কেন লিখি? কেন লিখি?? কেন লিখি আমি???
এটা কি একটা ক্লাসিক প্রশ্ন, লেখকের জন্য। চিরকাল সব লেখক এই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এর উত্তর জানতে চায়। তখন সে ভাবে ভাষা কেমনে শক্তি অর্জন করে। কেমনে যুদ্ধ ও বাণিজ্য দিয়ে ভাষার প্রসার হয়।
মুরগির বা পাখির প্রজনন প্রক্রিয়া
বরং এই প্রক্রিয়াটা নিয়ে আগে ভাবা যাক।
প্রজননের এই পদ্ধতিটা বেশ খানিকটা ভিন্ন ধরনের। যা কিনা ক্লোয়াকা চুমু নামে পরিচিত। মিলনের সময় মোরগ বা ছেলেপাখি মুরগি বা মেয়েপাখির পিঠে উঠে অল্প সময়ের জন্য তার প্রজননছিদ্র স্পর্শ করে। আর সেই মুহূর্তে শুক্রাণু প্রজননপথে ডিম্বাণুর সাথে মিলনের সুযোগ পায়। ওভারিতে প্রবেশ করে।
শুক্রাণু মহিলার শরীরে অমিলিত থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকতে পারে। একদিন ডিম্বাণু নিচে নামলে তখন তার সাথে মিলিত হয়ে নিষিক্ত হয়। পরে ডিম পাড়লে তা উপযুক্ত তাপমাত্রা ও সঠিক ইনকিউবেশনের মাধ্যমে বাচ্চা তৈরি হতে পারে।
সৃজনশীল লেখার সাথে পাখিজাতির ডিম নিষিক্ত হওয়ার অনেক মিল। ওরা মুখে-মুখে চুমু নয়, দুই অঙ্গে খুব দ্রুত ও হালকা স্পর্শ করে কাম সারে। শুয়ে বসে ৬৪ কলার মিলন নয়। বরং উড়তে উড়তে, গাছের ডালে নখ কামড়ায়ে, কার্নিশে দাঁড়ায়ে, এমনকি আইক্কাঅলা বাঁশের মাথায় বসেও এই চুমু সম্ভব।
কবিতা লিখতে বা গল্প বানাতে কোনো উপলক্ষ লাগে না। কেন লিখি ভাবতে হয় না। লিখতে পারি তাই লিখি।
প্রথম জীবনে নারীসঙ্গের আকাঙ্ক্ষার ৭০ ভাগ দিয়েছিলাম কবিতারে। সেই দেয়া অংশের শূন্যতা শরীরে তৈরি করতো যে ভয়েড, তা থেকে শব্দের জার্নি শুরু। উপমা আর চিত্রকল্পের জন্মপাত। গল্পাংশের ইবতিদা।
জাগতিক ভারে মন্থনবাবা কহিছে, অমৈথুনহেতু তোমার মুক্তি নাই। সমস্বরে আত্মা সকল চেঁচাইতেছে। কাদার ভিতর ধাঁধার রণাঙ্গনের প্রস্তুতি। যুদ্ধ ব্যাতীত উপায় নাই। মহাযুদ্ধ শেষে রন্ধনপ্রণালি বিতরণ হৈবে। পাখি গাহিবে, পতঙ্গ উড়িবে, ফুল ফুটিবে, মধু ছুটিবে। মধুই আত্মা। সাধুর বারান্দায় উচিৎ কথার বাটপারি।
চাঁদের বাটখারায় হেতুর মাপ নাও। রেয়ার খনিজের উৎস খোঁজো। সনাতনের পাটখড়ি সাজাও। মাঠে শাদা শাদা মাথার খুলি সাজানো। শক্তিপীঠে পাওয়ার রিয়্যাক্টর রেডি। তেজস্ক্রীয় জ্বালানি দাও। কুলিং টাওয়ারে বাষ্প উঠিবে। কবিতা হৈল কুলিং টাওয়ার, কবিতা হৈল কুলিং টেকনিক। উহাতে মনের জ্বালা কমিবে। তুমি বিকচঞ্চল হৈতে নিকষিত হেম হৈবে।
প্রণালিতে অবরোধ দিলে কি হবে, ফাল্গুন মাসে আমগাছ পোয়াতি হবেই। চৈত্রে কুঁড়ি কুঁড়ি, বৈশাখে ছুঁড়ি, জ্যৈষ্ঠে পেকে রসবতী। লজ্জা কেন করো, প্রতিদান পাবেই। যুযুধান পুরুষ পাবে নবযুবতী ছুকরি প্রকৃতি।
রাজপথে অতিবাহিত সড়ক। বয়ে চলে বিভক্ত লেন। ডিভাইডারে বাকেটে ভরে পানি সিঞ্চন। উত্তরের সাথে দক্ষিণ, পুবের সাথে পশ্চিম একসাথে রয়। দ্বান্দ্বিকের সাথে বস্তুবাদ। ধর্ম শুধু আফিম নয়, তাহা জগতের প্রেমবন্ধনও বটে!
কেন লিখি কেন লিখি?
পুকারিছে প্রশ্ন সকল মাতালের ওয়ার্কশপ থেকে। লেদমেশিনে ধাতু কাটা হচ্ছে চতুর্মাত্রার কোয়ার্কধ্বনি শোনার জন্য। সাইবারনেটিক্স ছেড়ে যাচ্ছে ষাটের দশক। হাইড্রোলিক্স পানির ধারায় আর ফ্লুইড মেকানিক্সে নাই। তুমি আনারসের চোখ তুলে মধুপুরের রেয়ার খনিজে আমারে পুতে আসো। আবুল সুন্দরের ক্রিমিনালিটি নদীমোহনায় চাঁদপুরের নারীগবেষকের চাঁদের ব্লেডে কথা কয়ে আসে। ভোলা থেকে লোয়ার মেঘনার শোভা আমরা দেখিয়াছি। নিৎসের হাহাকার চিচুরাই বায়সের ক্রো ক্রো। টেড হিউজের চিড়িয়াখানায় মহকুমা শহর থেকে আসা সাব-ইঞ্জিনিয়ার বিকালে অস্ট্রিচের রানে। সিলভিয়া একলা কান্দে নিজেরে মারে তরুণ কবির সুইসাইড উকুনে।
তুমি কি লিখেছো কাছিমগালা, তিনটা মরা নদীর আবহমান শহিদি কারবালা? তুমি কি একটা পুরুষ পেপের আর্তনাদ চিরে সমকামী বিষণ্ণতা? সন্ধা না হতেই উড়ে যায় একদলা তিমির বমি। বমি নাকি অ্যাম্বারগ্রিসের ঘ্রাণ।
মিরর মিরর মিরর তুমি কই? আমি তোমার মনের ভিতর রই।
মিরর মিরর মিরর তুমি কে? যে আমারে আদর করে আমি তাহার হই।
মিরর মিরর মাঙ্কি মিরর আয়না মিরর কই
লাল হৃদয়ে ভালবাসায় তুই যে আমার সই!
পায়ুপথ বায়ুপথ যে মুখে অসুধ খায় তারে কি পিছু দিয়ে দিবা? তোমার অনলে পোড়ে কবিতা যে ধুনি দুর্বা দিয়া। তোমার সান্নিধ্যে ফাটে তুমুল কার্পাস। তোমার রচনায় ফাটে আন্ডারগ্রাউন্ড বাঁশ। তোমার বারুদে নাচে খরগোসের ছানা, তোমার জন্য রচিয়াছে কাঁটার বিছানা। রক্তপুঁজমাখা রেপিস্টের হাসি, তোমারে খামচায় অন্ধকার রাতি। তোমারে ডেকে নেয় পিশাচের ভাবী। তোমারে বানাতে চায় মাসানা-সুলাসা-রুবায়া বিবি। তোমারে বিক্রি করে নিষিদ্ধ চাকরিতে, তোমারে হাগাতে নেয় মধ্যবিত্তের সোফায়। তুমি শকুন্তলার দিদি, লাবণ্যের দেওরা, তোমারে বাঁশবাগানে নিয়ে যাবে এক নাদান ভাউরা। তুমি কবিতার পেটে মরা শিশু, কবে যে ইন্তেকাল করেছে ডাক্তার জানে না। তোমার পেটে অপুষ্ট শিশু, তুমিই জানো না কবে অকালপ্রসব করে কিভাবে বাঁচাবে নিজেরে। তুমি এমনই নাদান, জানো না বাঁচতে হলে ফেলে দিতে হবে নিজের দিস্তা দিস্তা কবিতা।
ছুঁইড়া ফেলাও না কেন ৪ফর্মার বই। হার্ডকভারে বাঁধা বহুকালারের বোরিং প্রচ্ছদে বোরিং টেকনিকে লেখা তোমার ইতর কবিতারাশি। কবিতার আয়ু ক্ষয় হৈয়া আসিয়াছে। মহামারী থেকে নিজেরেই বাঁচাতে হবে নিজের কবিতারে।
কবুতরের মায়াবি ইনডাকশন তাপে হাওয়া আর আগুনের ইতিহাস আলিঙ্গনে প্রভু পন্থের পানে চেয়ে থাকি। কিংকর্তব্যবিচ্ছেদপ্রাপ্ত নারীর বেদনার সাথে একমত তবে তারে বলি দূর হ এই বেলা। তোরে দেখে আমার যে প্রাণ যায় যায় করে। আমি নই রাখাল বা নৌকার মাঝি। আমি টেবিলে বড় হওয়া প্রাণি, আমার মাথা বড় কাঁধে স্নায়ু নড়োবড়ো। ইনডাক্সনের অপেক্ষায় দিনরাত বসে থাকি।
ছুঁয়ে যাও হে মেটাভার্স, সাবঅ্যাটোমিক পার্টিকেল আদরের ডিব্বা। ল্যাগব্যাগ কৌটায় বসত করো কন্যা দেড়আঙ্গুলি রাজকুমারী কবিতার হিপনোটিক বিষকন্যা, যে তিলে তিলে বড় হয়েছে বিষে নাই করে দিতে, তারে মেরে কবিতায় মিশায়ে দাও।
তুমি স্তম্ভন, উচাটন, সূর্য শিলা, আজোয়া স্টেশনারি মার্ট। তুমি ডায়মন্ডের মোঘলাই পরোটা পয়লা বৈশাখ। মঙ্গল, আনন্দ বা সাংগ্রাই শুভেচ্ছা জানাই। তুমি প্রোডিগো ওগো তুমি চুপে কেন নাগরিক মেডিসিন। তুমি বেক্সিট্রল শ্বাস, ভিটামিন সি টেবলেট চোষা আনন্দহীনতার চিকিৎসা উজানিয়া গান থেকে মুখ ফিরানো চড়কের সংজ্ঞা। তুমি দম নিয়ে জেগে ওঠো মাতৃজঠরে অ্যামবিলিক্যাল ফ্লুইডে হাবুডুবু। অতি শিশুকালের বিস্ময় হতেছে তোমার কবিতার লেখার কারণ।
তুমি একা বড় হয়েছো, বড় হয়ে দেখ বড় হতে হতে একাই রয়েছো। প্রতিটা মানুষ এইরকম একাই থাকে, তবে ভাবে সে থাকে অনেকের সাথে। ম্যাজিকের সমবায়, সম্পদ আছে বলেই টাকা আছে। আর টাকা থাকাতেই তোমার সাথে আমার বিবাদ হতেছে। সম্পর্ক হতেছে। ভাব হতেছে। অপেক্ষা। ঘৃণা। জলাতঙ্ক। টিটেনাস। হাম। নাত। জিকির। শ্লোক। মন্ত্র।
আমি লিখি যা আমি আমার সন্তানরে জানাতে পারি নাই তা জানাতে। আগামী দিনের জন্য কিছু সংকেত বানায়ে রাখতে চাই। কিছু সিম্বল তৈরি করে রাখি। কিছু কোড থাক-না আমার ইমেজে। আমার সিনটেক্স যাতে রহস্য খুলে দেবার পথে কাঁটা সরায়ে দেয়। আমি রচনা করি সেই গুপ্ত ছন্দ, যাতে না-দেখা পৃথিবীর কিছু স্পন্দন লিপিবদ্ধ থাকে। লিখি যাতে কিছু পার্থিব অদৃশ্য প্রকল্প প্রকাশিত হয়।
সান্ত্বনা নয়, প্যাশন নয়, সহানুভূতি নয়—আরো এক মাল্টিলেয়ারের বহুরূপকতা আমারে তারায়ে নিয়ে তকবিরের কাছে ফিরে আসে, যারে পারি না মুছে দিতে। সন্তান দুষ্টামি করে জোরে কবাট লাগালে চৌকাঠ কেঁপে ওঠে, তারে তুমি বকা দিও না। তার প্রতি যে প্রশ্রয়, তারে বলি দৃশ্যের ইমেজ। তার চিবুকে চুমু খেতে হয় কবিতার টুল দিয়ে।
‘পাইল্লার চাইতে ঢাকনা গরম’—কবিতা কেন লিখি এ-প্রশ্নের চাইতে কবিতার টুল বিষয়ক আলাপ জরুরি। সময়ের সাথে ছায়া বদলায়, নতুন ছবির জন্ম নেয়। কবিতা গেজে ওঠে হাড়িয়ার পাতিলে, ঢাকনা ফেঁপে ওঠে। উথলায় আসে ফেনার বলক।
ওগো আমার রাই কিশোরী, ওলো আমার পরস্ত্রী বধুয়া, তুমি আকাশ থেকে ভেসে এসে নামো আমার কীবোর্ডে। আসো তোমারে আলিঙ্গনে আগলাই, পিষে ফেলি, রসে রসে গতর মিশাই। কাদাখোচা পাখির ঠোঁটে নেমে আসুক প্রেম, জাগুক আগুন বাতাসে ঘষে হাহাকার ছুটায়ে দেই। মাখামাখি আলো অন্ধকারে তিব্বতে মালভূমিতে, গোবি মরুভূমির বালির আস্তরণে। রণহুঙ্কার জলে স্থলে, স্থানে আর স্তানে। স্তনে স্তনে।
২১ শে এপ্রিল ২০২৬
প্রোডিগো, ধানমন্ডি, ঢাকা
গানপারে কাজল শাহনেওয়াজ
কেন লিখি গদ্যপ্রবাহ
- মদ ও সন্ধ্যাঘর || শুভ্র সরকার - April 25, 2026
- কেন লিখি || কাজল শাহনেওয়াজ - April 24, 2026
- বিস্মৃতির পরিভাষা ও অন্যান্য || শুভ্র সরকার - April 20, 2026

COMMENTS