শাহরিয়ারের সাথে কথোপকথন || নিখিল দেব

শাহরিয়ারের সাথে কথোপকথন || নিখিল দেব

মাসখানেক আগে (মেরে ফেলবার বা আত্মহত্যা করবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫-র দিনে) ফেসবুকে আমার স্ট্যাটাসে করা একটা প্রশ্নের সূত্র ধরে শাহরিয়ারের সাথে আমার ইনবক্সে কিছু কথোপকথন হয়। গতরাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগেও, বাংলাদেশ-সময় আনুমানিক বিকেল ৩ টায়, ফেসবুকে আমার হোমপেজে শাহরিয়ায়ের উপস্থিতি দেখে আমি ঘুমাতে গেছি। সে কী আমাকে মনে করছিল তখন যখন সে মৃত্যুর সাথে লড়ছে? অসম্ভব প্রশ্ন, এর উত্তর আমি কোনওদিনও জানতে পারব না।

সে এখন আর নেই। প্রাইভেসি বিষয়টাও তাই অর্থহীন। এ কথোপকথন তাঁর বায়োগ্রাফির মতো। মহাকালের নিচে ওগুলোর হিসেব কেউ রাখে না। আমার কাছে ওটা এক অমূল্য সম্পদ। কোনও আজেবাজে বক্তব্য এ-লেখার প্রেক্ষিতে বা রেসপন্সে কেউ লিখলে আমি তাকে অস্বীকার করব আজীবনের জন্য।  নিচে পুরো কথোপকথন তুলে দিলাম। ও, আরেকটা কথা, কথোপকথনটা কিন্তু একটামাত্র নির্দিষ্ট বিষয়ে, ওটা নিয়ে পুরো শাহরিয়ারকে দেখা যাবে না।

আমার সে-স্ট্যাটাসের প্রশ্নটা ছিল এমন :
একটা প্রশ্ন আমাকে বরাবরই ভাবায়। একই সমাজ, মোটামুটি একই আর্থসামাজিক ও ধর্মীয় ব্যাকগ্রাউণ্ড, একই রাষ্ট্র, একই শিক্ষা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ভিতর দিয়ে গিয়ে কেবল কিছু মানুষ কেন, কীভাবে নাস্তিক* হয়ে ওঠে?

শাহরিয়ার আমাকে ইনবক্সে লিখেছিল :
স্যার, আমি নাস্তিকতা বিষয়ক সংলাপে প্রকাশ্যে খুব সাবধানে কমেন্ট করি। তাই ইনবক্সেই আসলাম।

আপনার লাস্ট কমেন্ট শতভাগ ঠিক। আমিও আমার ফ্যামিলিতে না শুধু, নানা-দাদা মিলিয়ে চৌদ্দগোষ্ঠীতে একমাত্র যে স্কেপটিক। আমি এথিস্ট শব্দটা ব্যবহার করলাম না। কারণ এথিস্ট হবার জন্য ফিজিক্স বা ফিলোসফি নিয়ে যতটুকু পড়াশুনা লাগে অতটা এখনো করা হয়নি। স্বীকার করি স্যার, আমার পড়াশুনা অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন। পড়াশুনা শুরু করেছিলাম ধর্মচর্চার ভ্যালিডিটির জন্যই।

আমার নানা-দাদা ফ্যামিলিতে বিএনপিপন্থী আছেন, দুই-একজন আওয়ামী লীগার আছেন। গ্রামের বাড়ি চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লাতে, ওখানে বামপন্থাকে খুব ঘৃণা আর সন্দেহর চোখে দেখা হয়। এমনকি এরশাদের সমর্থক আছেন। ফ্যামিলিতে অনেকজন জামায়াতপন্থী। আমার আপন সেজোচাচা কট্টোর জামায়াতপন্থী, যিনি আমাকে যথেষ্ট স্নেহ করেন।

আমার বাবাও … উনার পেশাজীবন কেটেছে বিমানবাহিনীতে। কর্মজীবনের শেষ দশবছর কুয়েত এয়ারফোর্সে। ওখানে উনি সালাফিবাদে দীক্ষা নেন। পিচ্চিবয়সে যখন আব্বার কাছে চিঠিতে চকলেট বা খেলনা আনার আব্দার করতাম, উনি নিয়ে আসতেন মোটা মোটা হাদিস, ফিকহর বই। সেগুলো দেশে তখনো পাওয়া যেত না। আমার সেজো ভাই হচ্ছেন কোরানে হাফেজ। উনি হিফজ করেছিলেন শফি হুজুরের সেই হাটহাজারি মাদ্রাসায়। বাসার সবাই নামাজ পড়ে। আমি বাদে।

আমি কেন এমন হলাম? ব্যাপারটা এমন — আমার সাথে আমার ইমিডিয়েট বড়ভাইয়ের বয়সই এগারো বছরের পার্থক্য। চিন্তাভাবনার শেয়ার কম হতো। তবে সালাফিজমের সাথে দেওবন্দি ধারার ফিলোসফিক্যাল বিতর্কগুলো শুনতাম আব্বা আর ভাইয়ার। ক্লাস থ্রি-ফোর থেকেই আমি ইজমা-কিয়াসের বইগুলো পড়া শুরু করি দুই ধারারই। আহলে হাদিস বা সালাফিরা কিন্তু দেশে এই জঙ্গিবাদের পিছে আছে এটা জানেন বোধহয়। সাধারণ বাঙালিদের সাথে আহলে হাদিসের অনুসারীদের নামাজ সহ অন্যান্য ধর্মাচরণে পার্থক্য আছে, নামাজটা চোখে পড়ে। ঘরে মেজোভাইয়ের মাদ্রাসা থেকে আনা মুজাহিদদের কিছু বই ছিল। বাবাও সালাফিদের বই আনত। ঘরে ইসলামি বইয়ের অভাব ছিল না।

মনে হয় ক্লাস এইটের মাঝে তিনবার সাতখণ্ডের সহিহ বুখারি তিনবার আর সহিহ মুসলিম একবার শেষ করেছি পড়ে। আর কুরানের অনুবাদ আর ব্যাখ্যা পড়া হয়েছিল ছয়-সাতবার।

মেজোভাইয়ের অনার্স সাবজেক্ট ছিল ইসলামের ইতিহাস। আর এমনিতে নিজেই ইতিহাস আর নৃতত্ত্ব নিয়ে বই ঘাঁটাঘাঁটি করতাম ছোটবেলা থেকে। ভারতের ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস নিয়ে পড়লাম। যখন হানাফি-দেওবন্দিদের আকিদার সাথে আহলে হাদিসদের নামাজ-রোজা কম্পেয়ার করেছি তখন হিন্ধু বৌদ্ধদের বই বাদ দেবো কেন? ফাইভ থেকেই হিন্দু-বৌদ্ধ বন্ধুদের বই ধার নিয়ে পড়া শুরু করলাম। একেবারে টেন পর্যন্ত। মেজোমামার লাইব্রেরিতে ওল্ড টেস্টামেন্ট আর বাইবেল পড়লাম। লুকিয়ে রামায়ণ-মহাভারতের কিশোর সংস্করণ পড়লাম। বৌদ্ধদের জাতক নিয়ে বই পড়লাম।

তবু নাস্তিক ব্যাপারটার সাথে পরিচয় হয়েছে একেবারে ভার্সিটিতে এসে! ক্যাম্পাসে আসার আগে হুমায়ুন আজাদই পড়িনি। কলেজে থাকতেই ফ্রেন্ডদেরকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতাম। সাহস করে বাবা আর ভাইকেও প্রশ্ন করতাম। জবাব কেউই দিতে পারত না। ভাইয়ের এক বন্ধু তো হাদিসের সেই কোটেশনই দিলো — সীমা লঙ্ঘন না করতে।

আমার প্রথম চিন্তার ফাঁকটা তৈরি হয়েছিল ইতিহাসের বই ঘাঁটাঘাঁটি করে। নবি-রাসুল আরব ভূখণ্ডের বাইরে নেই কেন! সেমেটিকদের ভূখণ্ডের বাইরে এত সভ্য জায়গায় আহলে কিতাবের কেউ আসেনি কেন! জেনেসিস নিয়েও নিজের প্রশ্ন ছিল — এত নবি-রাসুল কেউই ডাইনোসরের কথা জানত না কেন? সিরাতের বইগুলোতে শেষ নবি নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। খিলাফত যদি এতই পবিত্র অতিপ্রাকৃত হয় তাহলে স্রষ্টা স্বয়ং এর দায় নেয় না কেন?

ক্যাম্পাসে এসেই যে সব পেয়ে গেছি তা না। প্রথম বিধর্মী দেখলাম প্রিয় শিক্ষকদের মাঝে। আর ফার্স্ট ইয়ারে অনিক বা সুদীপ্তর কাছ থেকেই বোধহয় হুমায়ুন আজাদের বই ধার নিয়েছিলাম। ফেসবুক আর পর্নগ্রাফির বাইরে ইন্টারনেট ব্যবহার শিখেছি। হুমায়ুন আজাদ পড়লাম। বার্ট্রান্ড রাসেল পড়লাম। আরো ইতিহাসের বই, দর্শনের বই এলোমেলোভাবে হাতে এল।

আর্কিটেকচার পড়ে স্কেপটিক হয়েছি এমনও না কিন্তু, আমার ফ্রেন্ডদের সবগুলোই বিশ্রি রকম মডারেট মুসলিম। বাইরে খেলাধুলা থেকে নিজেকে প্রশ্ন করাটা কৈশোরে পছন্দ ছিল। সেটা জোড়া লাগাতে সাহস দিয়েছে স্থাপত্য আর আর্ট নিয়ে বইগুলো। আর ২০১০-এ ফেসবুকে নাস্তিকদের বিভিন্ন গ্রুপে যে কম্যুনিটি দেখি সেখানে অ্যাড হয়ে আর ‘মুক্তমনা ব্লগ’-এর সন্ধান পেয়ে বুঝেছি নিজের জায়গা পেলাম।

স্কেপটিক হয়েছি আসলে কলেজে থাকতেই। তবে টার্মটার সাথে পরিচিত ছিলাম না।

এই হলো আমার কথা, স্যার।

আামার সংক্ষিপ্ত উত্তর :
সামনে তাকিয়ে আমি কোনো আলো দেখতে পাই না। আমি কখনোই পাইনি। হ্যাঁ, একটা মডারেট পথ নিলে সব সহজ হযে যায়। সবসময়, সববিষয়েই্। তোমার যে স্টোরি লিখলে ওটাই রিয়েল স্টোরি। তাই, সবসময়ই, যথার্থ লোক হাতে গোনা। এরাই সংখ্যালঘু। শাহবাগ দেখেছো তো কীভাবে মরে গেল, ধর্ম সংযুক্ত হযে যাওয়ায়। যা-ই হোক, প্রশ্নটা আমার ভেতরে অনেকদিনই ছিল। আমি অবশ্য আশা করেছিলাম, আমার বন্ধুতালিকার কিছু বিদ্বানেরা অংশগ্রহণ করবেন, তা করেননি। যারা করেছে, বেশিরভাগই, ওগুলো কেবল আমার সময় নষ্টই করেছে, পড়তে আর রিপ্লাই দিতে যেয়ে। আমার কাছে এটা এক রহসই — কী এমন ফ্যক্টর আসলেই মানুষকে প্রভাবিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষে ওঠার আগ পর্যন্ত আমিও ছিলাম বলতে পারো ধার্মিক। কীভাবে ধীরে ধীরে আজকের এ-অবস্থানে আসলাম সেদিকে তাকালে আজ আশ্চর্যই লাগে। আর এ-আশ্চর্য আরও বেশি লাগে যখন দেখি যে যাদের সাথে শুরু করেছিলাম প্রগতির চর্চা (বা বলতে পারো যাদের কাছে আমার হাতেখড়ি) তারা সবাই কিন্তু আবার এক জায়গাতে এসে থিতু হয়ে গেছে। যখনই ধর্মের … আাজগুবি জিনিসগুলো নিযে আলোচনা ওঠে, দেখি সবাই সেগুলো আবার ঠিকই বিশ্বাস করে। আমি মেনে নিতে পারতাম না। ভণ্ডামি মনে হতো। যন্ত্রণা দিত এসব। আমার বন্ধুদের সবাই একটা জায়গার পরে আর ভাবতেই চায় না, কথাই শুনতে চায় না। কিন্তু, আমি কেমনে এমন হলাম, আমি তো তাদের পিছনেই ছিলাম। বুঝলাম, বেশিরভাগ মানুষই তার সীমানার বাইরে চিন্তাই করতে পারে না। সব সমস্যারই মোটামুটি সমাধান হয়ে যেত, যদি আমরা প্রশ্নের জন্য জায়গা রাখতাম।

আর আরেকটা বিষয়, আমাদের নাস্তিকরা যে একটু আগ্রাসী, সেটাও কেন? আমার মনে হচ্ছে, মূল কারণটা হলো আমরা উঠে এসেছি এমন একটা সমাজ থেকে যেখানে ধর্মটা আচ্ছাদনে রাখে বাকি সবকিছু, বা ধর্মের প্রভাব বিশাল। তাই আমরা যখনই নাস্তিক হচ্ছি, তখন চলে যাচ্ছি পুরো ধর্মের বিপরীতে। পাশ্চাত্য সমাজের মানুষগুলো কিন্তু ইহজাগতিক, তাই নাস্তিকরাও যে নাস্তিক সেটা নিয়ে তারা অহঙে ভোগে না। বাকিরা গুরুত্ব দেয় না সেগুলোতে।

আমি অনেক আগ থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ওসব ফালতু বিষয় নিয়ে বংলাদেশে লিখে কোনো লাভ নেই। আর আমার তো মনোযোগের জায়গা ওটা নয়ও। এসব ভাবতে যেয়ে অনেক ক্ষতি হয়ে যায়, জানো! নিজের পড়ালেখা, মনোযোগের জায়গাটাতে দূষণ তৈরি হয়। ওসব হত্যাকাণ্ডগুলো আবার নাড়িয়ে দেয় সব। দেশ আর ধর্ম — এ-দুটো বিষয় বড় মনোযোগবিনাশী।

হয়তো-বা সরাসরি কথা বলতে পারলে ভালো হতো। ভালো থাকবে। নিরাপদে থাকবে।

শুভকামনা,
নিখিল।

শাহরিয়ারের শেষ উত্তর :
ট্রাঞ্জিশনাল পিরিয়ডটা অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। আমাদের সামনে খুব বেশি আইকনিক মানুষকে পাচ্ছি না … হতাশার সবচেয়ে বড় জায়গাটা স্যার শিক্ষাঙ্গন। শিক্ষকরা নিজেদের মাঝে গুটিয়ে আছেন কিংবা যা করছেন সেটার জন্য আমরা শ্রদ্ধা রাখতে পারছি না। ছাত্ররা প্রিয় ফুটবলক্লাবের খেলোয়াড়ের বান্ধবীর আপডেট জানাকে মনে করছে জ্ঞান বাড়ানোর জায়গা। হয়তো পালিয়ে থাকতে চায়।

স্যার, দেশে আসলে সরাসরি দেখা আর কথা হবে। আশীর্বাদ করবেন। আর আপনিও সুস্থ, নিরাপদে থাকুন।

(কথোপকথন শেষ)

শাহরিয়ার নেই। তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারণ হয়তো কখনোই আমাদের জানা হবে না। আমার একটা সত্তা প্রচণ্ডভাবে বলছে শাহরিয়ারকে মেরে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশ এখন তাঁর মতো মানুষের জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ জায়গা। আবার, সে যদি নিজেকে হত্যাও করে থাকে সেটাও হত্যাকাণ্ডই; কারণ, সমাজ ও রাষ্ট্র তাঁর মতো মানুষের উপস্থিতিকে এখন অপ্রয়োজনীয় মনে করে।

তোমার সাথে আমার আর কখনও কথা হবে না, এই কারণে আমার জীবনের অর্থ কিছুটা বদলেছে। সেটা আমি জানব, হয়তো আর কেউ জানবে না।

০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫

নিখিল দেব রচনারাশি

COMMENTS

error: