গুপ্তসাহিত্য

গুপ্তসাহিত্য

কবি কোনোকালে গণ্ডায় গণ্ডায় জন্মায় না। সুতরাং কবিতালেখক, আপনি নিজেকে দুর্ভাগা মনে করবেন না, উদ্বিগ্ন হবেন না, রেডিও টেলিভিশন সংবাদপত্রে প্রচারিত হবার জন্যে ছুটোছুটি করবেন না। বরং বাসনাহীন হয়ে বইটি নিজের খরচায় ছাপুন, এবং তারপরে শক্ত মলাটে বাঁধিয়ে, ভালো করে কীটনাশক মাখিয়ে কালের গর্ভে নিক্ষেপ করুন। মৃত্যুর পরে, অনেক দিন পরে, আপনি জানতে পারবেন আপনি কবি ছিলেন কি না।

চাঁদের ওপিঠে   একটা প্রবন্ধবইয়ের নাম। বইয়ের প্রবন্ধগুলি লিখেছেন মণীন্দ্র গুপ্ত। বইটা ছাপা হয়েছে ১৯৯১ সালে। এই নিবন্ধটি লিখিত হবার সনানুক্রমে এর উমর পঁচিশ পূর্ণ হয়েছে। এরপরেও বছর বহু গড়িয়েছে। একের পরে এক পঁচিশও বোধহয় একদিন গড়াবে।

একটা বইয়ের বয়স পঁচিশ হলো, প্রায়, এইটা একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এমন প্রতিদিন কত কত বইয়ের পঁচিশ পদার্পণ হচ্ছে, সেই হিসাবটা রাখতে পারলে কতই-না ভালো হতো! মণীন্দ্র গুপ্ত মূলত কবি — মৌপোকাদের গ্রাম, লাল স্কুলবাড়ি, নমেরু মানে রুদ্রাক্ষ   ইত্যাদি তার কবিতার বই — কিন্তু গদ্য লেখেন তিনি এমনকি তার কবিতার চেয়েও অন্তর্যামী নির্জন স্বরে। এইটা দেখা যায় যে, একজন ভালো কবি সবসময় গদ্যটাও ভালো লেখেন। উল্টোটা দেখা গিয়েছে কখনো? মানে একজন শৌর্যশালী গদ্যকার ভালো কবিতা লিখেছেন কোনোকালে? খুঁজে দেখতে হবে, কালের তোরঙ্গের কোনো-এক কর্নারে ন্যাপথলিনের বড়ির পাশে, কে জানে পেয়ে যেতেও পারি।

হিতোপদেশ   শিরোনামে একটা প্রবন্ধ আছে চাঁদের ওপিঠে   বইটিতে, (প্রবন্ধ বললে এইসব সুশ্বাস রচনারাজির ঠিকঠাক বর্ণনা হয় না আসলে; প্রবন্ধ জিনিশগুলাতে একটা শ্বাসকষ্টকর দমবন্ধ ব্যাপার আছে, যা মণীন্দ্ররচনা বা শঙ্খগদ্যে একেবারেই নিরুপস্থিত, অথচ প্রবন্ধ, অথচ প্রবন্ধ নয়) সেই হিতোপদেশ   থেকে একটা প্যারা উদ্ধৃত করা গেল উপরাংশে। এইরকম ছ-সাতটা নাতিদীর্ঘ-অনতিক্ষীণ রচনা নিয়াই নির্মিত বইটা চাঁদের ওপিঠে, এইটা মণীন্দ্র গুপ্তের প্রথম প্রকাশিত গদ্যবই, যদিও প্রথম কবিতাবই বেরিয়েছে নীল পাথরের আকাশ   ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে। এছাড়াও গদ্যবই পরে যেগুলো বেরিয়েছে, সেগুলোতেও ওই চাঁদের ওপিঠের সুনসান অপার্থিবতার ছটা ছড়ানো, এত অবিরল নিরিবিলিতা বাক্যে-বাক্যান্তরে। কুড়ানী দারুমা সান, জনমানুষ বনমানুষ — মণীন্দ্রগদ্যের আরও দুইটা বই, যেমন অক্ষয় মালবেরি   তার আত্মজীবনী। কিছুদিন আগে একটা বই দেখেছি তার, রং কাঁকর রামকিঙ্কর, পড়িনি। কিন্তু এমনও হতে পারে এখন যে, এই বইগুলো আলাদাভাবে পৃথক মলাটে সুলভ সর্বত্র না-ও হতে পারে, একটা ভালো খবর হলো যে মণীন্দ্র গুপ্তের গদ্যসংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে বছর-চারেক আগে, দে   থেকে, যেমন তার শ্রেষ্ঠ কবিতা   ও অন্য অনেক বইয়ের প্রকাশক দেঅক্ষয় মালবেরি  বেরিয়েছে অবভাস   থেকে।

কথা হলো, মানুষের জন্মই তো হয় কবি হিশেবে। জন্মের পরেই সে শব্দোচ্চার করে যেহেতু, শব্দই শেখানো হয় যেহেতু তাকে, একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত স্রেফ বিস্ময়জাগানিয়া আগডুমবাগডুম অর্থানর্থ-উর্ধ্ব ব্রহ্মনাদ অনুশীলন করার ভেতর দিয়া যায় সে যেহেতু, কাজেই মানুষ তার জন্মসূত্রেই কবি। কিন্তু নাড়ি যেমন কাটা হয় একটা স্টেজে, তেমনি মানুষ একটা পর্যায়ে এসে শব্দের সেই বিস্ময়জাগানিয়া ব্যবহার প্রভৃতির বাইরে অন্যান্য ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং কবিজন্মপরিচয়টি সে হারাইতে থাকে ক্রমে এবং একসময় সে নাৎসি বা অন্য কোনো সিন্ডিকেটের মেম্বার বা মেম্বার্সেক্রেটারি বা চেয়ার্পার্সন হয়ে ওঠে।

রেডিও টেলিভিশন সংবাদপত্রে ব্যাঙ্কে বা বিমা কোম্প্যানিতে দৌড়ঝাঁপের হ্যাপা আপনাকে পোয়াতে হবে না, হে আগামী দিনের কবি, আমি আপনাকে একটা ভালো পথ বাৎলায়ে দিতে পারি। কিন্তু আমার কথা আপনি একিন করবেন কি করবেন না, তা আমার মামলা না। আপনাকে আমি এ-মুহূর্তে পুরো প্রকল্প প্রোপোজাল সবিস্তার বোঝাতে পারব না, সেই সময় আপনারও হাতে নাই ভাবাটাই তো স্বাভাবিক, আমি সংক্ষেপে ব্যাপারটা আপনাকে দেই। নিচে একবার ক্রল করে এলেই হবে।

ছেলে হোক মেয়ে হোক দুইয়ের অধিক সন্তান আপনাকে নিতে হবে, এইটা ফার্স্ট কন্ডিশন, এবং এর মধ্য দিয়া আপনি কিন্তু অর্গ্যানাইজড একটা এস্ট্যাব্লিশমেন্ট সরাসরি ডিনাই করছেন। ব্যাপারটা অত জরুরি কিছু না-হলেও দ্রষ্টব্য কিন্তু! তো, সন্তান সাত থেকে এগারো বা সতেরো হতে পারে, দশ নয় কেননা হারাধনের এক্সপেরিয়েন্স আমাদের ভুলে গেলে তো চলবে না, আর অপয়া সংখ্যাটা নিজ দায়িত্বে বাদ দিয়া যাইয়েন, যেমন-সংখ্যকই হোক-না-কেন লক্ষ রাখুন সন্তানসংখ্যা যেন হয় প্রাইম নাম্বার অর্থাৎ কিনা মৌলিক সংখ্যা। মোদ্দা কথা, যত বেশি সন্তান তত বেশি কবি, তত বেশি লাইক তত বেশি কমেন্ট তত বেশি শেয়ার, ইভেন পোলাপান নিয়া আপনি নিজের একটা স্থায়ী গীতিনৃত্যনাট্যসংঘও ফর্ম করে নিতে পারবেন। ওই মৌলিকসংখ্যক সন্তানাদির কেউ হবে ব্যাঙ্কার, কেউ হবে বিমাকার, কেউ ফোনকোম্প্যানির সিইও, একদম বানে-ভাসা সন্তানটা আর-কিছু হতে পারুক না-পারুক কোনো চোরা এনজিওর ইডি তো হইতেই পারবে। ভেবে দেখুন, কত-সমস্ত ডায়ভার্সেফায়েড পকেট থেকে অ্যাওয়ার্ড আসবে, কত শত লণ্ঠনালো পড়বে এসে আপনার মুখে! এবং মৃত্যুদীর্ঘ পথ পর্যন্ত অপেক্ষা আপনাকে করতে হবে না, অ্যাকোর্ডিং টু আমার ব্যবস্থাপত্র, মরে যাবার অনেক আগেই, জীবনপ্রারম্ভেই, জেনে ফেলতে পারবেন আপনি কবি কি না, বা জানতে পারবেন কবি হিশেবে আপনার রেডিয়াস-পরিব্যাপ্তি কতটুকু।

কীটনাশক মাখানো নিয়াও অবশ্য আমার কিছু স্বোদ্ভাবিত প্রস্তাবনা আছে। এক ভিজিটে সর্বরোগহর ঔষধ প্রেস্ক্রাইব করা ডাক্তার খানিকটা লেস্-প্রেস্টিজিয়াস বলিয়া গণ্য হইতে দেখা যায় সমাজে। কাজেই বিরত রহিনু। তবে আমার কাছে বেশকিছু বইসংরক্ষক প্রিজার্ভেটিভ তৈরির ফর্ম্যুলা জানা আছে, সেসব স্বহস্তে বানায়ে নিতে পারবেন আপনি নিজেই; কিংবা ফর্ম্যুলাগুলোর জন্যও আমার কাছে আসতেই হবে এমন নয়, কেননা প্রোডাক্টগুলো আমার নিজের নয়, পেয়েছি এইরকম মণীন্দ্র-শঙ্খ-রবি-জীবন প্রমুখ হোমিওপ্যাথদিগের মেটেরিয়া মেডিকা বইগুলোতে।

অ্যানিওয়ে। একটা বোনাস ট্র্যাক জুড়ে দেবার জন্য মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতার বইপৃষ্ঠা হাতড়াচ্ছিলাম। গুপ্তকবিতা সমস্তই প্রিয় বিধায়, এবং কবিতাগুলা না-দীর্ঘ আবার হ্রস্বও না বিধায়, সিলেক্ট করা এবং পরে টাইপ করার অনীহা ও কুঁড়েমি ক্রিয়া করছিল। বহু খুঁজে একটা বার করেছি যা আশা করছি দ্রুতহস্তে টাইপ করে নেয়া যাবে। কবিতার নাম এখন ওসব কথা থাক,  রয়েছে লাল স্কুলবাড়ি   বইতে, এইখানে শ্রেষ্ঠ কবিতা   থেকে নেয়া হয়েছে অবশ্য।

এক লক্ষ বছর সঙ্গে থাকার পর সাব্যস্ত হবে, তুমি আমার কি না।
ওসব কথা এখন থাক।
এখন চলো মিকির পাহাড়ে বুনো কুল পেকেছে,
.                                           চলো খেয়ে আসি।

লাল রুখু চুল
.    সূর্যাস্তের মধ্যে …
.               অর্কিডের উজ্জ্বল শিকড়ের মতো উড়ছে।
.                — দেখি দেখি, তোমার তামাটে মুখখানা দেখি!

সূর্য এখনি অস্ত যাবে। পশুর মতো ক্ষীণ শরীরে
আমরা হাঁটু পর্যন্ত জলস্রোত পেরিয়ে চলেছি —
.                        জলস্রোত ক্রমশ তীব্র … কনকনে …

লেখা : জাহেদ আহমদ ২০১৩


জাহেদ আহমদ রচনারাশি

COMMENTS