মুখস্থ মুজরো ৬

মুখস্থ মুজরো ৬

নক্ নক্ নকিং অন হ্যাভেন্স ডোর …

বব ডিলান নোবেল বাগাবার অব্যবহিত পরে বাংলায়, বাংলাদেশে, একটা গ্যাঞ্জাম হয়ে গেসলো অনুবাদের। হুজুগ এমনিতেই ওঠে প্রত্যেক বছর নোবেল অ্যাওয়ার্ড ঘোষণার পরে, অ্যাওয়ার্ড-রেসিপিয়েন্টরে কে কত আগে থেকে চেনে এই তথ্য হুমড়ি খেয়ে জ্ঞাপনের হুজুগ। ববির নোবেল নসিবের খবর শুনে বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলার বিপ্লবফেইল বুড়া এডিটরদের খায়েশ জাগে পেয়ারা ‘ষাটের দশকে’ তেনারা যে কেমন উন্নত অনেককিছু করেছেন পেয়েছেন দিয়েছেন থুয়েছেন ইত্যাদি কিসসা আপন পত্রিকার পয়লা পাতায় লিডস্টোরি লিখে জানাইতে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ববি নিয়া গানবাজনার অনুভূতিবিবর্জিত বৈপ্লবিকতার গালগল্পে একনাগাড়ে কয়েক হপ্তা কাটাতে হয়েছে দেশের পেপারসাবস্ক্রাইবারদেরে। এডিটরের লগে পাল্লা দিয়া সাবেডিটরদেরও হুজুগ ছিল নোটিস করবার মতো।

ওদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায়, বাংলায় যা প্রায় একমেবাদ্বিতীয়ম ফেসবুক, আরেক ড্রামা দেখতে দেখতে দেশবাসী আমোদ পেতে পেতে আমাশয় লেগে গেসলো গণহারে। আমোদের আমাশয়। লাখো জনতা ডিলানের গান জন্মাবধি শুনে আসছে এমন দায়দাবির পাশাপাশি প্রতেকে একেক বান্ডিল গানের অনুবাদ নিয়া হাজির হইতে থাকে একলা বা সদলবল। খুবই চিত্তচাঞ্চল্যকর গরিমা করার যোগ্য ঘটনা। ঘাপলা বাঁধে দেশের লিটারেইসি রেইটের লগে মিলায়া বক্ষ্যমাণ ববিভাষান্তরের হুজুগ বিচার করতে যেয়ে। অ্যানিওয়ে। এরচেয়েও উদ্বেগজনক ছিল ফেসবুকে একে অন্যের অনুবাদ চুরির অভিযোগ উত্থাপন, ভুলভাল অনুবাদ বলে একে অন্যেরে নিয়া ঠাট্টা, আর সর্বোপরি ট্রলের পরাক্রমী শোর মাচানো তো উল্লেখ বাহুল্য। সবচেয়ে বেশি বিস্ময়কর ছিল লোকে উইকি ঘেঁটে ফেসবুকে মাশ্টারি করছিল কোন গানটা কার জন্যে এবং কাকে নিয়ে এবং কেন ও কোথায় এবং কীভাবে ও কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা হয়েছিল প্রভৃতি নিয়া। তা, ভালো, গান বা সাহিত্যের সবকিছু যদি পিছনের ইতিহাস বা পটভূমি জেনেশুনে একজন সাহিত্যসম্ভোগে লিপ্ত হয় তাইলে রস নিশ্চয় বেশিই নিঃসৃত হয়। কিন্তু পশ্চাৎ বা আশপাশের তথ্য যদি মূল টেক্সট রিড করার ক্ষেত্রে মাস্ট বিবেচিত হয়, তাইলেই মুশকিল।

তবে এই-যে নেপথ্যের তথ্যগুলো, কবিতা বা গান রচনাকালে কবি এক্স্যাক্টলি কি কি মুসিবত মাথায় রেখে কবিতাটা বা গানটা লিখেছিলেন, এইগুলো ভুলে যেয়েও যদি কবিতাটা/গানটা দাঁড়াতে না-পারে, সেই জিনিশের অনুবাদানুবাদ করলেই কি আর না-করলেই কি। সিক্সটিজের অ্যামেরিক্যান্ পেসিফিস্ট ম্যুভ বা সেই স্ট্রিট রেভোল্যুশনের দশকে বা তার আগে-পরে যেসব গান-কবিতা আংরেজিতে হয়েছে, সেগুলো যদি সেই নির্দিষ্ট ঘটনার/ঘটনাবলির প্রাসঙ্গিকতা ব্যতিরেকে ব্যঞ্জিত হতে না-পারে এই টোয়েন্টিফার্স্টে এসে, তাইলে এরা আয়ুর্বেদের কোনো তুকতাকেই জীবন্ত থাকতে পারবে না। কাহিনি থেকে বের হতে না-পারলে সেইটা কাব্য বলবে কেন লোকে?

একটু উদাহরণ আঁজলায় নিয়া আলাপ করা যাক। বব ডিলানের ‘নকিং অন হ্যাভেন্স ডোর’ গানটার অনুবাদ তো ছেলেবুড়ো সকলেই করেছেন। পথিমধ্যে এক পণ্ডিত এসে প্রমাদ ধরায়ে দেন যে এই গানের ব্যুৎপত্তি না-জেনে সবাই অনুবাদ করছেন এবং আলবৎ ভুল করতেসেন। ক্যাম্নে? এই লিরিকের কিয়দংশ কৌট করা যাক আগে : “মামা, টেইক দিস্ ব্যাজ-অফ অফ মি / আই ক্যান’ট ইউজ ইট অ্যানিমোর / ইট’স্ গেটিং ডার্ক, টুউ ডার্ক টু সি / আই ফিল আয়্যাম নকিং অন হ্যাভেন্স ডোর” … “মামা, পুট মাই গান্স ইন দি গ্রাউন্ড / আই ক্যান’ট শ্যুট দেম অ্যানিমোর / দ্যাট লং ব্ল্যাক ক্লাউড ইজ কামিং ডাউন / আই ফিল আয়্যাম নকিং অন হ্যাভেন্স ডোর” … গানটা আদৌ লম্বা তো নয়, এট্টুকুনই, রিপিটেড পার্টগুলা বাদ দিলাম। জনৈক মন্তব্যকারী অ্যাসোসিয়েইটেড উয়িথ দ্যাট বাংলা ট্র্যান্সলেইটর এসে ক্লেইম করেন যে এই গানের ‘মামা’ শব্দটার বাংলা ‘মা’ করলেই মার্ডার হয়া যায়। কারণ, সেই রিয়্যাললাইফ ঘটনাটায় যিনি অ্যাসাসিনের শিকার হয়েছিলেন তিনি নিজের স্পাউসকে এই কথাগুলা বলতেসিলেন ইত্যাদি ব্লা ব্লা ব্লা। তারপর মন্তব্যকারী মহোদয় বিপুল বিক্রমে সেই কাহিনিটা শেয়ার করেন যা কিনা উইকিপৃষ্ঠায় ফার্স্ট ক্লিকেই বাইরায়। তিনি দাবি করেন যে সেই বিকট ট্রলের ভিক্টিম বেচারা সাজ্জাদ শরিফই শুধু নয়, বাংলার জোয়ান-প্রৌঢ় সক্কলেই সিলি মিস্টেইকটা করে যাচ্ছেন এবং বউরে মা ডাকতেসেন ব্লা ব্লা।

অ্যানিওয়ে। এইখানে অবশ্য মনে হয় না আমার যে কেউ বর্ণিত ইনফোটুকু না-জেনে ‘মাগো’-‘মাগো’ করেছেন। ‘ব্যাপারটা তো ভিন্ন’ নয় আসলে, শেরিফের পেশাটা ভুলে যেয়ে লেখক/পাঠক নিজেরে রিপ্লেইস্ করতে চেয়েছেন হয়তো অথবা স্ত্রীর জায়গায় মাকে, ব্যাপারটা গানের/টেক্সটের নেপথ্যগল্পসংলগ্ন না-থাকবার স্বাধীনতাজনিত। খুব হেরফের হয় না কিন্তু! বরং অর্থপরিসর অনেকটা ব্যাপ্তিও পায়া যায়, ভিয়েতনাম-যুদ্ধে-যেতে-বাধ্য-হওয়া হানাদার মার্কিনী কোনো মায়ের সৈনিক পুত্রের কথা মাথায় রাখলে বা ধরেন এই টোনে মা-ছেলের কথোপকথনধাঁচায় হৃদয়টাচিং অ্যানোনিমাস্ অসংখ্য ইংরেজ লোকপদাবলি আছে, এমনকি বাংলাতে বেশ অনুবাদও হয়েছে সেগুলা, আপনার বা আমার একবারও কি মনে হয় না যে ডিলানের মতো বাগগেয়কার শেরিফঘটনাটার অব্যবহিত পরে এই লিরিকটা লিখলেও ওইখানে একেবারেই থাকতে চান নাই?

কিংবা ধরেন শেরিফের হত্যা-অনুষঙ্গ নিয়া মার্লের একটা গান আছে বহুশ্রুত, সম্ভবত ‘আই শট দ্য শেরিফ’, ওইখানে দেখবেন আই শট দ্য শেরিফ  কথাটা দিয়া আপনি অন্য জায়গায় যেতে পারছেন, এবং বাংলায় না-গেলেই বরং কিম্ভূত ও আরোপিত শোনায়। একটা ওয়েস্টার্ন ফ্লেভ্যর রেখে এর বাংলা হতে পারে না তা নয়, আমি নিজে এখানে একটা রাখালছেলে আর ইউপিমেম্বারের দ্বৈরথ বা শাহরিক লেগ্যুনাচালকের সঙ্গে সেমিআর্বান কোনো ডোমিন্যান্ট ফোর্সের সংঘাত দেখিয়ে ব্যাপারটা ক্যাপ্চার করতেই পারি। ঠিক টায়ে টায়ে তা-ই করতে হবে এমন নয়, এক্সাম্পল্ হিশেবেই বলে রাখা।

আর এই পিছনের গল্পগুলোর ক্ষেত্রে দেখবেন যে এমনকি ডিলানের অফিশিয়্যাল্ ওয়েবসাইটেও উনি নিজে তো বলছেন না কাহিনিটা, আর ডিলান যা মাল তা তো অন্তত আমার চেয়ে আপনি/আপনেরা আরও ভালো জানবেন যে ইন্টার্ভিয়্যুগুলোতে যে-সুরতের হেঁয়ালি জীবনভর করে গেছেন উনি নিজের ব্যাপারে, কোথাও যদি নিশ্চয়াত্মক কিছু বলেও থাকেন তবে সেগুলোকে ডেফিনিট ভেবে নেয়া পাঠকের তরফে হবে এক আমোদজনক বোকামো। উইকি ইত্যাদির ব্যাপারস্যাপার যত কম আমলে নেয়া যায় সেই চেষ্টা তো কর্তব্য মনে হয়। যেমন ধরেন, ববির যেসব গানের নেপথ্য কাহিনিতে জোয়্যন বায়েজের পরোক্ষোল্লেখ পাবেন, সেগুলো শুনতে যেয়ে ববির গার্লফ্রেন্ডের কিংবদন্তি ভুলতে না-পারলে তো অবসিনিটিই হয়। আর সিনেমার সেই ‘পৃথিবী আমারে চায় / রেখো না বেঁধে আমায়’ গানটা আমরা কি আর ওই ‘ভিন্ন ব্যাপার’ মানে বিপ্লব মনে রেখে শুনি? কিংবা ‘আমার সাধ না মিটিল / আশা না পুরিল’? বা ‘একবার বিদায় দে মা’? কাজেই, নিরেট গানটার জন্য গল্প/ইতিহাস মুছে ফেলে না-দেয়া পর্যন্ত বলতে পারবেন না আপনে যে এইটা গান/কাব্য হিশেবে কেমন সফল বা ব্যর্থ।

ববির এই গানটা, বা অন্য যে-কোনো, যারাই বাংলা ভার্শন করবেন/করছেন তারা আজকের যুগে এসে নেপথ্যকথা না-জেনে কেউই লিখছেন বলিয়া আমি বিশ্বাস করি না। বরং উল্টোটা। আমি নিজে এমন অসংখ্য কবিতা/গান/সিনেমা ইত্যাদি জিন্দেগিতে এখনও অলসতাহেতু অভিজ্ঞতাভুক্ত করি নাই, কিন্তু পটভূমিকিসসাগুলা জানি। ঠিক যেমন মূল বইটা না পড়ে সেটি কীভাবে লেখা হয়েছে এবং কোন ঘটনার জেরে এইসব আশপাশকথা জেনে জিন্দেগি কাটায়া দেই বড়াই করতে করতেই। কিন্তু এই লিরিকের গতরে ‘মাগো’ সম্বোধন থাকাতে কেউ উল্লেখকৃত গল্পের প্রতি ‘বিশ্বস্ত’ না-থাকার কোনো সঙ্কট তৈরি হয়েছে ক্লেইম সেইটা বাড়াবাড়ি দাবিই তো বলব। যদিও ‘মূলানুগত্য’, ‘ভাবানুগত্য’ ইত্যাদি জিনিশের ঝকমকা মাস্তানি ব্যক্তিগতভাবে দেখতে পারি না আমি, দুইচক্ষেই। বলতে কি পারি না আমরা যে, এক বোধিনী বা ছাত্রসখা ছাড়া শাব্দিক অনুবাদে কেউ অতটা বাধ্য বোধহয় নয়।

শাব্দিক অনুবাদ দরকার আছে, মূলানুগ অনুবাদ দরকার আছে, ভাবানুগ অনুবাদও অগ্রাহ্য নয়, কিন্তু অভিজ্ঞতার অনুবাদও দরকার। বাংলা কবিতার, বাংলা গানের, বাংলা ছোটগল্পের, বাংলা সাংস্কৃতিকতার কাছাকাছি/অনুবর্তী থেকে এবং/অথবা দূরে যেয়ে একটা গানানুবাদের অভিজ্ঞতা। আর আমরা/আমি বিপদে পড়ে, বিশেষত মৃত্যুমুহূর্তে, ‘প্রেয়সী গো মরে গেনু’ অথবা ‘বউ তুমি কই’ বলিয়া ডাকি নাই কোনো জন্মেই। নেক্সটে, নেক্সট জন্মে, ডাকব মনে হয়। কিন্তু এই লিরিকটা বাংলায় ভাদ্রমাসে বোধহয় বেশ অর্থকর হয়ে উঠতে পারে, যেমন রেফ্রেন্স পাওয়া যায় বাংলার চিরায়ত কৌতুকীতে, গেরস্তের গরু হারালে। অ্যানিওয়ে অ্যাগেইন্। গল্পরেখা মুছে যেয়ে যেটুকু বেঁচে রয় সেটুকুই কবিতা।


লেখা : জাহেদ আহমদ


ভূমিকার পরিবর্তে একটা পাদটীকার ন্যায় ভাষ্য যুক্ত করিয়া রাখতে চাইছি নিবন্ধপ্রবাহ ‘মুখস্থ মুজরো’ প্রত্যেকটা পার্টের সঙ্গে। বেঁটেখাটো কৈফিয়ত গোছের একটা ভাষ্য। পুনরাবৃত্তাকারে এইটা অ্যাটাচ করা থাকবে এর এপিসোড প্রত্যেকটার লগে। কেবল ইয়াদ রাখতে হবে এই নিবন্ধপ্রবাহ সংগীতবিষয়ক কোনো কড়া আলোচনা নয়। আদৌ সংগীতগদ্য নয় এই রচনা। নামের মধ্যে একটা নাচাগানাবাজানার আভাস থাকলেও মোদ্দায় এইটা গালগপ্পো। অনুষঙ্গ-উপানুষঙ্গ-অনুপান হিশেবে এইখানে শ্রবণাভিজ্ঞতাগুলা আসবে এবং চলেও যাবে। সে-অর্থে এইখানে রেফ্রেন্সের খোঁজপাত্তা খামাখা। আদতে এইখানে রেফ্রেন্সেস নাই বিধায় রেফ্রেন্স চেকের পরিশ্রম করতে যাওয়াটাই বৃথা। ধারাবাহিক মুক্তগদ্য ধাঁচের রচনা, ব্যক্তিগতিকতায় ভরা বা আবোলতাবোল, আবার অতটা ধারাফারা মান্য করবার বাঁধিধরা নাই কিছু। অনিয়মিত, সবিরত, কখনও সময়ে-সুযোগে একনাগাড় নিয়মিতও হতে পারে। একেকটা পার্টে একটামাত্র অনুচ্ছেদ, অথবা চাইর-পাঁচটা মাত্র, পরিকল্পনা আপাতত অতটুকুই। মিউজিক-লতানো গল্পগুলা, গান গাইবার বা গানের সমুজদারিতার গল্পও নয়, গানশোনার আবছা আলাপচারি। স্মৃতিরই রোমন্থন, মুখস্থ মুজরো, সুরাশ্রিত অটোবায়োগ্র্যাফিকতা। — জা.আ.


অজ্ঞাতনাম কোনো শিল্পীর চিত্রকর্ম প্রচ্ছদে ব্যবহার করা হয়েছে গ্যুগল ইমেইজেস্ থেকে নিয়ে। লেখা : জাহেদ আহমদ

মুখস্থ মুজরো ১
মুখস্থ মুজরো ২
মুখস্থ মুজরো ৩
মুখস্থ মুজরো ৪
মুখস্থ মুজরো ৫

COMMENTS

error: