জীবনানন্দজীবনী

জীবনানন্দজীবনী

বরং জীবনানন্দের জীবনী পড়ি এই ভোরলগ্নে, এই চাঁদডুবোডুবো মরিবার-প্ররোচনাহীন মেঘথমথমা মাঘরজনীতে, যামিনী যখন প্রায় শেষ হয়া আসে।

জীবনানন্দের মতো কবি তুমি হইতে চাও না কোনোমতেই, ইতস্ততভাব ব্যতিরেকে সেদিন সুস্পষ্ট বলছিলে, এবং সেইটি ছিল অত্যন্ত সজ্ঞান বক্তব্য তোমার। অবশ্যই তা হবে না। দাশের মতো কবি তুমি হতে যাবে কেন? তবু অস্বীকারের গরজে হলেও তুমি জীবনেরই নাম নিচ্ছ। ঘটনাটা তাতেই প্যাঁচ খাইল। লক্ষণীয় ‘মতো’ শব্দটা। হ্যাঁ, ‘জীবনানন্দের মতো’ কবি তুমি হইতে না-চাইলেও কবিতা লেখার কাজে তাঁর মতো অমানুষিক মগ্ন পরিশ্রমী হইবারে তুমি চাইবে নিশ্চয়ই! কায়মনে তা-ই তো চাইবে বৈকি। কিংবা তোমাদের জেনারেশনে কি জীবনানন্দশ্রম নিয়াও সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল হয়? একবার শুধু, একটামাত্রবার, ভেবে দেখেছ কি — জীবনে সমস্ত অর্থে বিফল-ব্যর্থ ও ভগ্নমনোরথ একজন মানুষ কী-জাদুবলে-যে পঙক্তির পর পঙক্তিতে চারিয়ে যেতে পারে অমন জীবনস্পন্দন, বিস্ময় মানতে হয়। কিংবা ওঁরই কয়েনে বলতে চাইলে, বিস্ময়ে বিপন্ন হতে হয়, অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা-করা কারুকর্মীর কসমিক কাণ্ডকীর্তি দেখে অন্ধ চক্ষুষ্মান হয়ে হেঁটমুণ্ড বসে থাকতে হয়।

তবু জবুথবু এই শীতরাতে আমি কবিতা পড়ছি না, পড়ছি জীবনকাহিনি। পড়ছি অটোবায়োগ্র্যাফি জীবনানন্দ দাশ নামের মুখচোরা সেই মাস্টার মশাইয়ের। পড়ছি ডায়রি তাঁর। পড়ছি তাঁর লিখনকাহিনি। নিজে তিনি জীবনকাহিনি বা আত্মজীবনী লিখেন নাই, কিন্তু গুটিকয় নিবন্ধে-প্রবন্ধে এবং তাঁর বিশাল জর্নালে সেই জীবন সেই অটোবায়োগ্র্যাফির দেখা আমরা পাবো। গোপন রত্নগুহা থেকে আজও বেরোচ্ছে একের পর এক আকরিক, দুয়েকজন পরিশ্রমী প্রিয়ভাজন মানুষ সেসব আকরিক থেকে নিষ্কাশন করে আনছেন দরকারি ধাতু, অনুসন্ধিৎসু পাঠক তাতে বুঁদ হয়ে রয়েছে আজো।

পড়ছি জীবনের দিনলিপি। জীবনজর্নাল। তাঁর ভাষায় এইগুলি লিটারারি নোটস । পড়ছি জীবনানন্দের দিনলিপির প্রারম্ভিকা, ভূমেন্দ্র গুহ মহাশয়ের বয়ানে। একটা, আবারও, নতুন বই উপহার দিয়েছেন আমাদেরে বাবু ভূমেন্দ্র — আলেখ্য : জীবনানন্দ  নামক অনবদ্য সেই বইটার পর — বইয়ের নাম এইবার সিম্পলি জীবনানন্দ সঞ্জয় ভট্টাচার্য । বেরিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের গাঙচিল  থেকে। সুন্দর একটা প্রকাশনা, উন্নত ও উচ্চপ্রশংসার্হ, মানের দিক থেকে সর্বাঙ্গ সৌকর্যমণ্ডিত উৎপাদন। খরিদমূল্য একটু বেশি অবশ্য, সাড়ে-পাঁচশ টাকা পাক্কা, ও কিছু না অন্তত ওই বইয়ের তুলনায়। এইটা হাতে নিলেই আপনি বুঝবেন আপনাআপনি। তারিয়ে তারিয়ে পড়বেন, আর তাকিয়ে থাকবেন বেদনার পানে একবার, ঘাড় ফিরায়ে মুখ তুলে ফের নক্ষত্রের পানে …

জীবনানন্দকে অতিক্রম করা যায় না? — আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারার মতো নবদশকের এক জমকালো কবি। ক্লিন্ট ইস্টউডের ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন সিরিজের সিনেমাক্যারেক্টারগুলো ফলো করে এই প্রশ্নের অ্যান্সার করি। রুক্ষ্ম দুপুরে শেরিফের অফিসস্টেশনের সামনে ডুয়েল গানফাইট, লোকজন পানশালা আর সেল্যুন প্রভৃতির বারান্দায় আড়পায়ে দাঁড়িয়ে চুপচাপ তামাশাদর্শক, ব্যুম শব্দমাত্রই পুরনো রংবাজ ধুলোস্যাৎ। হোলস্টারে গান গুঁজে নিয়ে মন্থর কিন্তু কনফিডেন্ট পায়ে সম্ব্রেরো হ্যাট ঝুঁকিয়ে ড্যামকেয়ার আউটসাইডার ঢুকে গেল কৌতূহলী চোখের কুর্নিশ ও ভয়মেশা তারিফ অবজ্ঞায় ঠেলে সরায়ে সেল্যুনকাউন্টারে একমগ বুনো বিয়ারের পানে। শহরে এক নতুন আউট-ল’ আবারও। পত্তনি হলো তার, প্রতিপত্তিও হবে ক্রমশ। নতুন সকাল, নতুন স্ট্যাবল, নতুন পনি-স্ট্যালিয়ন, রেঞ্চমালিকের লোভনীয় অফার, নীলচোখা নারীর ক্রোধস্ফুরিত নাসিকা ও বিলোল কটাক্ষ ইন-ক্লোজ-শট।

ফুঃ! ম্যান! ব্যাপার না। ঢাকায়া ডায়ালেক্ট দিয়াই জীবন কেন শুধু, মরণ-বাঁচন ধরম-ভরম সমস্ত দুচে দেবো দেখবা। ফা … বাং … ক — শ্রাগ করতে করতে নীল ধ্রুবতারা বাংলা কবি মিলায়া যায় জয়েন্টের ধোঁয়ায়, আরাধ্য মহাকালে, ক্লেদে কালিমায়।

লেখা / জাহেদ আহমদ ২০১৩

… …

জাহেদ আহমদ

COMMENTS

error: