহনলাল, থালাইভা খ্যাত বিজয় কিংবা বাহুবলীর প্রভাসের দানবীয় হিরোইজমে ভর করে দুর্বার গতিতে আগুয়ান দক্ষিণী সিনেমায় বোধহয় এখনো অকল্পনীয় ঘটনা হয়েই বিরাজ করে।

কঙ্গনার লাইফ ইন অ্যা  মেট্রো  কিংবা আলিয়ার রাজি বা ডিয়ার জিন্দেগির হলকাটতির পেছনে স্টার কাস্টিং মুখ্য প্রভাব রাখে নাই। পর্দায় নিজেকে ডমিনেন্ট করে তোলার মাঝে সফলতার চাবি লুকানো ছিল। গৌরী সিন্ধে-র ডিয়ার জিন্দেগির সাফল্যে শাহরুখের ভিন্নমাত্রিক অভিনয় নজর কাড়লেও ছবির প্রাণকেন্দ্র আলিয়া ভাটকে ঘিরেই আবর্তিত। সাবলীল অভিনয় ও গল্পের কারণেও বটে বাড়তি গ্ল্যামার ছাড়া আলিয়ার পর্দা-উপস্থিতি দর্শকের নিকট আবেদন বহায়। সোজা কথায় কাহিনির থিম ও চিত্রনাট্যে নতুনত্ব বলিউডকে পুরুষ তারকা নির্ভর গল্পে কেন্দ্রীভূত থাকার অভ্যাস থেকে একটু-একটু করে বিচ্যুত করছে। যে-কারণে পারিশ্রমিকের অসমতা, স্বজনপ্রীতি বা মি টুর ধাক্কায় যৌনহেনস্থা নিয়া কঙ্গনারা ঠোঁটকাটা হইতে এখন আর দ্বিধায় ভোগেন না। সে যা হোক, বৈচিত্র্যের বাহারে বিকশিত সিনেকারখানার গল্পে আপাত ইতি টেনে ঢাকাই ছবির অঙ্গনে একপাক ঘুরান দিয়া আসারে সময় বোধহয় হয়েছে। সে-অবধি বলিসিনেমার অতীত ও সাম্প্রতিকের সাতকাহন পরবর্তী কোনো কিস্তির জন্য তোলা রইল।


সিনেভাষার সাতকাহন আগের পর্ব
আহমদ মিনহাজ রচনারাশি

COMMENTS

error: