শিক্ষকশিল্পীর প্রতিকৃতি || দ্বীপ দাস

শিক্ষকশিল্পীর প্রতিকৃতি || দ্বীপ দাস

১৮ জুলাই সকালে সংবাদ পেলাম স্যার নেই। ভয়াল কোভিডে আক্রান্ত হয়ে ক-দিন যাবত সিলেট শামসুদ্দিন হাসপাতালে আইসিইউ তে ছিলেন। চলে গেলেন।

স্যারের কথা ঠিক কোন সময় ধরে বলব বুঝতে পারছি না।

শিল্পকলায় স্যারের ক্লাস করতে করতেই ঘনিষ্ঠতা। তারপর বিভিন্নভাবে একসাথে কাজ করা, আর্টক্যাম্পে স্যারের সাথে থাকা, বিভিন্ন কর্মশালায় অংশ নেয়া — আরও অনেক কিছু।

সবথেকে ভালো লাগার এবং গর্বের ব্যাপার হলো তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ও কামরুল হাসান উভয়েরই সরাসরি ছাত্র ছিলেন। সেই সুবাদে তিনি প্রায়ই বেশ আগ্রহ নিয়ে উনার ছাত্রজীবনে শিল্পবিষয়ক বিভিন্ন শিখন ও ঘটনার আলাপ জুড়তে পছন্দ করতেন। আমাদের কাজ ছিল বারবার একটু বড়গলায় ‘হ্যাঁ স্যার’ বলা। আমরা কিছুই বলতাম না দু-একটা প্রশ্ন ছাড়া।

আঁকার পাশাপাশি এত সুন্দর করে এত সাবলীল ভঙ্গিতে শিল্পকলার ও শিল্পচর্চার ইতিহাস বলতেন তা এখন এইসময়ে এত আকস্মিক অপ্রত্যাশিত অপ্রস্তুত শোকমুহূর্তে লেখা বা বর্ণনা করা আমার পক্ষে কেন স্যারের যে-কোনো ছাত্রের পক্ষেই দুঃসাধ্য।

যা-হোক, স্যারের দুটি প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে একটি বই শিল্প নিয়ে, নাম — ‘চারুকলার সামাজিক ইতিবৃত্ত’;  — এই বইটায় তিনি শিল্পকলাভুবনে তাঁর দীর্ঘ পদচারণার পথে পথে পাওয়া শিক্ষাবলি বিবৃত করে গেছেন। বইটা যারা পড়েছেন তারা বুঝবেন কতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তিনি দিয়ে গেছেন আমাদের বোধির উত্তরাধিকারের ঝোলায়।

একবার তিনি সৌরজগতের নানান বিষয় নিয়ে আমাদেরকে কী সাবলীল কতকিছু বলেছিলেন! কী শিহরণকর সুন্দর সেই শ্রবণ-অভিজ্ঞতা! স্যার অনেক বছর ধরে পেপারকাটিং জমা করেছিলেন সৌরজগতের, এবং তারপর থেকে আর বুঝতে বাকি থাকে নাই যে তিনি আর-সব সাধারণ শিল্পীদের মতো নন।

এমন অনেক গল্পবাস্তবতার কথা স্যারের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছিলাম, এটা জীবনে এক বিরাট পাওয়া বা সম্পদ বলতে পারেন; — এটাকে নিয়েই শিল্পচর্চার জীবন সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।

যে-কথা না-বললেই নয়, সিলেট তো বটেই অন্য কোথাও এখন/আজকাল এমন অমায়িক বিনয়ী ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষ আমি আজও দেখিনি। শিল্পী বলতে আমরা যা বুঝি তার শতভাগ স্যারের মধ্যে ছিল।

এখন তো অনেক কথা অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে। গত দুইদিন যাবত অনেককিছুই লিখতে মন চাইছে।হয়তো আরও লিখব কোনো-একদিন।

স্যারের জন্ম ১৫ মার্চ ১৯৫৩, ২৯ মাঘ ১৩৫৭; জন্মস্থান মাতুলালয়, আজমিরীগঞ্জ, হবিগঞ্জ। মৃত্যু ১৮ জুলাই ২০২১ সিলেট।

২০১৫ সালে জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমি পদক পান।

১৯৭৩ সালে ঢাকা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের রজতজয়ন্তী উপলক্ষ্যে আয়োজিত নবীন ও প্রবীণ চারুকলা প্রদর্শনীতে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার (জলরঙ) লাভ করেন।

আশির দশক থেকে স্যার সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত দুটো গ্রন্থের মধ্যে একটির নাম আগেই বলেছি — ‘চারুকলার সামাজিক ইতিবৃত্ত’ — অন্যটি ‘পবনে স্বপ্ন বুনি’; শেষোক্তটি স্যারের লেখা কাব্য।

বলা বাহুল্য যে সিলেটের আধুনিক শিল্পচর্চা ও এ-যাবৎ এই শহরে যারাই চারুকলা নিয়ে কাজ করছেন বা চর্চা করছেন তাদের বেশিরভাগেরই শুরুটা স্যারের হাত ধরে।

স্যার এভাবেই যেন থাকেন আমাদের সবার চর্চায়।

  • লেখায় (ব্যানারে এবং ভিতরে) ব্যবহৃত ‘অরবিন্দ দাস গুপ্ত’ প্রতিকৃতিটি নিবন্ধকারেরই তৈরি ট্রিবিউটপোর্ট্রেইট।

দ্বীপ দাস । চিত্রশিল্পী । শান্তিনিকেতনে অ্যাকাডেমিক চিত্রকলাপাঠ শেষে পেশাদার চিত্রী । দ্বীপ আর্ট ফোলিও (Dip Art folio)-তে এই শিল্পীর কাজ সম্পর্কে বেশ আন্দাজ পাওয়া যায়

… …

গানপার

COMMENTS

error: