মদ ও সন্ধ্যাঘর || শুভ্র সরকার

মদ ও সন্ধ্যাঘর || শুভ্র সরকার

শেয়ার করুন:

মানুষের সৃষ্টিশীলতার একটা অনুষঙ্গ হইলো মদ। মানুষ নাকি পৃথিবীতে এসে রেডিমেড পেয়েছিলো ফল। সেই ফলের গাজন থেকেই তখন থেকেই মানুষের সাথে আছে মদ। যাইহোক মদের গল্প জমে আছে পৃথিবীর এখানে সেখানে, এটাই সত্য। গল্প যে-কোনোকিছু নিয়েই হতে পারে। কেবল আমি আমার চরিত্র ও তার চারপাশের পৃথিবীটাকে দেখি। সেই মধ্যযুগ থেকে সুরা থেকে হুইস্কি কত যে অধুনা নাম পেয়েছে এই মদ। তবে মদকে যে-নামেই ডাকা হোক না কেন মদ তার মাদকতা ছড়িয়েছেই। তবে এই জগতসংসারে  এর ঢপের কারণে হারাতে হয়েছে অনেককে…তবু এই মদকে ভালোবেসেই মানুষ নিজের দুঃখবেদনার গুরুভার তুলে দিয়েছে তার হাতেই।

দুই
মদে আসক্ত থাকেন অনেকে হয়তো। তারা মদের সাথে জীবনযাপনের একরকম বন্ধুত্ব গড়েন। তারা মদের রঙেই রঙিন হয়ে উড়তে চান। তাদের ওইটুকু ইশকের ভেতর অনুভূত প্রজ্ঞায় যেন—

বাগান ভরা ফুল, বাতাসে দুলছে ফুল
অথচ ফুল নয়, দুলছে তারই সুরামন!

এই কারণেই সম্ভবত মির্জা গালিব বলেছিলেন—“মসজিদে বসে মদ পান করতে দাও, অথবা বলো এমন একটা জায়গা যেটা আল্লাহর নয়।”

উপস্থিত মুসল্লিরা তার কথায় নিরুত্তর হয়ে গেলেন। ভাবলেন, সত্যিই তো, এমন কোনো জায়গা পাওয়া কি সম্ভব যেটা আল্লাহর নয়!

তিন
২০১৯ সালের দিকে হবে।  ওসমানের সাথে গেলাম নালিখালি গ্রামে। মুক্তাগাছার চেচুয়া বাজার হয়ে যেতে হয়। প্রচণ্ড মায়া নিয়ে নিজেকে ভাবতে শুরু করলাম। চারপাশ এতটা নির্জন লাগছিল যে দুনিয়া অবাক করে দিয়ে আমাকে জড়ায়ে ধরছে। এখানে এই যে বৃক্ষ কত রকমের হয়। এখানকার সবুজ কোথায় কোথায় লুটিয়ে দেয় তার পাতাঝরা,  মাতাল হয়ে বিশ্রাম নিবে বলে। আর এভাবেই আমি দেখতে পাচ্ছি ছোট ছোট দুলপি গাছে ফড়িঙের কিছুটা বসে থাকার ভেতর কিছুটা উড়াল হওয়া। যাইহোক এভাবে হাঁটার পর যার বাড়িতে গেলাম, ছেলেটার নাম হচ্ছে রাফায়েল। বয়স আর কত হবে আনুমানিক পঁচিশ কিংবা ছাব্বিশ। রাফায়েল আমাদেরকে বাড়ির ভেতর উঠোনে বসতে দিলো তারপর সামনে একটা টেবিল পেতে দিলো। কাছে এসে বললো কি খাবেন দাদা। কেন জানি মগজের ভেতরটা জানার জন্যে ওকে বললাম ‘চু’ আছে। ওসমান বলে  উঠলো, দাদাকে এতদূর নিয়ে এসেছি, ‘চু’ খাওয়াও মিয়া। রাফায়েল বললো, এখন তো ‘চু’ নাই। তবে একবছর আগের ফ্রিজে আধালিটার ‘চু’ আছে ওইটা খাইতে পারেন। ওসমান তো আর ‘চু’ খায় না। আমি বললাম ঠিক আছে নিয়ে আসো। কিছু সেখানে খেলাম আর বাকিটা বিদায় নিয়ে সাথে নিয়ে আসলাম। ভ্যানগাড়ির সামনে আমি বসা। ভ্যানগাড়ি চলছে। আমার একহাতে ধরা আছে চু অন্যহাতে সহজ ভঙ্গি। বিষাদময় চিত্রিত করা যেন আমার অবচেতন। কিন্তু ওইটাই আমার ভালো লাগছে। ভালো লাগছে ভ্যানগাড়ির সামনে আমি বসা। ভ্যান চলছে। আর আমার একহাতে ধরা আছে ‘চু’ অন্যহাতে সহজ ভঙ্গি। কী বিষাদময় চিত্রিত করা যেন আমারই অবচেতন। এদিকের ভূ- দৃশ্য দেখে মনে হলো সূর্যের শারীরিক প্রকাশে শস্যেরা তরতর। আমাদের গায়ে রোদ পড়ছে রোদের ফিরতিপথে। একটু থামলাম। যেখানে সপ্রতিভ এক আকাশের নিচে একার ভেতর একটি বাড়ি। সামনে কত কত কৃষ্ণতুলশীর গাছ। গেইটফুল নয় যেন ফুটে আছে বড়িটার টিনের চালে সূর্যকদম। আমারা সেখানে বাড়ির একটা লোককে ডাক দিয়ে জল খেলাম। আমার চোখে নেশা, ধ্যাৎ মাতাল হলে পৃথিবীর রঙ এমন ঐন্দজালিক লাগে কেন? আমরা ফিরছি, মাইলকে মাইল মনমরা বন্দ উড়ছে উদাস। ওইদিন রাতে ‘চু’ নামে একটা দীর্ঘকবিতা লিখলাম।

ও চু পানীয় তবে তুমি এক
ঘোড়ার ভঙ্গি
দ্যাখ কেমন ঠোকাঠুকি করে হায়
আমি দেখছি তোমারই ভেতর
রোদের অলিভিয়া।

এমনটাই লিখেছিলাম কবিতায়।

চার
তখন সন্ধ্যা।  হাওয়া কারিগর এসে বাজাচ্ছে এই সন্ধ্যাটাকে। আমারা ক’জন হেঁটে হেঁটে চলে গেলাম তাজমহল হোটেলের দিকে। আমরা ঠিক মিলাতে পারছিলাম না, এইটা ময়মনসিংহ শহর। যেন সম্পর্ক গড়ায়ে যাচ্ছে সহস্রধারা মনের আড়ালে। আমরা একটা ছোট কেবিনরুমের ভেতর বসলাম। ১০/১২টা ক্যান আসলো আমরা যে যার মতন ঠকঠক মেরে দিলাম। কে খাওয়াল কে কে ছিলাম এইগুলো না-বলাতেই থাক। থেকে থেকে আমরা কেমন যেন হয়ে উঠি,  কোলাহলের ভেতর ভারী ডানা যেমন হালকা হয়। পরষ্পরকে দেখার অসুখে আলাপের গান উতরায়। আমরা একদল কিছু মিলাই আবার কিছু মিলাতে পারি না। রাত বাড়তে থাকে। রাত যত বাড়ে আর এদিকে আমাদের ভঙ্গির চিত্র আঁকা হতে থাকে পরিণত এক ঘোরের রেখায়।

২৯ ডিসেম্বর ২০২২


শুভ্র সরকার রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you