তথ্যকণিকার আদলে হলেও দুনিয়ার নানা গানের ধারা, ধারণা, ব্যক্তিক ও দলভিত্তিক গানবাজনার পুরাতনী দিন ও হালজামানা নিয়া আমরা মাঝেমধ্যে আলাপ চালাতে পারি। কিন্তু সবিস্তার আলোচনা আমরা গানপারের ডেস্ক থেকে নিজেরা করব না, নানাজাতি মিউজিক নিয়া আলোচনাসামর্থ্য আমাদের অল্প কথাটা না-বললেও বোঝা যায় নিশ্চয়, আজকের দুনিয়ায় গ্যুগল্ করলে অ্যাভেইলেবল চক্ষের নিমেষে এপিস্টেমোলোজির আগাপাশতলা। কাজেই আমরা চাইব দুনিয়ার গানের বিচিত্র উপধারা-মূলধারা নিয়া পাঠক ও লেখকরাই লিখবেন, উইকিপিডিয়ার তথ্যজঙ্গলের বাইরে বেরিয়ে এবং ভেতরে ঢুকে লেখক লিখবেন বাংলায় নিজের অভিজ্ঞতা-আবেগ পাঞ্চ করে, উইকিতে যা আছে তা তো রইছেই ক্লিকদূরে, লেখক বাংলায় লিখবেন উইকিতে যা নাই তা সন্নিবেশ ঘটাইবার মানসে। এমন ভাবনা মাথায় রেখে রেগ্যুলার গানপারডেস্ক থেকে বেশকিছু সংগীতকণিকা আমরা বাংলায় আপ্লোড করব। মনে মনে চাইব অন্যরা যেন তথ্যকণাগুলো পড়ে/দেখে তেড়েফুঁড়ে সেই ইনফোগুলো সবিস্তার নিয়া আগায়া আসেন। আজকে ল্যাটিন পপঘরানার কয়েকজন শিল্পী নিয়ে এমনই কিছু তথ্যক্যাপ্সুল আমরা হাজির করছি।
কিন্তু ল্যাটিন পপের ব্যবহার কি দেখেছি আমরা বাংলাদেশের গানে? হ্যাঁ, বাংলাদেশে ব্যান্ডধারার সংগীতে, বিশেষত পপসংগীতে, এর ব্যবহার আমরা ভালোভাবেই পেয়েছি। বিস্তর দল ও ব্যক্তি শিল্পীর নাম মুখে আসবে, একটা নাম যদি নিতে হয় তো, এই মুহূর্তে, ফর এক্সাম্পল, লাকী আখান্দের নাম নেয়া যায়। ল্যাটিন পপ ঘরানায় এই মিউজিশিয়্যান নিজের সংগীতায়োজনগুলো দিয়ে বাংলাদেশের শহরবন্দর এমনকি নিঝুম গ্রামদিগন্তেও পৌঁছে যেতে পেরেছিলেন। হ্যাপি আখান্দের এমন একডজনের বেশি কম্পোজিশন পাওয়া যাবে যেগুলো শহরে এবং গ্রামে সমান শ্রোতাগ্রাহ্য। শুধু বাংলা ব্যান্ডসংগীত বা বাংলাদেশের গান কেন, দুনিয়ার সর্বত্রই ল্যাটিন পপের ঢেউ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এ এমনই ইনফেকশাস/সংক্রামক সংগীতচিহ্ন যে ল্যাটিন পপ মিশ খায় প্রায় সমস্ত ভূখণ্ডেরই সাউন্ডস্কেপের সঙ্গে। কেবল তা-ই নয়, লক্ষ করলে দেখা যাবে, ল্যাটিন পপ যে-কোনো দেশের গ্র্যাসর্যুটে সে-দেশের ফোকমিউজিকের শিরায় মিশ খেয়ে যায় ইমিডিয়েইটলি। সিরিয়াসলি যদি কেউ সমীক্ষায় যেতেন তো কয়েকটা ট্র্যাডিশন্যাল ইন্সট্যান্সের পাশে বেশকিছু রিসেন্ট ফেনোমেনা দাঁড় করিয়ে ইন্ট্রেস্টিং কয়েকটা ফাইন্ডিঙস্ বার করে আনা যেত। ডলি সায়ন্তনী প্রমুখ কয়েকজন শিল্পী আমাদের দেশে নাইন্টিসের মাঝভাগে একদম পাড়াগাঁয়েও উন্মাদনা ক্রিয়েইট করতে পেরেছিলেন ফোকবেইসড গান দিয়ে, ব্যান্ডের মধ্যে যেমন ‘মাইলস’, এইগুলা ল্যাটিন পপেরই ম্যাজিক বস্তুত।
কথা কাট-শর্ট করে এইখানে আমরা খালি কিছু তথ্য টুকে রেখে যেতে এসেছি। কিছু জনপ্রিয় শিল্পীর নামওয়ারী ইতিহাস বলতে পারি এইটা, ল্যাটিন পপের আদ্যোপান্ত অথেন্টিক হিস্ট্রি এইটা না। নানাভাবেই হিস্ট্রি রিকালেক্ট করবার এইটাও এক তরিকা যে, এক-সময়ের লোকমানসে ঢেউ-তোলা ব্যক্তি শিল্পী/কর্মকের মাধ্যমে অ্যাব্রিজড ফর্মে হিস্ট্রি রিভিজিট করা। বাংলাদেশের কিছু মিউজিশিয়্যানের নাম আমরা নেব শুধু ধর্তাইটুকুর জন্যে, এমন মনে করার কারণ নাই যে এই নামাবলি দিয়া খাটো করা হচ্ছে হিস্ট্রিটাকে, এইটা আদৌ কম্পারেটিভ স্টাডিও নয় লাতিনো সংগীত ও বাংলা সংগীতের, শুধু কয়েকটা ব্রাশটানে একটুকুনি মিউজিক স্মরণ করা। আমরা এই নিবন্ধে সেইটাই করছি।
টিটো প্যুন্টি নামে একজন শিল্পীকে একদম গোড়াতেই ইয়াদ করছি। ফিফটিজের দিকটায় এই শিল্পী ল্যাটিন পপে রেকর্ডব্রেইকিং ক্যারিয়ারের পিকে ছিলেন। স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত টিটো পঞ্চাশ বছর ধরে একটানা তার নিজের হাতে গড়ে তোলা ল্যাটিন জ্যাজ ব্যান্ডের প্রধান ছিলেন।
রিচি ভ্যালেন্স। ‘লা বাম্বা’ গানটার কথা যাদের ইয়াদ আছে, এই শিল্পীর নাম শোনা মাত্র দুলে দুলে এই টিউন গুনগুন করবেনই। ডিস্কো, কন্সার্ট, পার্টি ইত্যাদি মাতিয়ে রাখার দরকারে এই গানটা আজও প্রতিদ্বন্দ্বী নৃত্যসংগীতগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেঁচে আছে। এই শিল্পী, রিচি ভ্যালেন্স, সিক্সটিজের গোড়ায় ক্যারিয়ার শুরু করলেও সেভেন্টিজে এসে ক্যারিয়ার পোক্ত করেন। ‘লা বাম্বা’ ভ্যালেন্সের অলটাইম হিট। ফিফটিনাইনে এই গান দুনিয়া মাৎ করার সময় রিচির বয়স ছিল সতেরো মাত্র। লাকী আখান্দ এই শিল্পীর কিছু জায়গা বাংলা ফর্ম্যাটে একদম পার্ফেক্টলি ইন্ট্রোডিউস করতে পেরেছিলেন।
কার্লোস স্যান্টানা। বাংলাদেশের ব্যান্ডগানে এই শিল্পীর কাজ আত্তীকৃত হয়েছে এলআরবি-র মাধ্যমে। ব্যাপক লম্বা ক্যারিয়ার স্যান্টানার। সিক্সটিনাইনে স্যান্টানার ব্রেইকথ্রু গানটা ‘ইভিল ওয়েস’ যা আজও অনবদ্য। প্যুন্টির বিখ্যাত ‘ওয়ে কোমো ভা’ গানটা স্যান্টানা কাভার ভার্শন আকারে গাইলেন এবং ব্যাপক জনপ্রিয় হলো পুরানা লাতিনো সংগীতকাজটা স্যান্টানার মাধ্যমে এবারও।
হুলিয়ো ইগ্লেসিয়াস। ‘হুয়ানতানামেরা’ গানটা বাংলাদেশেও অনেক জনপ্রিয় হয়েছিল। দুনিয়ার ঢেউ বাংলাদেশে বেশ তাড়াতাড়িই এসেছে সবসময়। সেইটা টেলিভিশনের মাধ্যমে, রেডিয়োর মাধ্যমে, এলপি হোক বা ক্যাসেট-সিডি ইত্যাদির মাধ্যমে। অ্যানিওয়ে। যে-কথা বলছিলাম, ইগ্লেসিয়াসের হুয়ানতানামেরা অ্যামেরিকায় এইটিফোরে ব্যাপক শ্রোতা মাতিয়েছিল। সেই বছরে অ্যামেরিকায় বিদেশী ভাষার অ্যালবামগুলোর মধ্যে বেস্টসেল হয়েছিল হুয়ানতানামেরা। অ্যামেরিকায়, এবং বিশ্ব জুড়ে, ইগ্লেসিয়াস সেই-সময় ছিলেন স্যুপারস্টার।
গ্লোরিয়া এস্তেফান। ল্যাটিন পপের প্রথমদিককার সম্রাজ্ঞী তিনি। ইন্টার্ন্যাশন্যাল ডিভা অফ ল্যাটিন পপ বলা হয় গ্লোরিয়াকে। জ্যাজ্ এবং সাল্সা ধাঁচের পপ দিয়াই তিনি বিশ্ব মাৎ করেন। তার স্টেজপ্রেজেন্স, শরীরী জেশ্চার, সবকিছুতেই ছিল রয়্যাল এলিগ্যান্স। গ্লোরিয়ার জ্যাজ্ ও সাল্সা অ্যালবাম অ্যামেরিকায় লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়। বাংলাদেশেও তিনি জনপ্রিয় হয়েছিলেন। নব্বইয়ের দিকে ভিসিআরযন্ত্রে জ্যাকসন-ম্যাডোনা বা ভারতীয় অ্যালিশা চিনয় প্রমুখের মিউজিকভিডিয়োর ক্যাসেট ভাড়ায় এনে দেখার/শোনার চল হয়েছিল। তখন গ্লোরিয়া এস্তেফানের প্রবেশ বাংলার ড্রয়িংরুমগুলোতে। এইটিফাইভে এস্তেফান তার ক্যারিয়ারের পিক ছুঁয়েছিলেন পয়লা। তারপর মিড-নাইন্টিস্ পর্যন্ত কন্টিনিউ করেছেন।
সেলেনা। নাইন্টিসিক্সের সেন্সেশন। ‘ড্রিমিং অফ ইয়্যু’ মনে পড়বে সেলেনার নামোচ্চার হবার সঙ্গে সঙ্গে। তেজালো কণ্ঠের গায়িকা সেলেনার প্রধান হিট এই ড্রিমিং অফ ইয়্যু গানটা। ক্যারিয়ার খুব লম্বা পান নাই। জীবদ্দশায় ইন-ফ্যাক্ট সেলেনাকে তেমন লক্ষই করে নাই মিডিয়া বা গানসমুজদার কেউই। বিশেষ কেউই চিনত না তাকে। এরপর সেলেনা আকস্মিকভাবেই নিহত হলেন গুলিবিদ্ধ হয়ে। সেই ঘটনার অব্যবহিত পরে সেলেনা আবিষ্কৃত হন শ্রোতাসমাজে। সেলেনার অ্যালবামবিক্রি চড়চড়িয়ে উঠতে থাকে উপরের দিকে। সেলেনার লাইফ নিয়া ম্যুভিও হয়। সেই সিনেমায় নামভূমিকায় অ্যাক্ট্রেস হিশেবে আবির্ভূত হন আরেক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী জেনিফার লোপেজ, লাতিনো সংগীতচিহ্ন লোপেজের গানে-নাচেও লক্ষণীয়।
জেভিয়ার কুজেট। অনেক পুরনো দিনের লাতিনো সংগীতশিল্পী। তিরিশ/চল্লিশের দশকের। তিনি ‘কিং অফ রুম্বা’ আখ্যায় ছিলেন মশহুর। একসময় জেভিয়ার অতিকায় সেন্সেশনে পরিণত হয়েছিলেন।
রিকি মার্টিন। সম্ভবত খুব বেশি বলতে হবে না এই শিল্পী সম্পর্কে। রিকির মিউজিক-ক্যারিয়ারের শুরু আগে থেকে হলেও পরিচয়টা আসে নাইন্টিনাইনের ওয়ার্ল্ডকাপে গেয়ে। সেবারকার থিমস্যং গেয়ে রিকি বিশ্বজোড়া বালবৃদ্ধবনিতার প্রিয়ভাজন হয়েছিলেন। লাতিনো সুরের সাহচর্যে কেমন মাতোয়ালা হতে পারে একটা আস্ত দুনিয়া, আমাদের অভিজ্ঞতা হয় রিকির এই থিমস্যং দিয়া। খালি থিমস্যং নয়, সেবারকার গ্র্যামি পর্যন্ত গানে মাতিয়ে-নাচিয়ে বুঁদ রেখেছিলেন দুনিয়াবাসীকে। কেবল স্যুপারস্টার বললে কম বলা হয়, রিকি হয়ে উঠেছিলেন স্যুপার-কা-উপার বাম্পার এক্সট্রালার্জ হিট।
শাকিরা। অ্যারাব-ল্যাটিন রক্ত শরীরশিরায় নিয়া আবির্ভূত এই মহান শিল্পীটিকে এই নিবন্ধের উপসংহার হিশেবে রেখে এইবেলা বাই-বাই বলা যাক। শাকিরা নিয়া তথ্যকণিকা প্রথমত অদরকারি, দ্বিতীয়ত লোকের স্মৃতিতে শাকিরা তাজা, তৃতীয়ত তথ্যকণিকায় শাকিরা সামলানো সম্ভব হবে না। শাকিরা নিয়া আলাদা আয়োজনের তোড়জোড় গানপারডেস্কে বেশকিছুদিন শম্বুকগতিতে এগোচ্ছে, এইবার পালে একটু গতিবেগ সঞ্চার করতে হবে বোধহয়।
… …
- In all departures there is an arrival & other poems || Roushan Hasan - September 11, 2026
- সাম্যের দিকে যেতে যেতে লেখাপত্র || রোদ্দুর রিফাত - September 10, 2026
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026

COMMENTS