রাধারমণ বিষয়ে ব্যক্তিগত || মোস্তাক আহমাদ দীন

রাধারমণ বিষয়ে ব্যক্তিগত || মোস্তাক আহমাদ দীন

রাধারমণের সঙ্গে — বলা উচিত রাধারমণের গানের সঙ্গে — পরিচয় হয়েছিল শৈশবে।

জ্বর না বসন্ত হয়েছিল ঠিক মনে পড়ছে না, তবে এটুকু মনে আছে যে, আচার্যবাড়ি থেকে গণক-কাকার ঝাড়ফুঁক নিয়ে ঝিমমারা দুপুরে বারান্দায় এসে বসেছেন মা — আমি কোলে  —ধীর লয়ে গাইছেন : ‘আসবে শ্যামকালিয়া / কুঞ্জ সাজাও গিয়া।’ সেই গান শুনে কী অনুভূতি হয়েছিল তখন, তা আর মনে নেই, কেন গাইলেন তাও বুঝতে পারিনি, তবে এখন একটুআধটু বুঝতে পারছি। বাবা ব্যবসা-সূত্রে থাকতেন ঢাকায়, সেই সময়ে — সেই সত্তরের দশকে তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহকুমার প্রত্যন্ত গ্রাম ইসহাকপুর [আদিনাম ইসাগপুর] থেকে ঢাকার যে-দূরত্ব, সে-তো বিদেশই, চিঠি আর টেলিগ্রাম ছাড়া তো যোগাযোগেরও কোনো উপায় ছিল না। যানবাহনের অবস্থাও তো করুণ : অনেক পথ হাঁটার পরে নৌকা, এরপর নৌকায় আরও বহু পথ, তারপরে ভাঙাচোরা গাড়িতে চড়ে সিলেটে গিয়ে মেল ট্রেন — সেই হিসেবে মা তো প্রোষিতভর্তৃকাই, তাই তার মুখেই মানায় সেই গান :

আসবে শ্যাম কালিয়া, কুঞ্জ সাজাও গিয়া
এগো কেন গো রাই কানতে আছ পাগলিনী হইয়া।।

জাতি যুথী ফুলমালতী আন গো তুলিয়া
এগো মনসাধে সাজাও কুঞ্জ সব সখি মিলিয়া।।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমরা কেশবপুরের রাধারমণ দত্তের পড়শিগ্রামের অধিবাসী হলেও জন্মসূত্রে [বা চলতি ধর্ম অনুযায়ী] পরধর্মী; আমার নানা উসমান উল্লা মুহুরি ছিলেন যথা অর্থেই ধর্মপ্রাণ, বাবা দেওবন্দি ঘরানার মওলানা। পাশের গাঁয়ের স্কুলে পড়াতে গিয়ে মাকে বাবার মনে ধরেছিল কি না সে-তথ্যের সত্য-মিথ্যা যা-ই হোক, নানা কিন্তু বুঝে-শুনে এক পাক্কা মওলানার ঘরেই তাঁর একমাত্র মেয়ে — পাঁচ ভাইয়ের আদরের বোন — সুফিয়া খাতুনকে তুলে দিয়েছিলেন। এখন মাঝেমাঝে ভাবি আমার মওলানা বাবা কি কোনোদিন মাকে রাধারমণের গান গাইতে শুনেছিলেন? বা, শুনে থাকলেও কি কখনো গান গাইতে নিষেধ করেছিলেন? মনে হয় না। বাবা মারা যাওয়ার  কয়েক বছর পরে মা যে-মহিলাকে তার সর্বক্ষণের সঙ্গী করে নিয়েছিলেন — এখনো আছেন — সেই আফিয়া বেগম ওরফে খেলার মা ছিল সুনামগঞ্জের বাউল আলমাসের মেয়ে। তার কাছ থেকে একটি বারমাসী, কিছু অনামা লোকগান এবং রাধারমণের ‘আমায় নারীকুলে জন্ম দিলায় রে’ গানটি সংগ্রহ করেছিলাম। খেলার মার কণ্ঠ  সুরেলা, তার দুই দেবরের একজন আব্দুল হান্নানের এখনকার ধর্মীয় লেবাস দেখলে এখন কেউ কল্পনাই করতে পারবে না যে তার কণ্ঠেই একসময় শোনা যেত সৈয়দ শাহনূর, রাধারমণ, আছিম শাহ, দুরবিন শাহ ও শাহ আবদুল করিমের গান। অন্য দেবর আব্দুল তাহিদের একচোখ ছিল ট্যারা, কিন্তু বাঁশি বাজালে আশপাশের ছেলেবুড়োরা এসে ভিড় করত; আমরা ছোটরা মাগরেরের আজান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাঁয়ের বিশাল শিমুল গাছের নিচ দিয়ে যখন ফিরতাম তখন প্রায়দিনই হিন্দুবাড়ির মহিলারা বের হয়ে, সম্ভবত রাধিকারা/কুলবধূরা ঘরছাড়া হয়ে যাবে, এই ভয়ে/সংস্কারে বাঁশি বাজানো বন্ধ করার জন্য অনুনয় করতেন, কথা না শুনলে গালাগালও করতেন। মহিলারা কেন এমন করতেন, সেই বয়সে তা বোঝার কথা না, কিন্তু এখন হলে নিশ্চয় মনে পড়ত রাধারমণের গান :

কথায় বাঁশি মন উদাসী কোন নাগরে নিল মনপ্রাণ হরে।
কী মোহিনী জানে বাঁশি রইতে না দেয় ঘরে।।

শুনিয়া বাঁশির ধ্বনি হল প্রাণশূন্য তনুখানি
আছে কোন কামিনী ধৈর্য ধরে, যেন বংশী বড়শির মতো মীণাকর্ষণ করে।।

অন্য গান :

কদমতলে কে বাঁশি বাজায় গো ওই শোনা যায়।
এগো শ্যামের বাঁশি ধ্বনি শুনিয়ে গৃহে থাকা হইল দায়।।

অথবা :

ও শ্যাম তোরে করি মানা, তুমি মোহন বাঁশি আর বাজাইও না।
বন্ধু রে সানঝাকালী বাজাও বাঁশি
গোপীর মন করো উদাসী
ও রে শ্যামকালিয়া সোনা।।

আব্দুল তাহিদের বংশী শুনে কেউ কোনোদিন ঘর ছেড়েছিল কি না জানি না, কিন্তু একদিন ঘুম থেকে উঠে শুনি বংশীধারী আব্দুল তাহিদ আর নেই। কিন্তু বংশীধারী মারা গেলেও, তার ভাই আব্দুল হান্নানের গান অনেক অনেক দিন আমাদের বাড়িতে শোনা গেছে। খেলার মা, আব্দুল হান্নান, আব্দুল তাহিদ এদের দারিদ্র্য আর জীবনযন্ত্রণার শেষ নেই, মাকে সময়ে-অসময়ে নানা অছিলায় এদের সহায়তা করেছেন, আর খেলার মা তো আমাদের ঘরে রাধিকার সহচরীর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। নানারকম মানুষের সমন্বয়ে তলে তলে আরেকটি সংসার ছিল মায়ের, বাবার নিষেধ থাকলে কি গানের জগতের এইসব মানুষের সঙ্গে এইভাবে জড়াতে পারতেন? বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের ৩টি ঘরের টানাছাদের নানা জায়গায় বড় বড় কিতাবের সংগ্রহ দেখেছি, সেখানে শুধু ফতোয়া আর ইসলামের ইতিহাসের বই ছিল না, ছিল সিকন্দরনামা সহ আরবি-ফারসি কাব্যের অমূল্য সংগ্রহও। এই সব বইয়ের কোথাও বোধহয় গানবিরোধী কোনো কথা নেই, থাকলে নিশ্চয়ই আমার মাকে তার নির্দেশনা পালন করতে বলতেন, অথবা হয়ত শাস্ত্রে নিষেধ ছিল, কিন্তু এ-বিষয়ে শাস্ত্রবিরোধী মত বা দ্বিমত ছিল তার।

গান বিষয়ে বাবার কোনো স্পষ্ট নির্দেশ না থাকলে কি আর আমাদের বোন-ভাগনি-ভাতিজিরা যখনতখন ধামাইল শুরু করে দেওয়ার সাহস দেখাতে পারত? সেই সব ধামাইলে কালেভদ্রে পাশের বাড়ি খেকে করুণা কাকার মেয়ে বাণী-শুনি-পুতুলরাও এসে যোগ দিত, না হলে সবসময় মুসলমান ঘরের মেয়েরাই। আর বলাই বাহুল্য, এরা সকলেই যুবতী। তাই বলে এমন নয় যে ধামাইল শুধু যুবতীদেরই নৃত্যগীত, যে-কোনো বয়সের মেয়েরাই এতে যোগ দিতে পারে। এক স্মৃতিকথায় খালেদ চৌধুরী —  পিতৃদত্ত নাম চিররঞ্জন পুরকায়স্থ — তাঁর দিদিমা [গুরুসদয় দত্তের বড় বোন] কাত্যায়নী পুরকায়স্থের কথা লিখতে গিয়ে লিখেছেন, ‘এই নাচের একজন প্রবক্তা’ ছিলেন তিনি, তিনি ষাট বছর বয়সেও যখন নাচতেন তখন তাকে মনে হতো কোনো ষোলো বছরের মেয়ে বুঝি নাচছে। খালেদ চৌধুরী তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন, মহিলারা যখন নাচতেন — বিশেষত বিজয়া দশমীতে — তাদের কাপড় বেসামাল হয়ে পড়ত বলে পুরুষদের বের করে দেওয়া হতো। এসব নাচে প্রধানত রাধারমণ দত্তের গানই যে গাওয়া হবে, সে আর আশ্চর্য কী। খালেদ যে-সময়ের কথা বলছেন, তারও প্রায় ছয় দশক পরে আমার দেখা অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন, আমার মা-চাচি-মামিদের গানে অংশগ্রহণ করতে দেখলেও নাচে যোগ দিতে দেখিনি; তবে যুবতীরা যখন নাচত তাতে নানা ঔচ্ছল্য দেখেছি, তার তোড়ে কাপড় বেসামাল হতো কি না তা আর এখন মনে পড়ছে না। সেই সব নাচে বেশিরভাগ সময়ই গাওয়া হতো, ‘আমি রব না রব না গৃহে, বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না’, ‘জলে গিয়াছিলাম সই’ প্রভৃতি গান।

পরে এই গানগুলিই যখন ধামাইলের  নমুনা হিসেবে নগরমঞ্চে পরিবেশিত হতে দেখেছি তখন তার চলন-বলন দেখে না হেসে পারিনি, এমনকি গাঁও গেরাম থেকে এসেও যারা ধামাইল পরিবেশন করেছে তাদের মধ্যেও কৃত্রিমতার শেষ নেই. হয়ত আয়োজনের কারণে বা নাগরিক দর্শক-রুচির কথা তারা ভুলতে পারে না বলেই হয়ত উপস্থাপনায় কোনোধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ করা যায় না। আমার মনে হয় এই রকমের অভিজ্ঞতার কারণেই হয়ত খালেদ চৌধুরী ধামাইল নিয়ে ছবিটি এঁকেছিলেন, এখনকার দর্শকদের কাছে সেই ছবিটি একটু কল্পনারঙিনই লাগবে, কারও-কারও কাছে মাতিসের ছবির কথাও হয়ত মনে পড়বে, কিন্তু তিনি নিরন্তর স্মৃতিতাড়িত থাকতেন বলেই তাঁর ছবিতে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রতিফলন চেয়েছিলেন এবং সেক্ষেত্রে তিনি সফলও হয়েছিলেন। লোকসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সেটি যে-অঞ্চলের সংগীত, পাঠকের মনে সেই পরিবেশের দৃশ্য ভেসে উঠুক, তার আবেগ সঞ্চারিত হোক, এমনটিই চাইতেন [কণ্ঠশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও কণ্ঠ/চিত্রশিল্পী খালেদ চৌধুরী,] আর এখানে তো [তুলনায় আরেকটু সহজ] দৃশ্য আঁকার সুযোগ, সুতরাং তা তো কাজে লাগাবেনই তিনি। এখন আমরা যেভাবে যেদিকে যাচ্ছি, পরবর্তী প্রজন্মের গবেষক ও সদস্যরা হয়ত ধামাইল নৃত্যের পরিচয় এই সকল ছবির ভেতর দিয়েই দেখতে চাইবে।

কথাটি এজন্যই বলছি যে, ধামাইল গানের ওপর কিছু কাজ হয়ে যাওয়ার পরও এবং তাতে বিনোদনের উপাদান থাকা সত্ত্বেও এ-ই যদি হয় ধামাইলের রূপ-রীতি নিয়ে আমাদের নাগরিক প্রচারণা, তাহলে অন্যান্য ক্ষেত্রে কী হবে তা আন্দাজ করা যায়। রাধারমণ বিষয়ে একথা বলার কারণ, ধামাইলে পরিবেশিত রাধারমণে এই বহুপরিচিত গানগুলি নিয়েই যেহেতু এই অবস্থা, বাকি গানগুলোর অবস্থা কতটা আশংকাজনক হতে পারে তা কল্পনা করা যায়। ২০১৫ সালে অনেক ঘটা করে রাধারমণ নিয়ে অনেক অনুষ্ঠান যে হলো, সেসব জায়গায় রাধারমণের কয়টি গান গাওয়া হয়েছে? প্রায়ই এসব অনুষ্ঠানে একই গান একাধিক শিল্পীকে গাইতে দেখা যায়। কেন? মনে পড়েছে, ছোটবেলা বহুবার শুনেছি এমন অনেক গানই তো এখন আর গাওয়া হয় না। আমার গ্রামের সিকন্দরচাচা, যিনি পরে কট্টর তবলিগপন্থী, তবলিগি হওয়ার আগে তো বলতেনই, পরেও কখনো কারও দ্বারা প্রতারিত হলে, কারও স্খলন দেখলেই তিনি  বলতেন :

তুমি চিনিয়া মানুষের সঙ্গ লইও
পাষাণ মনরে বুঝাইও

ভাইবে রাধারমণ কয়, শুন মহাশয় রে
তুমি রসিক পাইলে রসের কথা কইও।।

বোঝাই যায় অধ্যাত্মমূল্য রয়েছে গানটির, তবে মনঃশিক্ষামূলক এই গানটির প্রথম পদটি একসময় প্রবাদতুল্য মর্যাদা পেয়েছিল। মনঃশিক্ষামূলক আরেকটি গান একসময় গ্রামে-গঞ্জে খুব শোনা যেত :

ওরে মন কুপথে না যাইও
ঘরে বসি হরিনাম নিরবধি লইও।।

পরবর্তী সময়ে এই গানটি নানা সংকলনে দেখার সুযোগ হয়েছে, তবে প্রথম পদটি বাদে, বাকি পদগুলির সঙ্গে সৈয়দ শাহনূর ও আছদ আলির একটি গানের মিল লক্ষ করা যায়। বিশেষ নিম্নোক্ত পদটি তো তিন মহাজনের নামে প্রায় একইভাবেই রয়েছে :

ভাইবে রাধারমণ বলে নদীর কূলে বইয়া
পার হইমু পার হইমু বইলে দিন ত যায় গইয়া।।

এই পদের স্বত্ব নিয়ে মীমাংসায় পৌঁছা মুশকিল, এর দোষ কোনোভাবেই পদকার মহাজনদের উপরে পড়ে না, এঁরা তিনজনই স্ব স্ব ক্ষেত্রে কৃতী ও অনন্য, [তিনজনই বৃহত্তর সিলেটের অধিবাসী], দোষ কিছু থাকলে ভক্ত বা অচেতন গায়কের হতে পারে। এই তিনজন মহাজনের মধ্যে রাধারমণের জনপ্রিয়তা বেশি বলে সংকলনভেদে তাঁর গানের ভিন্ন ভিন্ন পাঠ দেখা যায়, আবার সংকলকের মন্তব্য ছাড়াই একই সংকলনে একই গানের ভিন্ন পাঠও দেখা যায়। এই সব নিয়ে বহুদিন কথাবার্তা ওঠেনি, এখন উঠছে, উঠছে একাধিক রাধারমণের কথাও — সবমিলিয়ে রাধারমণের গানের নির্ভুলতা, নির্ভুল জীবনতথ্য নির্ণয় সহজ নয়।

রাধারমণের গানের সংগ্রাহক ও ভক্ত, যিনি রাধারমণকে দেবতা বলে গণ্য করে ঠাকুর সম্বোধন করতেন, রাধারমণগান নির্ভুলভাবে গাওয়ার জন্য যিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, গান প্রচারের জন্য বৃদ্ধ বয়সে বৃহত্তর সিলেটের নানা জায়গায় অনুষ্ঠান করে বেড়িয়েছেন, সেই নূরুল ইসলাম চৌধুরীকে এ-বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, রাধারমণ বেভুল অবস্থায় অনর্গল গান গাইতেন এবং দিব্যোন্মাদ থাকতেন বলে তার কণ্ঠ থেকে যা-ই বের হতো তা-ই ছিল গান, তার কয়টা গান সংগ্রহ করা সম্ভব? তার নির্ভুলত্ব নির্ণয় করাই বা কীভাবে সম্ভব? নূরুল ইসলাম চৌধুরী নিজে মাত্র কয়টি গান ফটোকপি করে জনে জনে প্রচার করতেন, তাঁর মতে, সব গান প্রচারের দরকার কী? নূরুল ইসলাম চৌধুরীর রাধারমণপ্রেম নিয়ে প্রশ্নই ওঠে না, কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি রাধারমণ দত্তের জীবনতথ্য সংগ্রহের জন্য বাধা না হলেও গানের নির্ভুল পাঠ তৈরির এক বাধাও বটে।

রাধারমণ তাঁর গান ও জীবনব্যাপারের কারণে নিগৃহীত হয়েছিলেন, এ-রকম তথ্য সম্প্রতি কারও-কারও বক্তব্য ও লেখায় উঠে এসেছে, কিন্তু রাধামাধব দত্তের মতো পিতা যার, তিনি তার স্বজনদের কাছে নিগৃহীত হবেন, তা যদি সত্যও হয়, তবু মানা কষ্টকর। তাঁর বাবা রাধামাধব দত্ত সংস্কৃত ভাষায় জয়দেবের গীতগোবিন্দ-এর সছন্দ টীকা, ভারতসাবিত্রী  ও ভ্রমরগীতা  এবং বাংলায় কৃষ্ণলীলা কাব্য, পদ্মপুরাণ, সূর্যব্রত পাঁচালী  ও গোবিন্দভোগের গান রচনা করেন, এছাড়াও তাঁর আরও কিছু গান সংগৃহীত হয়েছে, এর কিছু না কিছু প্রভাব রাধারমণের উপরে পড়া স্বাভাবিক। রাধামাধব দত্তের একটি গানের চরণ এ-রকম :

পাক দিয়া বন্ধুয়ার পানে চাইও রাধার বন্ধুয়া রে,
ধীরে ধীরে তুমি যাইও।।

তারপরও এ-বিষয়ে কিছু শোনা কথার উল্লেখ করছি।

শুরুতেই বলেছি যে, আমাদের গ্রামের নাম ইসহাকপুর, উপজেলা জগন্নাথপুর, জেলা সুনামগঞ্জ, যার আদিনাম ইসাগপুর, ধারণা করা হয় এই দত্তপরিবারেরই একজন ইসাগ দত্তের নামেই এই নাম। এই সবই শোনা কথা, গাঁয়ের নানাজনের কাছে ছোটবেলায় শোনা। সেই সাথে এও শুনেছিলাম যে কেশবপুরের দত্তপরিবারের কেউ একজন কী কারণে জানি না ইসহাকপুরের দত্তপরিবারে এসে বেশ কিছুদিন  আশ্রয় গ্রহণ করেন অথবা আত্মগোপন করেন। এই ‘কেউ একজন’, যদি নিগৃহীত হয়ে থাকেন, তবে হয়ত রাধাররমণই হবেন, এই অনুমান সত্য হলে আমাদের গ্রাম একসময় কেন এতটা রাধারমণময় ছিল তার উত্তর মেলে। নূরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে নানা স্থানে-অস্থানে ঘোরাফেরা করার পর সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ামাত্রই কোনো ভূমিকা ছাড়াই রাধারমণ-বিষয়ে কোনো-না-কোনো তথ্য দিতেন, যেন আমিও তাঁর মতো নিরন্তর রাধারমণভাবিত কেউ, উপরিউক্ত তথ্য গাঁয়ে কারও কাছে না শুনে থাকলে, তাঁর কাছেও শুনে থাকতে পারি। কোনোদিন এ-বিষয়ে লিখব জানলে হয়ত তথ্যসূত্র লিখে রাখা যেত, আজ নিগৃহীত হওয়ার প্রসঙ্গে সেই কথাটি মনে পড়ায় তার উল্লেখ করা গেল। তবে, রাধারমণকে কেউ নিগৃহীত করলেই কী আর না করলেই বা কী, তিনি তো বহুদিন ধরেই তার গানের কারণে আমাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেঁড়ে বসে আছেন।

অবস্থা এখন বদলেছে, গ্রাম শহর সব জায়গায়ই এখন ধর্ম প্রবল, পথে-ঘাটে-বাড়িতে অসময়ে-অসময়ে যে-আব্দুল হান্নান গান গেয়ে বেড়াত, সে এখন তবলিগে যায়; মায়ের সহচরী খেলার মার গলাও এখন বসে গেছে এবং নিজের সিদ্ধিগ্রস্ত পাগল ছেলে আর বিধবা মেয়ের সংসারের ঘানি টানতে টানতে কুঁজো; লক্ষ করছি আমার মায়ের স্মৃতিও এখন দুর্বল, তবু এই সেদিনও, সেই যে আমাকে শুনিয়েছিলেন, তার তিন যুগ পরে দেখি আমার চার বছরের ছেলেকে শুনাচ্ছেন ‘আসবে শ্যামকালিয়া / কুঞ্জ সাজাও গিয়া’, শুনাচ্ছেন, ‘কালায় প্রাণটি নিল বাঁশিটি বাজাইয়া’,  আরও ক-যুগ পরে আমার ছেলেও নিশ্চয় কাউকে না কাউকে শুনাবে রাধারমণের সেই দুটি গান অথবা অন্য কোনো গান …

রাধারমণকে নিগৃহীত করবে কোন দুর্জন!

গানপারে এই লেখকের আরও রচনা

COMMENTS

error: