বুদ্ধদিনের গান  || শিবু কুমার শীল

বুদ্ধদিনের গান  || শিবু কুমার শীল

কবি, চলচ্চিত্রকার বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমাদের জন্য রেখে গেলেন তার কবিতা আর চলচ্চিত্র। তার ছবি আর কাব্যের মাঝে আমরা বারবার তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করব। তাকে ভালোবাসব অথবা সমালোচনা করব। বাংলা অথরফিল্ম ধারায় তিনি নিঃসন্দেহে অনন্য এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

১৯৬৮ সালে ‘সময়ের কাছে’ নামে একটি ছোট ছবি নির্মাণের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু করেন। অবশ্য তিনি আলোচনায় আসেন ‘তাহাদের কথা’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীকালে ‘চরাচর’, ‘লাল দরজা’, ‘উত্তরা’ — এ-রকম একের-পর-এক কাজগুলো তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রকার হিসেবে খ্যাতি এনে দেয় ভারতে। ফিচার ফিল্মের বাইরে তিনি ১৩টি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেন উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে। ১৯৪৪ সালে জন্মেছিলেন এই নির্মাতা; — সে-থেকে এ-পর্যন্ত দীর্ঘ এক যাত্রা তাঁর। তিনি হয়তো তাঁর চক্র সম্পন্ন করেছেন। তাঁর এই বিদায়ে তাঁরই নির্মিত ‘উত্তরা’ ছবিটি সম্পর্কে দুইকথা বলতে চাই, যা কি না এক-ধরনের শ্রদ্ধাঞ্জলিই বলা যায়।

প্রথমেই বলি, ‘উত্তরা’ নানা কারণে আমার ভীষণ প্রিয় একটি সিনেমা। এই সিনেমা দেখলে যে-কেউ বুঝবে একটা রাজনৈতিক তত্ত্বের মোহে পড়ে তিনি এটি বানিয়েছেন। তাঁর এই ছবিতে যা যা তিনি হাজির করেছেন তা তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দর্শনেরই প্রতিফলন। তিনি সমাজটাকে যেভাবে ভাবেন বা ভাবতে চান সেসবকে সংকলিত করেছেন কিছুটা মাস্টারির ভঙ্গিতে। একটা নিপাট রিয়ালিজমকে পর্দায় হাজির না করে তাকে কিছুটা সাজেস্টিভ মেটাফোরের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন। ফলে ছবিতে আর্টের চেয়ে বাণী মুখ্য হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই এক্সপেরিমেন্ট ব্যর্থ হয়, লোকে যাকে বলে ক্লিশে। কিন্তু এই ছবিটি তা নয়। বরং এক অনন্য উদাহরণ।

যেমন লম্বা বা খাটো মানুষের দ্বন্দ্ব। খাটোরা মনে করে লম্বারা পৃথিবীর তেমন কোনো পরিবর্তন করতে পারেনি। মানে তারা পৃথিবীটাকে ইতিবাচক অর্থে বদলাবার ক্ষমতা রাখে না হানাহানি ছাড়া। তাই বামুন সম্প্রদায় যারা ‘নীল পাহাড়ের’ ওপারে থাকে তারাই দাশগুপ্তের সিনেমায় আশাবাদ হয়ে ধরা দেয়। এখানে দাশগুপ্ত নীল পাহাড়ের উপমার মধ্য দিয়ে এটাই যেন স্পষ্ট করছেন যে আশাবাদেরা নীল পাহাড়েই থাকে। মানে এখানে এই মুহূর্তে কোনো আশা নেই। ঋত্বিকের ‘সুবর্ণরেখা’-র শেষে সেই ছোট্ট ছেলেটি যখন ওর মামাকে ওই নীল পাহাড়ের কাছে নিয়ে যেতে বলে — এ যেন সেই উপমার নীল পাহাড়। যেখানি শান্তি আর আশাবাদ। বা যেখানে আমাদের ফেরার কথা ছিল।

আর সেই বৌটা যে কি না সকল নির্যাতিত ঘরহীন মানুষের প্রতীক হিসেবে হাজির হয়, সেও তাঁর মুক্তি বা আশ্রয় খোঁজে সেই খাটোদের সমাজেই। এ-রকম উপমা-উৎপ্রেক্ষায় এই সিনেমা ভরপুর। যারা সিনেমায় নীতিকথা শুনতে চায় না তারা ভীষণ বিরক্ত হবে এই সিনেমা দেখলে।

স্টেশনের সেই দুজন লাইন্সম্যান যারা কেবল কুস্তি করে। এই প্রতীকী কুস্তির সাথে বিশ্বচরাচরের নানাবিধ ঘাত-সংঘাতকে এক করে দেখা যায় চাইলেই। সুয়ো আর দুয়োর লড়াই। সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার হলো তিনি ভারতে ক্রিশ্চান ধর্ম প্রচারে আসা সেই প্রখ্যাত গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইনকে যেভাবে এই ছবিতে এনেছেন তা ভয়াবহ। যাকে বলে নৈরাশ্যের চূড়ান্ত। ভারতে হিন্দুত্ববাদের আজকের যে আগ্রাসন তিনি অনেক আগেই টের পাচ্ছিলেন এবং তাকে নানাভাবে তাঁর ছবিতে নোকতা রূপে টুকে রাখছিলেন। এ যেন তারই নমুনা। কে না জানে যাজক গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইনকে ধর্মোন্মাদ বজ্রংদল পুড়িয়ে মেরেছিল সেই কবে। যদিও সেই মৃত্যুর বিচারে গ্রাহামের স্ত্রী এবং কন্যা সকল খুনীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন হয়তো ভেবেছিলেন প্রভু নিশ্চয়ই তাদের শুভবুদ্ধির উদয় ঘটাবেন একদিন। কিন্তু আদতে তা কী হয়েছে? বজ্রংদল দিনে দিনে আরও শক্তিশালী হয়েছে। এবং সে নারদ মুনি নরেন্দ্র মুনি হয়ে ফিরে এসেছে ধরাধামে। এজন্যই শুরুতে বলেছিলাম এই সিনেমা বুদ্ধদেববাবুর রাজনৈতিক প্রকল্প এবং অবশ্যই তাঁর ব্যক্তিগত দর্শনের হাজিরা।


বুদ্ধদেব এই চলচ্চিত্রে যেখানে সবচেয়ে বড় মাস্টারি করলেন সেটা গান এবং সংগীতের ব্যবহার। সিনেমায় সংগীত আমাদের এখানে বহুদিন থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে, কিন্তু তা কী রূপে? হলিউডি ছাড়া আর কী? অথচ ভিজুয়ালের সাথে শ্রুতির যে মেলবন্ধন প্রাচ্যে আমরা দেখি বিশেষ করে লোকফর্মের মধ্যে যা তীব্রভাবে হাজির সেই ফর্ম কখনও সিনেমায় আসে না। আর একটা কথা স্বীকার করতে হবে যে জনাব দাশগুপ্ত উত্তরাতে যেভাবে ছৌ নৃত্যকে গল্প বলার অল্টারনেটিভ ফর্ম হিসেবে হাজির করলেন তার জন্য নিশ্চয়ই তিনি আকিরা কুরোশাওয়ার ‘ড্রিম’-এর কাছে খানিকটা ঋণী। এটা আমার ধারণা। ‘ড্রিম’ যারা দেখেছেন তারা হয়তো অনুমান করতে পারবেন। কিন্তু সে আরেক কথা। দাশগুপ্ত যেভাবে তাঁর গল্পবলার পদ্ধতির মধ্যে এই ছৌ নৃত্যকে হাজির করলেন তা কোনোক্রমেই বাড়াবাড়ি বা আরোপিত লাগেনি বরং এক অনন্য মাত্রা যুক্ত করেছে। যখন ছবিতে একটা সমাধানহীন নিষ্ঠুর পরিস্থিতির তৈরি হয় আর ঠিক তখনই ত্রাতারূপেই যেন হাজির হয় ছৌ নৃত্যের মুখোশপরা অতিমানবেরা। এই গানগুলো তখন কেবল নিছক আবহসংগীত থাকে না। কানের বা ভিজুয়ালের আরাম হিসেবে ব্যবহার হয় না বরং এটাকে তিনি গল্পবলার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।

বাঁকুড়ার এই-সমস্ত গান সেই গল্পটিকে আরও জীবন্ত ও মর্মন্তুদ করে তোলে। মানুষের অসহায়ত্ব, মুক্তির জন্য পালিয়ে বেড়ানো, আর মানুষের নৃশংসতার এক চমৎকার ডেমন্সট্রেশন এই ‘উত্তরা’। আমি সেই কবে থেকে এই গানগুলো দেখে দেখে নিজেকে প্রস্তুত করছি আমার নিজের গল্পটা একদিন আমার মতো করে বলব বলে!

বিদায়, প্রিয় নির্মাতা! আমরা আপনাকে ভুলব না।


শিবু কুমার শীল রচনারাশি

শিবু কুমার শীল

COMMENTS

error: