সেলিনের সেই সময়

সেলিনের সেই সময়

গান তিনি গাইছিলেন আগে থেকেই, কিন্তু পরিচিতি ছিল না আপন গণ্ডীর বাইরেটায়। বিশ্বজোড়া তার খ্যাতিটা আসে একটা গানে কণ্ঠ ও হৃদয় দিবার জন্যে, সেই গানটা ছায়াছবির থিম স্যং হিশেবে একটা জাহাজের সমুদ্রসমাধির আগে এবং পরে রেশ ছড়িয়েছে জীবনের। গানটার পয়লা স্ট্যাঞ্জার কয়েক কলি “এভ্রি নাইট ইন মাই ড্রিম / আই সি ইয়্যু / আই ফিল ইয়্যু” … সংক্ষেপে ‘মাই হার্ট উইল গ্য অন’ বললেই চিনতে পারে দুনিয়া তারে; এই একটা গানেই অকল্পনীয় শ্রোতাপ্রাপ্তি জুটে যায় যে-শিল্পীটির নসিবে, সেলিন ডিওন (Celine Dion) নাম তার। আর, এতকিছু বলার পরেও, বলে কি দিতে হবে ছায়াছবিটার নাম? বলা হয়েছিল ডুববে না, তারপরও ডুবেছে এবং ভেসেছে একটি সিনেমায় চিরতরে, টাইটানিক নাম সেই সিনেমাজাহাজের।

ম্যুভি রিলিজের আগে সাউন্ডট্র্যাক অ্যালবাম বেরিয়েছিল এর, যেখানে সেলিনের এই গানটা ছাড়াও অন্যান্য ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরগুলো সংকলিত হয়েছিল। তখন ক্যাসেটের যুগ যাই-যাই করছে, এই বাংলায়, কম্প্যাক্ট ডিস্ক নামে একটা বস্তুও দোকানে দেখা যাচ্ছে। এমন সময় টাইটানিকের সাউন্ডট্র্যাক অ্যান্থোলোজি মার্কেটে আসে, এবং বিলবোর্ডে সেইটা নাম্বার ওয়ান দখল করে নেয়। এর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল তখন পার্ল জ্যাম। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে এর বিক্রি হয়েছিল পয়লা পাঁচ হপ্তা শেষে পাঁচ লক্ষাধিক কপি। কিছু পরিসংখ্যান পাওয়া যায় অ্যালবামটি বিকিকিনির, যা আশ্চর্যকর, এমন একটা ব্যাপার উল্লেখ করি এখানে। সে-বছর ভ্যালেন্টাইন্স দিবসে অ্যামেরিকায়, স্রেফ অ্যামেরিকায়, অ্যালবামবিক্রি গিয়া দাঁড়িয়েছিল নয়লক্ষের কাছাকাছি! একদিনে এই বিক্রি, ভাবা যায়! হ্যাঁ, স্ট্যাটিস্টিক্স বলছে এক্সাক্ট সংখ্যাটা নাকি আট লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার ছয়শ ষাট কপি!

Celine Dion in titanicটাইটানিক সাউন্ডট্র্যাক অ্যালবামে যে-ট্র্যাকগুলো ছিল, সেগুলো হচ্ছে : হিঙ্ক টু দ্য সি, মাই হার্ট উইল গ্য অন, নেভার অ্যান অ্যাবসোলিউশন, ডিস্ট্যান্ট মেমোরিজ্, রোজ্, লিভিং ফোর্ট, দ্য সিফিং, ডেথ অফ টাইটানিক, টেইক হার টু সি, আনঅ্যাবল টু স্টে, অ্যা প্রিন্স কেপ্ট এবং অ্যা লাইফ সো চেঞ্জড। বছর ঘোরার আগেই টাইটানিক সাউন্ডট্র্যাক অ্যালবামের বিশ্বব্যাপী বিক্রি কুড়ি মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছিল। আর এই পুরা সাউন্ডট্র্যাক প্রোজেক্টের সেন্ট্রাল থিম হচ্ছে ল্যভ, ভালোবাসা, মূল গানটা ‘মাই হার্ট উইল গ্য অন’। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরগুলোর অ্যান্থোলোজি রিলিজের অব্যবহিত পরে সেলিন ডিওনের একটা অ্যালবাম বারায়েছিল যেখানে অন্যান্য গানের সঙ্গে টাইটানিক ল্যভথিমটাও ছিল এবং এইটাই লিড নিয়েছিল অ্যালবামটিতে। ‘লেটস্ ট্যক অ্যাবাউট ল্যভ’ শিরোনামে সেলিনের অ্যালবামটি বিলবোর্ডে সেই-সময় শীর্ষদশের চার্টে এইটিন উয়িক্স অবস্থান করেছে। এমন অব্যবহিত পরপর টাইটানিক সাউন্ডট্র্যাক আর সেলিন ডিওন অ্যালবামদুইটা না বাইরালে প্রথমোক্তটার বিক্রি যে কোন চূড়ায় গিয়া উঠত শুধু অনুমান করতে হয়। বিক্রিটা অ্যালবামদ্বয়ে ভাগ হয়ে যায়।

সেলিন ডিওন টাইটানিক সিনেমার ‘মাই হার্ট উইল গ্য অন’ গানটা গেয়ে যেমন ও যতটা আলোচিত হয়েছিলেন, ‘লেটস্ ট্যক অ্যাবাউট ল্যভ’ অ্যালবাম রিলিজের পরে টেলিভিশনে-পেপারে হয়েছিলেন সমালোচিত। সমালোচনাটা, আজ মনে হয়, খানিক অদ্ভুতুড়েই ছিল। মনে হয় সেলিনের সমালোচনার পিছনে সেই কারণগুলো ছিল খোঁড়া। খামাখাই ক্রিটিক। সমালোচনার শিকার হয়েছেন সেলিন অ্যালবামটায় যাদের সঙ্গে এবং যাদের নিয়া কাজ করেছেন তাদের কারণে; মানে, কেন তারা, কেন অন্যরা না, ইত্যাদি। উয়্যিয়্যার্ড না ব্যাপারটা?

Celine Dionঅ্যালবাম কিন্তু খুবই হিট করেছিল। লেটস্ ট্যক অ্যাবাউট ল্যভ ওয়াজ অ্যা হিউজ্ সাক্সেস্। যদিও রেডিয়োস্টেশনগুলো বৈরী ছিল, পত্রিকা বৈরী ছিল, টিভিগুলোও। রেডিয়োপ্রোগ্র্যামাররা অ্যালবামটা পছন্দ করছিল না, পত্রিকায় নেতির পরে নেতি রিভিয়্যু বেরোচ্ছিল। অ্যালবাম সম্পর্কে লিখতে যেয়ে নিউইয়র্ক টাইমস্ লিখেছিল, — অ্যালবামটা চটকদার! টরেন্টো সান লিখেছিল, — গোটা জিনিশটার প্যাকেজিং ভালো, গলার কাজও মন্দ না, শুধু হৃদয়ের সঙ্গে এর কোনো যোগ ঘটিয়া ওঠে নাই! লন্ডনের সানডে টাইমস্ মন্তব্য করেছিল কঠিনতর, — যদি দশের মধ্যে অ্যালবামরেটিং করতে যাই তাইলে এর মিউজিক পাবে বেশি-থেকে-বেশি চার, আর এর সার্বিক ব্যবস্থাপনা মোড়ক-চটক পেতে পারে দশে দশ!

শুধু তো ট্যক অ্যাবাউট ল্যভ নয়, সেলিন আগাগোড়াই ক্রিটিকদিগের কোপানলে থেকেছেন। উনি কেন উনার চেয়ে দেড়গুণ-দ্বিগুণ-তিনগুণ বয়সীদের সঙ্গে পেয়ার-আপ করে চলেন, উনি কেন ওই-সময় পঞ্চান্ন বছর বয়সী বার্বারা স্ট্রেইস্যান্ডের সঙ্গে, কেন বাষট্টির বুড়ো লুসিয়ানো পাভারাত্তির সঙ্গে গান করেছেন … ইত্যাদি মিডিয়া খাপ্পা হয়ে জিগায়ে যেতেছিল ওই-সমস্ত সমালোচনার আশ্রয়ে। কেন তিনি পঞ্চান্ন বছর বয়সী গীতিকার ক্যারোল কিং এবং একাত্তরের প্রৌঢ় সংগীত পরিচালক স্যার জর্জ মার্টিন যিনি বিটলসেরও সংগীত ডিরেকশন দিয়েছেন একদা, সেলিন কেন শুধু বুড়াহাবড়াদের নিয়াই কাজ করেন, তিনি কি তিরিশের আগেই বুড়িয়ে যেতেছেন, এ-ই ছিল সমালোচনার অন্তর্যাতনা। যা-হোক, সেলিন কেন বাপের বয়সী এক কালা আদমির লগে প্রেমে মজলেন, ওরেই বিয়া করলেন, এই প্রশ্ন অবশ্য তখনও ওঠে নাই, ডিওন তখনও শাদিশুদা ছিলেন না। বাদে এক-সময় সেলিন ডিওনের একটা বায়োগ্র্যাফিক স্কেচ নিয়া আমরা আবার হাজির হতে পারি। টিল্ দ্যেন।

… …

গানপার
পরের পোষ্ট
আগের পোষ্ট

COMMENTS

error: