নদীতীরে ডেরা-বাঁধা বেদে ও বেদেনিরা

নদীতীরে ডেরা-বাঁধা বেদে ও বেদেনিরা

সেই বেদে ও বেদেনিরা কোথায়, যারা শীতের শীর্ণ নদীর তীরে ডেরা বাঁধত অস্থায়ী!

গোটা বিশ-পঁচিশেক তাঁবুর মতন নিচু-উবু ঘরের ভেতরে তাদের ঘরকণ্না, রান্নাবান্না, উকুনবাছা ও ঝগড়াফ্যাসাদ চলত সমানতালে। ভরভরন্ত জীবন তাদের নদীতীরে উপচাতো। আর সেই আকর্ষণে, সেই ভরভরন্ত বেদেজীবন দেখার আকর্ষণে, মহল্লার উঠতি ছেলেছোকরাদের চক্ষু ও নলা ছোঁকছোঁক করত। বেদেনারীদের শারীরিক গড়ন অবশ্য দেখার মতন, সুগঠিত, দুর্দান্ত। অদ্ভুত তৈজস-মাজা মসৃণ কালো তাদের গায়ের বরন, সবকিছু ছাপিয়ে ওঠে তাদের দুর্ধর্ষ দেহবল্লরী, উল্লেখযোগ্য তাদের দেহের বাঁধুনি। স্বভাব ও চলাফেরা তাদের, বেদেনারীদের, লক্ষযোগ্য সপ্রতিভ ও সবল। পুরুষদের ওইভাবে আলাদা করার তেমনকিছু দৃষ্টিগ্রাহ্য ছিল না, বা হয়তো ছিল, বালক পর্যবেক্ষক আমার নজরে যা ধরা পড়ে নাই। কিন্তু বেদেনিদের ফিজিক্যাল ফিচার লক্ষ না-করে উপায় ছিল না।

আমাদের মহল্লার যুবকবয়স্কদের জন্য উতল-করা বেদেনিদের ডৌল-সৌষ্ঠব, তাদের পিঠের সুবিস্তৃত উন্মুক্ততা, শরীর হইতে উচ্ছ্রিত তেজ। ছোটবেলায় বিস্ময়দৃষ্টিতে দেখতাম বেদেনিদের নৃত্যদৃপ্ত চলাফেরা, তাদের ছন্দিত কথালহর, লাস্য ও সর্পিণীবিভঙ্গি। ভীষণ উদ্দীপক ছিল তাদের হাঁটার লীলায়িত দোলা, গজগামিণী চলন, এর সঙ্গে তুলনীয় কেবল টার্কিশ বা ইজিপশিয়্যান নারীর জৌলুস-ঝরানো শরীরের জেল্লা। তুলনাটা তখনই করতে পেরেছি, তা নয়। অনেক পরে টেলিভিশনে বেদুইন মানুষের জীবনাচারযাত্রা আর টার্কিশ-মিশরীয় নারীদের নাচ দেখে তুলনাটা পাই।

কিন্তু অবাক হয়ে ভাবতাম, আজও ভাবি, বেদেনিদের সঙ্গে আমাদের এই ডাঙার জনপদের নারীদের শরীরগড়নগত মিল নাই কেন! আমাদের লোকালয়ের নারীদের হণ্টন-চলন বা শরীরসংস্থান প্রভৃতি কিছুতে বেদেনিদের বাঁধুনি বা দেহবৈশিষ্ট্য কখনোই দৃষ্ট হয় না। এইটা ভারি আশ্চর্যের ঠেকে আজও। অবশ্য বেদে-সম্প্রদায়ের ওপর অনেক গবেষণাটনা আছে, সেইরকম নৃতাত্ত্বিক কোনো খোঁজতালাশপত্র পড়ে ব্যাপারটা নিশ্চয় বোঝা যেতে পারে।

তাদের, ওই জিপ্সি যাযাবর সম্প্রদায়ের, পেশা ছিল কয়েকটা ক্যাটাগোরির। বেশিরভাগ সাধারণ লোকজন তাদের ভুল বুঝত এই ভেবে যে, এই গোষ্ঠীর নারীরা বুঝি যৌনবৃত্তিতে জড়িত। কখনো অমনটা মনে হয়নি আমার। লোকে ভাবত, ওদের পুরুষেরা বসে বসে খায়, নারীরাই কেবল ইনকাম করে। এই ভাবাটাও ভুল ছিল। তবে এইটা ঠিক যে, বেদেনারী তাদের গোত্রের পুরুষদের চেয়ে বেশি সক্রিয়, নারীরাই ভিজিবল ছিলেন রোজগারক্ষেত্রে। প্রচুর পরিশ্রমী ও প্রাণশক্তির এই নারীরা দাপড়িয়ে বেড়াতেন নদীতীরবর্তী ও ক্রমশ দূরদুরান্তের তল্লাট। নদীর তীরে নৌকাবহর ভিড়ত যেখানে, সেই তীরবর্তী গোটা জনপদে তারা ঘুরে ঘুরে হেঁকে হেঁকে ফেরি করে বেড়াতেন নানান মনোহারী দ্রব্য। প্রসাধনী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কোবরেজি দাওয়াই কিংবা ইঁদুরনিকেশী বিষ। মরশুমের ব্যবসা তাদের।

সাধারণত নদীতে যখন টান পড়ত শীতের, তখনই তারা নামত এসে ডাঙায়, ডেরা বাঁধত অস্থায়ী। তাদের মূল অ্যাক্টিভিটি ছিল বাড়ি বাড়ি বা বাজারে বাজারে সাপখেলা দেখিয়ে রোজগার ও জীবননির্বাহ। লোকমনোরঞ্জনবৃত্তি। পার্শ্বব্যবসা হিশেবে দেখা যেত বদ্যিগিরি ইনক্ল্যুডেড। একপ্রকার হাতুড়ে কোবরেজি। বিক্রি করে বেড়াত তারা নানাবিধ জড়িবুটি। লোকালয়ের পাশ দিয়া যাওয়ার সময় বিশেষ সুরে হেঁকে হেঁকে যেত : “পোক খোয়াই, জোঁক খোয়াই, শরীরের বিষবেদনা সারাই … শিঙ্গা লাগাবেননি  … শিঙ্গা!  … এএএই শিঙ্গা  লাগাই…ইইই …” ইত্যাদি। বাড়ির মধ্যবয়সিনীরা, দাদী-নানীরা, ডেকে এনে বসাতেন দাওয়ায়। এবং আমরা বাচ্চাকাচ্চারা তখন হা হয়ে দেখতাম গ্রহাগন্তুক সেইসব রহস্যমানুষদের কর্মকাণ্ড অতি নিকট থেকে। কেমন কায়দায় যেন শরীরের ভেতর থেকে বের করে আনত পুঁজ, শিঙা চেপে চেপে ধরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে! এবং পোকা বার করে আনত দাঁতের! কাজগুলো করত তারা ভোজবাজির মতো, রক্তপাতহীন প্রায়।

বিকেলের দিকে বাজারের কোনাকানাচে এবং নদীতীরে যেয়ে দেখতাম, কম্যুনিটির বিশেষভাবেই-চিহ্নিত হাওয়া-খেয়ে-বেড়ানো মধ্যবয়সী কিছু লোক সাগ্রহে শিঙা লাগাচ্ছেন শরীরে, গল্প জমাতে চাইছেন বাইদানিদের সনে, বেদেনারীদের হাতে শুশ্রুষালাভের লালসায় গাঁট খুলে খরচ করতেন অনুমান করি সেইসব আঙ্কেলেরা। আহা রে, জীবনলোভ, সেইসব আঙ্কেলেরা আজ নাই আর অনেকেই। এদের মাধ্যমে, এই শ্রমস্পৃহ বেদেনারীদের মাধ্যমে, একসময় আমাদের জনপদের মা-ঝিয়েরা উপকৃত হয়েছেন বিস্তর। যেমন নারীদের জরুরি কিছু অন্তর্বাস ও টয়লেট্রিজ যোগান দেবার নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী ছিল এইসব বেদেনিরা। গ্রামদেশে তো দোকান ছিল না এসবের।

কই তারা আজ সব! কোথা গেল চলে সেই কিউটি-বিউটি শীতের অতিথিরা!

লেখা / জাহেদ আহমদ ।। লেখাকাল / অক্টোবর ২০১৩

… …

জাহেদ আহমদ

COMMENTS

error: