রইস মনরম ও সরোজ মোস্তফা : আলাপচারিতায় ছত্তার পাগলার জীবনানুসন্ধান

রইস মনরম ও সরোজ মোস্তফা : আলাপচারিতায় ছত্তার পাগলার জীবনানুসন্ধান

ভাটিবাংলার গণমানুষের কবি, গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছত্তার পাগলা ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল পৃথিবী থেকে প্রস্থান করেছেন। সুফিজ্ঞানে ফকিরি ধারায় তিনি ছিলেন মদনপুরের শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমীর আধ্যাত্মিক অনুসারী।  নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার সিংধা ইউনিয়নের নূরুল্লারচর গ্রামে নিজ বাড়িতে ফকিরি ধারাতেই আসন বানিয়েছিলেন। সেই নিভৃত আসনের ছোট্ট খুপরি  ঘরে বৃহস্পতিবার বেলা দুইটা ৫০ মিনিটে তিনি পৃথিবীর আয়ু সমাপ্ত করেন। ভাটিবাংলার সাংস্কৃতিক গুরু কবি রইস মনরমের সঙ্গে এই বিদিত গাতকের ছিল আত্মিক সম্পর্ক। কবির গানের নীড় মৌরাগ-এ ছত্তার পাগলা বিকেলের স্তব্ধ পায়ে প্রায়ই আসতেন। এসে মুক্তস্বর-এর রইস মনরমের কাছে  নিজের গান ও যাপিত জীবনকে সমর্পণ করতেন।  এই সম্পর্কের সূত্র ধরেই গাতকের জীবনদৃষ্টি ও দর্শনকে অন্বেষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে এই কথোপকথনে। — সরোজ মোস্তফা

রইস মনরম : মুক্তস্বরের মানুষ
ছত্তার পাগলার গান ও সংক্ষিপ্ত পরিচয়
ব্যানারে ব্যবহৃত ইমেইজের গ্র্যাফিক আর্ট করেছেন  শফিক হীরা

স্যার, কেমন আছেন?
আমি ভালো আছি। সবসময়ই ভালো থাকি। গানের মধ্যে থাকি। ছোট ছোট ফুলের মতো শিশুদের মধ্যে থাকি। গান এবং শিশুরা আমাকে ভালো রাখে। আমি ভালো থাকি।

আজকে আপনার কাছে লোককবি ও লোকগায়ক ছত্তার পাগলা সম্পর্কে জানতে চাই। আমরা জানি, ছত্তার  পাগলার সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনি প্রায়ই আপনার বাসায় আসতেন। আপনার সঙ্গে গল্প করতেন। তাঁর গানগুলো আপনার কাছে  রেখে গিয়েছিলেন আমানত হিসেবে।
ছত্তার পাগলা লোকজীবন ও সংস্কৃতির এক বিরল পুরুষ। তিনি গান লিখতেন, সুরে বাঁধতেন এবং গাইতেন। সবকিছুর মধ্যে একটা নিজস্বতা ছিল। তাঁর সাথে তুলনা করা যেতে পারে এমন গায়ক বাংলায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসের ১৭ তারিখ বেলা ২টা ৫০ মিনিটে তিনি অন্তর্ধানে গেছেন। শেষের দিকটায় তিনি বাড়ি থেকে বের হতেন না। বেশ দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন। বারহাট্টা উপজেলার সিংধা ইউনিয়নের নূরুল্লারচর গ্রামে নিজ বাড়িতেই থাকতেন। প্রায়  ৮৭ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি।  গণমানুষের কবি ছিলেন তিনি।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স যে ৮৭ হয়েছিল এটা কীভাবে ধারণা করছেন? তাঁর জন্মতারিখ কী আপনি জানেন? তাঁর জন্মকথা, তাঁর পরিবার সম্পর্কে আপনি কি জানেন?
ছত্তার পাগলাকে আমি ৩০-৪০ বছর ধরে জানতাম। শুধু আমি কেন, এই অঞ্চলের ছোট-বড় সবাই তাঁকে চিনতো-জানতো। শেষদিকে রোজই আমাদের বাসায় আসতেন। আমি হয়তো স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছি।  গাতক চুপচাপ বসে থাকতেন। শিক্ষার্থীরা চলে গেলে কথা বলা শুরু করতেন। তাঁর সম্পর্কে সবকিছুই আমাকে বলেছেন। তাঁর কথাগুলো আমি টুকে রেখেছিলাম। তাঁর মুখেই শুনেছি তিনি ১৯২৭ সালে চৈত্র মাসের ২৬ তারিখ শনিবারে জন্মেছেন। তাঁর নাকি মাতৃগর্ভে দীর্ঘবাস ছিল। তিনি বলেছেন, “প্রায় ১৩ মাস ছিলাম।” এমনটা তো হওয়া সম্ভব না। তবে আমাদের অঞ্চলের লোকশ্রুতিতে আছে দণ্ডলাগা মায়েদের এমন হয়। গাতকের বাবা আব্দুল হাসিম তালুকদার প্রচুর সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তিনি বলেছেন তারা হাজার মণের মতো ধান পেতেন। নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার  হিরণপুরে লালচাপুরে তাদের পৈতৃক নিবাস। বাবা দুই বিয়ে করেছিলেন। প্রথম স্ত্রীর মারা যাওয়ার পর আম্বিয়া খাতুনকে (আরশের মা) বিবাহ করেন। এই ঘরে বড়ভাই আব্দুর রাশিদ তালুকদার জন্মগ্রহণ করেন। তারপরে যমজ দুই ভাই হাসেন-হোসেন জন্মগ্রহণ করেন। এই দুই ভাই যথাক্রমে তিন মাস ও সাত মাস জীবিত ছিলেন। এরপরে আব্দুস ছত্তার তালুকদার জন্মগ্রহণ করেন। তেরো মাস বয়সে পিতা মারা যান। তারপর মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে হয়।  সেখানেও দুই ভাই, দুই বোন।

ছত্তার পাগলার জন্ম ও বিকাশ হিরণপুরের লালচাপুরে। তিনি বারহাট্টার নূরুল্লারচর গ্রামে কীভাবে এলেন?
তার মুখেই শুনেছি লালচাপুরে তারা খুবই প্রভাবশালী ছিলেন। তাঁর বড়ভাই আব্দুর রাশিদ তালুকদার অনেকটা মাতাব্বর প্রকৃতির লোক ছিলেন। এলাকায় এক ধরনের বিরোধের সূত্র ধরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা বারহাট্টার কংসের পাড়ে তাকে হত্যা করে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকেই ছত্তার পাগলা অনেকটা অপ্রকৃতস্থ হয়ে যায়। গ্রামের কাউকে আর বিশ্বাস করতে পারত না সে। ভাইয়ের মৃত্যুটা গ্রামবাসীর প্রতি এক ধরনের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একাধারে নিজেদের জমিজমা বিক্রি করতে থাকে। এইসব নানাবিধ কারণে শেষে সে পৈতৃক ভূমি ছেড়ে নানান জায়গা ঘুরে শেষে নূরুল্লারচরে স্থিত হয়।

তাঁর নাম তো আব্দুস ছত্তার তালুকদার। এই নামটা ছত্তার পাগলায় পরিবর্তিত হলো কীভাবে? ‘ছত্তার’ শব্দটাও সাত্তার হওয়ার কথা। সবমিলিয়ে নামের এই পরিবর্তনটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
নামকে সংক্ষিপ্ত করে বলার প্রবণতা এই অঞ্চলে আছে। মুস্তাফাকে ‘মস্তু’ বলা বা দিলওয়ারকে ‘দিলু’ বলা এই অঞ্চলের একটি সহজাত ব্যাপার। এদিক থেকে তাঁর নামের ‘আব্দুস’ এবং ‘তালুকদার’ কাটা গেছে বলে মনে হয়। তিনি নিজেই তার নামের বানান ‘ছত্তার’ লিখেছেন। সুতরাং এই বিষয়ে কারো দ্বিধা থাকার দরকার নাই। ‘পাগলা’ শব্দটি লালচাপুরেই যুক্ত হয়েছে। আমাদের অঞ্চলে সুভাষণ অর্থেও পাগলা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পরম মানুষকেও আমরা পাগলা বলে সম্বোধন করি।

ছত্তার পাগলার গানের প্রথম জীবন সম্পর্কে আপনার কাছে জানতে চাই। অর্থাৎ তিনি কীভাবে শুরু করেছেন? কার কাছে শুরু করেছেন? এ বিষয়ে জানতে চাই।
এ বিষয়ে বলার মতো তথ্য-প্রমাণ আমার কাছে নেই। তবে তাঁর কাছেই শুনেছি শৈশবেই তিনি গানবাজনায় প্রবেশ করেছেন। গোষ্ঠীর চাচাতো ভাই সদর উদ্দিন তালুকদার গান জানতেন সারিন্দা-সরোদ বাজাতে পারতেন। তাঁর গানের দল ছিল। তিনি ছিলেন সে-দলের ম্যানেজার। এই সদর উদ্দিনের কাছেই  তাঁর গানবাজনায় হাতেখড়ি। সদর উদ্দিন তালুকদারের সম্বন্ধি ভানু বয়াতি। মূলত হিরণপুর অঞ্চলটা গানের অঞ্চল ছিল। রূপবান পালার গান, ঘাটের গান, মাঠের গান, জারি-সারি, কিচ্ছা ও পালা-পুঁথির গান — এসবের ভেতর দিয়ে বড় হয়েছেন তিনি। লম্বাগীতের দলে, ঘাটুগানের দলে, জারিগানের দলে মিশতে মিশতে বড় হয়েছেন তিনি। রাতের বেলা গ্রামে গ্রামে এসব গানের আয়োজন হতো। তিনি সহজেই এসব গান আত্মস্থ করতে পারতেন। গানের আসরে তিনি ‘মঞ্চের চৌকি ধরে বসা শ্রোতা’। রাতের বেলার গানগুলোকে দিনের বেলায় মাঠের রাখালদের, সঙ্গীদের শুনাতেন। তাঁর সুন্দর সুরেলা কণ্ঠে সেসব গান শ্রোতাদের প্রচুর আনন্দ যোগাতো। উপস্থিত সবারই হাততালি পেতেন। এভাবেই  গান শোনাতে শোনাতেই তিনি ‘ছত্তার পাগলা’ হয়ে গেলেন। পাড়াঘরে ঘুরে ঘুরে, ক্ষেতখলায় কামলাদের সাথে বসে তাৎক্ষণিকভাবেই তিনি গান গাইতেন। তাঁর অনেক বিখ্যাত গান লালচাপুরেই রচিত। হিরণপুর থেকে চলে আসার জীবনাখ্যানই এসব গানে উচ্চারিত হয়েছে :

১.
হারভেইচ্ছার মা ক্ষেত বেচিয়া করে মাতবরি।
আমি ছত্তার পাগলা আইজগাইল ভিক্ষা করি।।

ইঞ্জিন ছাড়া ঠেলাইয়া নেই হুদা মালগাড়ি।
সব মেশিন বন্ধ আইজগাইল নাইগা ব্যাটারি।।

২.
হারভেইচ্ছা রে বল খেলাডা তওবা কইরা ছাড়
আমি তরে না করতাছি পাগল ছত্তার।।

বাইশজনে একটা বল লইয়া
বড় একটা মাঠে গিয়া
এই দৌড়াদৌড়ি কের লাগিয়া
এইডা কি ব্যাপার।।

বল লইয়া দৌড়াদৌড়ি
গৌলির সামনে ফারাফারি
বেগি বেডা কয় লাত্তি মারি
হইয়া যাউক কর্নার।।

পরে দুইজনের লাত্তির ছুডে,
দেখ বল কই গিয়া উডে
মাথায় হেড লয় রাগের ছুডে
ডরায় না ভাঙ্গে যদি ঘাড়।।

এই যে খেলা হইলো শুরু
আউট হইলে আবার করে থুরু
রেফারি কিন্তু সবার গুরু
সবাই কথা মানে তার।।

পেনাল্টি শট হইলে পরে
একলা গৌলিডা বলডা ধরে
না-জানি বল কইবান পড়ে
মরিলে দু সবই অন্ধকার।।

দেখিস না তুই ষাঁড়ের লড়াই
কুস্তি খেলাত গিয়া করিস না বড়াই
এইসব দিয়া কোনো দরকার নাই
ওরে মামুনভাই আমি তরে না করি বারেবার।।

গানের এই সহজ সরল ভাষাটা তিনি কীভাবে আয়ত্ত করেছিলেন? তাঁর প্রত্যেকটি গান জীবন্ত এবং জীবননির্ভর। এগুলোকে কি কবিতা বলা যায় না?
ছত্তার পাগলা অবশ্যই কবি। বাংলা কবিতায় হাটুরে কবিরা কিংবা ভাট কবিরা এভাবেই কবিতা লিখতেন। সহজ ভাষায় সমকালীন পরিস্থিতিকে কবিতায় নামাতেন তারা। আমার মনে হয় হিরণপুর থাকাকালীনই এ ধরনের কবিদের ভাষা ও বর্ণনায় প্রবেশ করেছিলেন তিনি। দিনে দিনে সেই ভাষা ও বৈশিষ্ট সম্প্রসারিত হয়েছে।

ভাষার সারল্য এবং উপস্থাপনার নিজস্বতা তাঁর গানকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে। এই গানের ভাষা এবং সুর সহজ সরল। এই গানটির কথাই ধরুন না, যেখানে তিনি বলছেন :

লুঙ্গির নিচে ট্রাউজার পিইন্দা ঢাকার শহর যাই,
ইলশা মাছের কিতা অইল জাইন্যা বুইঝ্যা আই।।

কতো কতো ইলশা খাইতো আমরার বাপদাদারায়,
থুরা কিছু আমরাও খাইছি বেশি মনে নাই,
আমরার ছেলে মেয়েরারে কী দিয়া বুঝাই।।

আমি একদিন বাজার হইতে ইলশা কইয়া সিলভার লইয়া সাং নউল্যারচর যাই।
রাইন্দা দিছে খাইয়া দেহি স্বাদ লাগে নাই,
কেলায়বান কয় পয়সার লোভে ইলশা আমরা বিদেশে পাঠাই।।

এই লেখাটাকে আপনি কবিতা হিসেবে পড়তে পারছেন আবার সুরের জমিনে রেখে শুনতেও পারছেন। কী বিষয় কী চিত্রকল্প — শব্দগুলোর ক্ষমতাটা দেখুন তো! শব্দগুলোতে আমাদের সময়টাকে কীভাবে স্পষ্ট করেছেন তিনি! এই সময়টাকে, এই শৈশবটাকে আমরা সবাই চিনি। ইলিশ মাছকেও চিনি, সিলভার কাপ মাছকেও চিনি। প্রত্যেকটি গানই সাধারণ মানুষের কষ্ট এবং আকুতিকে তুলে এনেছে।

ছত্তার পাগলা সমকালীন ঘটনা ও পরিস্থিতির ভেতরে ঢুকে মুখে মুখেই গান রচনা করতেন, সুর বাঁধতেন। সেই গান মোহনগঞ্জ, বারহাট্টা, নেত্রকোনা শহরের পথেঘাটে গেয়ে বেড়াতেন। ৮/৯ বছর বয়েসী কন্যার হাতে ডুগডুগি, চটি আর নিজের হাতে পেঁপেপাতার আঁটির সঙ্গে রাঙতা-প্যাঁচানো বাঁশি বাজাতে বাজাতে ছত্তার পাগলা গানের আসর জমাতেন।
এটা বাংলার লোকগায়কদের একটা রীতি। গান গাইতে খুব বেশি কিছু লাগে না। সামান্য একটা একতারা, খোল করতাল কিংবা দোতারা নিয়ে আসর জমিয়ে রাখেন। এখন তো সাউন্ড সিস্টেম ছাড়া কেউ গান গাইতেই পারেন না। কিন্তু আমাদের প্রাচীন পুরুষেরা যন্ত্র দিয়ে গাইতেন না অন্তর দিয়ে গান নিবেদন করতেন। গানের ভেতর দিয়ে তারা নিজেরাই মানুষের কাছে পৌঁছুতেন।

ছত্তার পাগলা গ্রামবাংলার এক অবহেলিত গায়ক, গীতিকার, কবি। হাটবাজারে, রেলস্টেশনে যেখানেই সাধারণ মানুষের সমাগম সেখানেই গান করতেন। সমবেত শ্রোতাদর্শক খুশি হয়ে খুশিমনে যা দিতেন, তা দিয়েই গাতক তাঁর সাংসারিক দিন-গোজরান করতেন। দোহার হিসাবে সাথে থাকতো মেয়ে নাসিমা আক্তার। পরে আনোয়ারা বেগম, শেষের দিকে পারভীন আক্তার। মেয়েরা বড় হয়ে গেলে একে একে বিয়ে হয়ে স্বামীর সংসারে চলে যায়। তারপর একা। নিজের হাতে তৈরি নিতান্তই সাধারণ তালযন্ত্র ‌‌‌ ‘চডি’ সহযোগে গান করতেন। কখনো ভেঁপুজাতীয় ‌‘পেঁপো’। স্বাধীনভাবে দূরে কাছে, গাঁয়ে-গঞ্জের এখানে সেখানে গান গাওয়ার একটি পর্যায় ছিল সুদীর্ঘ সময়ব্যাপী। এটি শুধু রুটি-রোজগারের জন্যই ছিল না; উপস্থিত শ্রোতাদের যেমন আনন্দ জোগাতেন, তেমনি নিজেও আনন্দ পেতেন। এক সময় সুধীজনদের আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে ছত্তার পাগলা গান করতে এলেন। কিন্তু প্রথমদিকে এসব অনুষ্ঠানে যারা তথাকথিত সম্ভ্রান্ত এবং নিয়মিত গায়ক তারা আপত্তি তুলেছে। আপত্তিটা এ-রকম, — এ তো হাটবাজারে গান গেয়ে ভিক্ষা করে, ওরে মঞ্চে নিয়ে আমরা গান করব কেন? শেষ পর্যন্ত সুধী শিল্পী, চুক্তিবদ্ধ গান গাওয়া অভিজাত বাউল শিল্পীগণ সকলেই তাঁকে মেনে নিতে হয়েছে। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মুক্তস্বর’-এর মাধ্যমে এক্ষেত্রে তাঁর অভিষেক হয়। এক পারভীনের স্থলে মুক্তস্বর-এর অনেক শিশুকিশোর তাঁর দোহারী হিসেবে কাজ করেছে অনেক সমৃদ্ধ অনুষ্ঠানে। তিনি শিশুকিশোরদের প্রিয় হয়ে ওঠেন। ক্রমে তরুণদেরও। এখন পড়ন্ত বেলা। নিজের অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট এবং অকপট উচ্চারণ :

স্কুলের স্যারে মাঝেমাঝে সাক্ষাৎ করে আমার সাথে শুক্রবারে
স্যারেরা আর সাংবাদিকরা কিছু টাকা দিয়া যায় ছত্তার পাগলারে।।

রূপক ভাষায় সমাজকে নানান ভাবে ব্যাঙ্গ করেছেন তিনি। সমাজের অসংগতি নিয়ে তাঁর এই ব্যাঞ্জনাময় গানগুলো সময়ের একটা শক্তিশালী ইতিহাস রচনা করেছে। এই বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
ছত্তার পাগলা প্রকৃত কবির মতোই সমাজের সত্যটা উচ্চারণ করেন। শব্দচয়নে প্রাকৃতজনের কবিরা ঠাট্টা করেছেন, প্রতীক ব্যবহার করেছেন কিন্তু সত্যটা উচ্চারণ করেছেন।  তিনি যখন বলেন : “লুঙ্গির নিচে ট্রাউজার পিইন্দা ঢাকার শহর যাই / ইল‌শা মাছের কীতা অইল, জাইন্যা বুইঝ্যা আই” — তখন সমাজ থেকে নাই-হয়ে-যাওয়া ইলিশ মাছ রূপকথার মতো এসে হাজির হয়। আমরা সমাজসত্যে আবর্তিত হতে থাকে। ছত্তার পাগলার অনেক গানে এ-রকম সময়-নিংড়ানো  প্রতীকী ব্যাঞ্জনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকে সেসব প্রতীকী চিত্র ও অন্তঃপ্রেরণাকে ধারণ করেছে :

হরিণের নাভির মধ্যে ঢুকলো কস্তুরী
শাপলাবানু শাপলাবানু কামধেনু দুধের গাই
বালতি লইয়া খাটে বইয়া বাছুর ছাড়াই দুধ খিরাই।।

এমন একটা গান  :

চোরের ডরে কাঁচা গুয়া পাড়লা তোমরা কেরে
মাজাইলে গুয়া নষ্ট অইবো মটকারই ভিতরে।।

এমন অসংখ্য গান আছে। যেমন এই গানের কথাগুলো একবার শুনে দেখুন :

বিনা টিকেটে গাড়িত উঠলে আয়ু কাটা যায়
ধুন কইরা দেখ ও হারভেইচ্ছা
গাড়িডা কোন বেডায় চালায়।

এ-রকম আরেকটি গানে তিনি বলেছেন :

মওলা কাডল খাইলে আয়
লেডা কাডল ছিইপ্যা খাইলে শক্তি অইবো গায়।।

কুড়া টক্ টক্ টক্
টক্ টক্ টক্ কইরা ডাকছে কুড়া বিলের ধানের ক্ষেতের ভিতর।
টকটকানি শুইন্যা জানি কাঁপে যে অন্তর।

এগুলোতেও তাল ছন্দ অনুপ্রাস সুরে লগ্ন হয়ে হৃদয়গ্রাহী। ছত্তার পাগলা কাহিনিভিত্তিক বিবৃতিমূলক গদ্যবাক্যকেও অসাধারণ দক্ষতায় তালে মাত্রায় সুরে লয়ে উপস্থাপন করতে পারেন।

ছত্তার পাগলা তাঁর গানে চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং আমাদের জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতির চিত্র তুলে অসাধারণ জীবনধর্মী গান লিখেছেন। জীবন থেকে নেয়া এ-রকম  বাস্তবধর্মী গান তিনি কীভাবে লিখলেন?
ছত্তার পাগলাকে আমি বলি রাস্তার গায়ক, মাটিলগ্ন মানুষের গায়ক। জীবিকার প্রয়োজনে তিনি হয়তো ধনু নদীর পাড়ে মাটি কেটেছেন। মাটি কাটতে গিয়েই দেখেছেন চেয়ারম্যান-মেম্বারের কর্মকাণ্ড। তাই তার পক্ষে এ-রকম একটি জ্যান্ত গান লেখা সম্ভব হয়েছে। গরিবকে ঠকিয়ে মানুষ কীভাবে বড়লোক হয় তার একটা গীতিকা হলো এই গানটি। এখানে গান আছে, কাহিনি আছে, সুর আছে, আঞ্চলিক জীবনের প্রতিচ্ছবিও আছে; আছে সময়ের একটা ইতিহাস।

 

১.
কাঙ্গাল মাইরা জাঙ্গাল দিলে
গুনাহ অইবো তোর,
আমি লালচাপুরের ছত্তার পাগলা
থাহি নউল্লারচর।।

ছত্তার গেছিন মাডি কাডাত্
ধেনু গাঙ্গের চর,
দেইখ্যা আইছে গম দিতাছে
চেয়ারম্যান আর মেম্বর।
ভাই রে হাজার হাজার মাডি চুরি
দেইখ্যা গায়ে উঠল জ্বর।
কাঙ্গাল মাইরা জাঙ্গাল দিলে গুনাহ্ অইবো তোর।

আমরা শ্রেণিসংগ্রামের কথা বলি, সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির কথা বলি। কিন্তু ছত্তার পাগলা যেভাবে সামাজিক ইতিহাস লিখেছেন সমাজের সত্যকে প্রকাশ করেছেন তা প্রায় বিরলদৃষ্ট।

২.
চল বুবাইজান মাডি কাডাত্
চাইয়্যা রইলা কার পানে,
রাস্তার মাঝে কাডবো মাডি
অডার দিছে চেয়ারম্যানে।।

লাইল্যার মা কয় কাইল্যার মারে
আমার একখান কথা লও,
গাছটার তলে বইয়্যা দুইখান
আডার চডা খাইয়্যা লও।

রইশ্যার মা কয় খইশ্যার মারে
আমরা মাডি কাডবো না,
না না আমরা মাডি কাডবো না,
গেছেবারের এলট বাকি
চেয়ারম্যান সাবে দিছে না।।

রেডিওতে খবর দিছে
দেশে কোনো অভাব নাই,
লাইল্যার ঘরে কাইল্যার ঘরে
আনন্দের আর সীমা নাই।

রইশ্যার মা কয় খইশ্যার মারে
আমরা কিছু বুঝি না,
না না আমরা কিছু বুঝি না,
চেয়ারম্যান সাবে বগল বাজান
আমরা কিন্তু দেখছি না।।

ছত্তার পাগলার অনেক গানই কাহিনিমূলক কিংবা কাহিনি ও বর্ণনার আদলে সুদীর্ঘ। প্রায় প্রত্যেকটি গানই রাজনীতিসচেতন। সময়ের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ এবং অস্থিরতার বিবরণ তুলে ধরে একটা চিরসত্য মেসেজ তিনি দিতে চেষ্টা করেছেন। ধ্বংসের বিপরীতে প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং সেবামূলক মহিমার কথা ফুটে উঠেছে তাঁর গানে।

ছত্তার পাগলা অবশ্যই সমাজের সচেতন শিল্পী। যেখানে অসঙ্গতি সেখানেই তাঁর প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদের ভাষা যতই সহজ-সরল হোক না কেন সত্যকে প্রকাশ করতে এতটুকু কুণ্ঠিত নন তিনি। প্রকৃত অর্থেই তিনি একজন রক মানুষ। তার বেশভূষার দিকে তাকালেই এই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তিনি যেন নজরুলের সকল অনিয়মকেই ধারণ করেছেন। সামাজিক নিয়মকে তুচ্ছ করে, তথাকথিত সামাজিক পোশাক রেখে  হাতে ঘড়ি, ব্রেসলেট, গলায় লাল কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে তিনি এই ভাটিবাংলার রকগায়ক।

আমাদের বাউলরা নাকি তাকে সহ্য করতে পারতেন না। একই অনুষ্ঠানে ছত্তার পাগলা থাকলে বাউলরা নাকি গান গাইতে চাইতেন না — এ-রকম ঘটনাও ঘটেছে। এ-রকমটা কেন ঘটেছে? এ-বিষয়ে আপনি যদি বলেন।
আসলে ছত্তার পাগলার স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যকে আমাদের তথাকথিত বাউলেরা গ্রহণ করতে পারেননি। তাদের অভিযোগ হলো — ছত্তার পাগলা গান গেয়ে ভিক্ষা করে, রাস্তায় রাস্তায় গান করে, ওর সাথে আমরা গান গাইতে পারি না। আমরা একবার মোহনগঞ্জে বাউলগানের আয়োজন করি। সেখানে ছত্তার পাগলাও নিমন্ত্রিত। কিন্তু বাউলেরা বেঁকে বসলেন। আমি বললাম, আপনারা গান গাইবেন না কেন? যথারীতি তারা একই বক্তব্য রাখেন — যে-মঞ্চে ছত্তার পাগলা গাইবে সে-মঞ্চে তারা গাইবেন না। তাদেরকে কোনোভাবেই বোঝানো যাচ্ছিল না। শেষে আমি কঠোর হলাম। বললাম, — আপনারা না-গাইলে নাই। এই মঞ্চে ছত্তার পাগলাই গাবে। শেষে ওদের বোধোদয় হলো। সবাই মিলে একটা অসাধারণ গানের আয়োজন হলো।

ব্যানারে ব্যবহৃত ইমেইজের গ্র্যাফিক আর্ট করেছেন  শফিক হীরা


সরোজ মোস্তফা রচনারাশি
ছত্তার পাগলার ঈদ মোবারকের গান
মুক্তস্বরের মানুষ রইস মনরম

COMMENTS