তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতৃমূর্তি, সৈফুদ্দিন আহমদ, একটি বই, একটি চিত্র ও একটি বিদ্র

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতৃমূর্তি, সৈফুদ্দিন আহমদ, একটি বই, একটি চিত্র ও একটি বিদ্র

সেকালে ঢেঁকি ছিল মা-লক্ষ্মীর সোনার কাঠি। ওর ছোঁয়াতে মা ধান থেকে চালের রূপ নিতেন। তাছাড়া বাবা, ওই ঢেঁকি আমার এ বাড়ী আসবার আগের ঢেঁকি। যেখানটায় পায়ের ভর দিয়ে ঢেঁকিতে পাড় দেওয়া হয়, ওখানটায় দেখো পায়ের ছাপে ছাপে কাঠের অবস্থা ঠিক পালিশ করা কাঠের মত, দেখলে দেখবে দশটা পায়ের আঙুলের ছাপ আছে। আমার শাশুড়ীর পায়ের ছাপ আছে, আমার পায়ের ছাপ আছে, আমার তিন বউমার পায়ের ছাপ আছে।

এই কথাগুলো বলছেন যিনি, তিনি একজন মা, নিত্যসংসারে আমরা যে-বয়সে পৌঁছালে পরে সিনিয়র সিটিজেন বলিয়া সাব্যস্ত হই, নাতিপুতি পেয়ে পরিপুষ্ট ভরভরন্ত সংসারের বাংলাস্টাইলের চিরন্তন এক মাতৃমূর্তি ইনি। আমাদের তারাশঙ্করবাবুর মা। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা। আর এমনও নয় যে উদ্ধৃত কথাগুলো কোনো উপন্যাসের সংলাপ। অটোবায়োগ্র্যাফিক একটা স্কেচ থেকে এই উদ্ধৃতাংশ চয়িত।

উপন্যাস নয়, এইটা আলাদা জাতের বই, এই বইটার পাত্তা পাই নাই আমি এদ্দিন। হদিস দিয়েছেন আমাদের এক কলিগ, বইটা বাড়িয়ে দিয়েছেন পড়তে সেই তিনিই, অশেষ কৃতজ্ঞতা তাঁর প্রতি থাকছে এই সুযোগে। দীপক রায়। না, বইয়ের লেখক নন তিনি; দীপকদা মালিক এই বইয়ের। মহাজন বললেও গ্র্যামাটিক্যালি ভুল হবে না মনে হয়, যেহেতু বইটা ধার দিয়াছেন আমায় তিনিই। কিন্তু, সত্যি বলতে, বইটা ভালো।

উপন্যাসই লিখেছেন তারাশঙ্কর মশাই মোটামুটি তাঁর গোটা ক্যারিয়ার জুড়িয়া। বা আখ্যান, আখ্যায়িকা, ছোটগল্প ইত্যাদি। কিন্তু কী এমন রসগোল্লা আলাদা জাতের বই যার হদিস হার্ডকোর তারাপাঠকও রাখেন না? বাংলায় যে-কজনার উপন্যাসগল্প বহুলপঠিত তন্মধ্যে শরৎ-তারা-মানিক তো অগ্রগণনীয়। অ্যানিওয়ে। যেহেতু কারো মুখে এই কিতাবের নামোল্লেখ হইতে শুনি নাই, কাজেই আন্দাজ করছি ব্যাপারটা।

বই সম্পর্কিত তথ্য গুটিকয় এখানে রেখে এরপর কিয়দ্দুর আগানো যায় কি না ট্রাই করি। বইনাম গ্রামের চিঠি,  লিখেছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ছেপেছেন ২০৬ বিধান সরণী কলিকাতা-৭০০০০৬ থেকে প্রশান্ত ভট্টাচার্য। প্রকাশনাগৃহের নাম সারস্বত লাইব্রেরী । প্রকাশসাল ১৯৮৬ জুলাই। হস্তধৃত বইটা ফার্স্ট এডিশন, বলা বাহুল্য। প্রচ্ছদ করেছেন জনৈক সৈফুদ্দিন আহমদ। প্রচ্ছদচিত্রী বিষয়ে ১টি বি.দ্র. পড়ুন নোটনিম্নতলে।

কেমন বই গ্রামের চিঠি ? উত্তর : নামেই ক্লিয়ার, চিঠিপত্তরের। তার মানে কি ছিন্নপত্রাবলিজাতীয়? অবিকল তা নয়, ফের মেলানোও যায়। গ্রামচিত্র যেহেতু, কাজেই ছিন্নপত্রের সঙ্গে মেলাতেও পারেন কেউ। তবে চিঠিগুলো রচিত খবরের কাগজে হপ্তাহিক প্রকাশের চুক্তিগরজে। এরপরও অটুট এর আত্মজৈবনিকতা। আজকালকার কলামের আদিরূপ বলা যায়। ক্ল্যাসিকধর্মীয় কলাম। অত্যন্ত আন্তরিক বটে।

একনাগাড়ে ১০০টি চিঠি। বিন্যাস এমন : গ্রামের চিঠি /১  থেকে শুরু হয়ে গ্রামের চিঠি /১০০  পর্যন্ত। প্রতি হপ্তার গ্রামকোলাহল, রাজনীতি-অর্থনীতি-নিদানকাল-খরা-বন্যা-বারুনি-মেলা-পূজাআচ্চা, ঐতিহ্য-অবক্ষয়-নীতিনৈতিকতানাশ-মূল্যবোধবদল-পরিবেশলোপাট প্রভৃতি এই চিঠিযাবতীয়ের বিষয়। বেশিরভাগ চিঠিই সম্পাদক সমীপেষু কৌশলে লেখা। তাতে একটুও লিটারেরি ভ্যালু ক্ষুণ্ন হয়নি। বেশ লাগে পড়তে। জ্যান্ত।

দৈনিক যুগান্তর  শনিবারের সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় এই চিঠিগুলো পত্রপ্রণেতার স্বনামে ছাপা হতে থাকে। শুরু হয়েছিল ১৯৬৩ সালে, গত সহস্রাব্দের অন্তিম শতাব্দীতে, শেষ হয় ৬৫-র পোস্ট-অগাস্ট। তপোবিজয় ঘোষ, বইটির সম্পাদক, সেইসব চিঠির “৫৫-৬০ ভাগের মত অংশ এ গ্রন্থে মুদ্রিত” করেছেন বলিয়া জানাচ্ছেন সব্যাখ্যা ‘সম্পাদকের নিবেদন’ ফরোয়ার্ডে। লেগেছে ২৪০ পৃষ্ঠা। মোটামুটি ১৫ ফর্মা গাট্টাগোট্টা গ্রন্থ। উল্লেখ্য, দৈনিক যুগান্তর নামে একটা কাগজ বাংলাদেশেও বেরোত, বোধহয় বেরোয় এখনও, উল্লিখিত যুগান্তর অবশ্য ভারতীয় এবং বাংলাদেশী যুগান্তরের সিনিয়র।

সম্পাদক জানাচ্ছেন, বইয়ের কোনো-একটা জায়গায়, “তারাশঙ্করের সামাজিক-অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক জীবন এমন স্বচ্ছ অনাবৃতরূপে আর কোথাও ধরা পড়েনি — তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থেও নয়।” এমন তথ্যও অবগত হওয়া যায় গ্রন্থসম্পাদকভাষ্য সুবাদে যে এই চিঠিগুলো তারাশঙ্কর রচনাবলির সমগ্র নামধেয় গ্রন্থপ্রকল্পেও সঙ্কুলান করতে পারেনি স্থান কিংবা সামহাউ মিসডআউট থেকে গেছে। অন্তত ১৯৮৬ পর্যন্ত। পরবর্তীকালে অ্যাকোমোডেট হয়েছে কি? হয়েছে হয়তো।

নোটের উপরিভাগে টাঙানো উদ্ধৃতিটি ৮০ সংখ্যাসূচিত চিঠি থেকে নেয়া হয়েছে। চিঠি শুরু হয়েছে সে-সপ্তাহের অকালবৈশাখীজনিত তাণ্ডবোত্তর গ্রামগেরস্থালি ও ঘরের পুনর্গঠনচালচিত্র নিয়ে কথা বলতে বলতে, এসেছে প্রসঙ্গক্রমেই খড়চালা ছাইবার কারিগর তথা বাড়ুইদের পেশা পাল্টানোর আশঙ্কা, কথায় কথায় এসে যায় দিনপরিবর্তনের সঙ্গে ধেয়ে-আসা নানাকিছু লুপ্তির সঙ্কটকথা। আসেন তারাশঙ্করজননী :

চিঠি লিখছি, এমনসময় আমার বৃদ্ধা মা, ৮৪ বৎসর বয়স তাঁর, তিনি এসে দাঁড়ালেন। বললেন, ও বাবা, আমার ঢেঁকিশালের যে দুর্দশার শেষ নেই। ওটা তো মেরামত না করালেই নয়। রোজ তো দেখতে পারি নে; আজ দেখতে গেলাম, এই বৃষ্টিটা গেল তাই ভাবলাম দেখে আসি অবস্থাটা কেমন। কিন্তু দেখে যে চোখে জল এল আমার। চালটা এমন পচে গেছে যে সব জলটাই মেঝেতে পড়ে কাদা হয়ে গেছে। ঢেঁকিটা কাত হয়ে পড়েছে। ওটা যে মেঝে থেকে চাল পর্যন্ত সব মেরামত চাই আমার।

নিজের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম — ঢেঁকি নিয়ে আর কি হবে?

— কি হবে? হেসে বৃদ্ধা বললেন, বাবা আমায় নিয়ে আর কি হবে বলতে পার? চুরাশী বছর বয়স হল তবু সামান্য অসুখ হলে আমার জন্য ডাক্তার ডাক কেন?

অধোবদন ও খামোশ তারাশঙ্করের প্রতি বৃদ্ধার পরবর্তী স্টেপের কথাগুলো উপরে উদ্ধৃতি হিশেবে ঝুলানো হয়েছে। এরপর ঢেঁকি প্রসঙ্গসূত্র ধরে এন্তার কথাবার্তা মায়ে-ছেলেতে হয়েছে, মেমোরিচারণার ন্যায়, একসময় মাতৃদেবী চলে গেলে লেখক মশাই অন্য ডিন্যামিক্স থেকেও কথা বলেছেন। যুগসন্ধিক্ষণের ঔপন্যাসিক তিনি, সামন্তপর্যায় থেকে যন্ত্রপর্যায়ে প্রবেশমুহূর্তের কথাকার, ট্র্যানজিশন্যাল ট্রম্যা ভালো ধরতে পারেন। বলা বাহুল্য বটে।

একটা জায়গায় যেয়ে সেই বৃদ্ধার আকুতিটুকু খুবই ডিসেন্ট ভঙ্গিতে লেখক বুনেছেন লেখায়। একটু উদ্ধৃতি :

… ছেলেবয়সে তোমরা ঢেঁকির মাঝামাঝি জায়গায় দু’দিকে পা দিয়ে ঘোড়ায় চড়ার মত বসেছ — ঢেঁকির পাড়ের সঙ্গে দোল খেয়েছ। ওতো আমি তুলে দিতে পারব না। অন্ততঃ যতদিন আমি আছি ততদিন থাক —তারপর তুলে দিয়ো। ঢেঁকিটা কোনো গরীব নিঃসন্তান বিধবাকে দিয়ে দিয়ো। যেন পুড়িয়ো না চেলা করে, যেখানে সেখানে ফেলে রেখে পচিয়ে নষ্ট করো না।

ভদ্রমহিলা কেন বললেন কোনো বিধবাকে দিয়ে দিতে ঢেঁকিটা তাঁর দেহ রাখার বাদে? এইটা আপনার-আমার কমনসেন্স দিয়াই তো বুঝতে পারি। এই সেদিন পর্যন্তও দেখেছি আমাদের গাওগেরামে বেওয়া-বেধবা নারীদের গ্রাসাচ্ছাদন জুটিয়েছে এই ঢেঁকি, এইরকমই তেলের ঘানি, ইত্যাদি। ঢেঁকি তখন ওই বিধবার মৃত সোয়ামি কিংবা পৃথগন্ন সন্তানের অভাব বুঝতে দেয় নাই দু-মুঠ ভাত জুটিয়ে।

অ্যানিওয়ে। এইসব। অবশ্য অত্র নোটকারের সেভাবে ঢেঁকিশোক না-থাকলেও অন্যান্য শোকব্যাধি-জরাব্যামো রয়েছে বিলক্ষণ। এ-মুহূর্তে যেমন গ্রন্থশোক। বইটা আস্তে আস্তে এবার দীপকদাকে ফেরৎ দিতে হবে। রেখেছি তো অনেকদিন হলো। অথবা মার্ক টোয়েন হব কি না, আদৌ বইচোর বদনাম মাথায় নেবার মতন ঝুঁকিলাভজনক বই কি না এইটা, ভাবছি। অ্যানিওয়ে। একটা তথ্য বলে রাখি যে এই নোটের কোটেশনগুলোতে মূল বইয়ের বানান অবিকল রাখা হয়েছে।

এইবার পূর্বপ্রতিশ্রুত বি.দ্র। প্রচ্ছদশিল্পীর নাম সৈফুদ্দিন আহমদ। মশহুর পেইন্টার। দুনিয়া জানে তাঁর নাম। কিন্তু আপনি জানেন না। আপনি এত শিল্পসমুজদার হয়েও সৈফুদ্দিনের টিঁকিটিরও হদিস জানেন না! জানবেন কেমন করে? এঁনারে আপনে চেনেন ঠিকই, কিন্তু অন্য নামে। সফিউদ্দীন আহমেদ। দুনিয়াচিত্ত জয় করার মতো কাঠখোদাইকীর্তি ইনি জিন্দিগিভর করিয়া রাখিয়া গিয়াছেন কলিকাতা হার্বালের দাক্তর-কোব্রেজের মুখে এই আদুরে নাম অর্জনের নিমিত্তে। এইটা নতুন নয় অবশ্য, কলকাত্তাইয়ারা আপনার-আমার বাপদাদার-সাধ-করে-রাখা নামবানান ‘শুদ্ধ’ করিয়া ছাপাইয়া দিতে সদাতৎপর। এই মহতী ক্রিয়াকলাপে একটাবারের জন্যও তারা অঙ্গশৈথিল্য প্রদর্শন করে নাই। কলিকাত্তার হিন্দুরা বাংলার মুসলমানদের নামটাও মুখে আনতে চায় না, তাদিগের কোথাও গভীরতর সমস্যা হয়, আর যদিবা আনতেই হয় তাইলে বিকৃত বানানে নামধারীর অনভিপ্রেত উচ্চারণে সেইটা সারেন কলিকাত্তিয়ান বাবুরা। “আমাদের হাতে তথ্য আছে” — যেমন তথ্য থাকে আমাদের রাণীতনয়ের হাতে — বারান্তরে লিখিবারে ইচ্ছে প্রকাশি। কিন্তু কেমন করিয়া বুঝিলাম যে এই দাদানির্দেশিত সৈফুদ্দিন আহমদ আর আমাদের শ্রদ্ধেয় সফিউদ্দীন আহমেদ অভিন্ন ব্যক্তি? চিত্রিত ছবিকর্মখানা এতই চেনা যে এজন্য তথাকথিত সমুজদার না-হলেও চলে। একটা ফোটো তুলিয়া দিবার পারলে বেশ হতো প্রচ্ছদচিত্রের। কিন্তু হায়! পরজন্মে যেন আমি বনমালি কিংবা সেকন্ড ওপশন হিশেবে ফোটোগ্রাফশিল্পী হইয়া জন্মাই। যা-হোক, ছবিটা সেই সাঁওতালপল্লির গোধূলিক্ষণে ঘরে-ফেরা চাষা আর গাইগোরুর। অন্ধকার এত অসাধারণ বাঙ ও ব্যঞ্জনাময় হতে পারে! অ্যানিওয়ে। নামবানান ভুল হলে নাকি মহাভারতের কিছু আসে যায় না। কাজেই কলিকাত্তার চিরকেলে আদর আমরা লাভ করিয়া যাইতেই থাকি। শুক্রবারে প্রেমের পদ্য আর দেশভাগের উপন্যাস ছাপাইতেই থাকি। কিন্তু তার আগে এই নোটক সফিউদ্দীনের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নিতে চায়। এরপর নোটকার তার বাড়ির পথ ধরে। বেলাবেলি ফিরে যাওয়ার তাড়া। আর, কে না জানে সেই অমিয়পঙক্তি : আমার তো ঘর নেই, আছে ঘরের দিকে যাওয়া …

  • বইয়ের ফার্স্ট এডিশনটা অ্যাভেইলেবল না-থাকায় নেট থেকে এর সম্ভবত সর্বশেষ সংস্করণটা ব্যানারে অ্যাটাচ করা গেল। সফিউদ্দীন আহমেদের প্রচ্ছদচিত্রটাই রয়েছে, কেবল প্রচ্ছদবিন্যাস বদলে গেছে। পয়লা ছাপায় গোটা প্রচ্ছদ জুড়েই ছিল ছবিটা। রিসেন্ট সংস্করণে ‘সৈফুদ্দিন আহমদ’ অপরিবর্তিতই রইলেন নাকি সফিউদ্দীন আহমেদ হইলেন তা জানা যায় নাই।

জাহেদ আহমদ ২০১৪

… … 

গানপার

COMMENTS

error: