শেরপা

শেরপা

ফারক মাহফুজ আনাম জেমস্। বছর-দশ আগে একটা বহুল প্রচারিত দৈনিকের মিনি-ইন্টার্ভিয়্যুতে জেমস্ বলেছিলেন যে তিনি তার চূড়া ছুঁয়ে ফেলেছেন, নতুন করে বেশিকিছু দিবার তার নাই আর। কথাটা আদৌ অসত্য নয়। কিন্তু চূড়া ব্যাপারটারে কে কীভাবে এবং কোত্থেকে দেখছে, এর ওপর নির্ভর করে চূড়ারোহণের সত্যাসত্য। জনপ্রিয়তার নিরিখে যে-চূড়া তা বটে কেউ সতেরো বছর বয়সেই হাসিল করে ফেলে, লেননদের বিটলস যেমন করেছিল, এবং যা-কিছু জনপ্রিয় হয় তা তো রদ্দি মাল নয় নেসেসারিলি, কিন্তু শিল্পীর যে-সার্চ, শুধু শিল্পীর কথাই কেন বলি, ইন-কোয়েস্ট থাকাটারেই তো জিন্দেগি বলে, একজন সাধারণ মানুষের যে-তালাশ দৈনন্দিন, সেই জীবনখোঁজা পাহাড়ের পিকের সেই চূড়ার নাগাল কি পাওয়া যায়? যায় যখন, তখনই জিন্দেগি থমকায়। স্থিতাবস্থারে তো জিন্দেগি বলে না। কাজেই, সৃষ্টিশীলের সার্চ এবং থার্স্ট, সাধারণের লাস্ট ফর লাইফ, কক্ষনো কোনো চূড়ার নাগালে যেতে দেয় না। ব্যাপারটা জীবনবান্ধবই আগাগোড়া। কাজেই পিপাসাটা জাগায়ে রেখে যেতে হয় হামেশা।

ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস্ অবশ্য চূড়ার কথাটা আন্দাজ করি বলেছিলেন একটা বীতশ্রদ্ধতা থেকে; যে, এত প্রত্যাশা তার কাছে লোকের, এত প্রত্যাশার লেলিহান আগুন নিভানোর দমকলশ্রম হুদা আর দিতে চাইছেন না তিনি। ইচ্ছার বিরুদ্ধে শিল্পী তার আর্লি দিনগুলোতে যেমন তরিকায় স্ট্রাগল্ করেছেন, করে থাকেন যেমন সকলে, এখনও ওইভাবেই করে যাবেন তা তো হয় না। ব্যাপারটা কাজেই ঠিক আছে; জেমস্ যে-কথাটা কয়েছিলেন সেইটা আমরা এইভাবে পোজিটিভলি দেখতে পারি। জিন্দেগিভর খালি বোদ্ধাদের চিন্তা মাথায় রেখে বা বাজারের চিন্তা মাথায় রেখে, সমুজদার আর ফ্যানবেইসের চিন্তা মাথায় রেখে, পিউর রক্ বা সাইকেডেলিয়া মাথায় রেখে গেয়ে যেতেই হবে কেন শিল্পীকে? ব্যাপারটা আরেকভাবেও বলা যায় যে, এস্ট্যাব্লিশড হয়ে যাবার পরে জেমস্ যেভাবে গাইছেন যা-ই গাইছেন তা বাজারেরই চিন্তা মাথায় রেখে, বাজারেরই নির্দেশে, বাজারেরই মন যুগিয়ে পেট ভরিয়ে। এই সময়েই, মিউজিকে এস্ট্যাব্লিশড হয়ে যাবার পরেই, নিরীক্ষাটা আরও ভালোভাবে চালিয়ে নেয়া সম্ভব ছিল জেমসের পক্ষে। উল্টাপাল্টা বাদ্যিবাজনায় ভাসিয়ে নেয়া সম্ভব হয় এই সময়েই। কিন্তু রুটিরুজির আনসার্টেইনিটি তো থাকে, সেইটা তো ওইভাবে হোক বা এইভাবে থাকেই। শিল্প তো অভাবিত অনির্দেশ্যতারই গর্ভসম্ভূত, অনির্দেশ্যতা আনসার্টেইনিটি নিয়াই শিল্পী।

স্বীকার করব যে, জেমসের ক্যারিয়ারে একাধিক পর্যায় গিয়েছে। এই ফেইজগুলোর মধ্যেই তিনি নিজেরে বদলিয়েছেন, নবায়ন করে নিয়েছেন নিজেরে, এখন চলছে জেমসের মঞ্চপর্যায়। মাঝখানে একটা টাইম গেল বলিউডি ফিল্মিগানে। সংখ্যায় হাতে-গোনা হলেও বলিউডি পিরিয়ডে জেমসের প্রায় একদশক পারায়ে গেছে, এর মধ্যে জেমস্ কোনো সোলো বা ব্যান্ড অ্যালবাম করেন নাই বাংলায়। ব্যান্ডের জরুরৎ বোধহয় এখন নাই আর জেমসের; শুধু জেমস্ কেন, বাংলাদেশের কোনো শিল্পীই বোধহয় এখন আর ব্যান্ডের নেসেসিটি অবভিয়াস বোধ করেন না। হ্যান্ডস্ তো লাগে, ব্যান্ডকে এই কাজটাই করতে দেখা যায়, ব্যান্ড মানেই এখন হ্যান্ডস্। নগরবাউল অতএব এখন জেমসের স্টেজশোগুলোতে হ্যান্ডসের কাজটাই নিষ্ঠার সঙ্গে ঘাড় নিচাইয়া পালন করিয়া যায়। জেমসের গান গাইবার সময় সাপোর্ট দেয়াই এখন যেন নগরবাউলের দায়িত্ব। শুধু নগরবাউলই নয়, প্রায় সব ব্যান্ডেরই অবস্থা তথৈবচ। প্রধান কণ্ঠের অনুবর্তী থাকতে হয় ব্যান্ডকে।

ফারক মাহফুজ আনাম জেমস্স্টেজযুগে জেমসের যে-চেহারা তা দেখতে হলে যেতে হবে একটা-কোনো কন্সার্টে। যে-তুজুর্বা, বাপ-রে-ব্বাপ! কন্সার্টের টেলিভিশন লাইভেও সম্যক ধরা যায় না ব্যাপারটা। গানের ওপর, গলার ওপর, গায়নশৈলীর ওপর যে-দখল লক্ষ করা যায়, ইম্প্রোভাইস্ করবার যে ইনস্ট্যান্ট ম্যাজিক জেমসে, এইটা লা-জওয়াব। সেদিনের সিলেট স্টেডিয়ামের কন্সার্টে যে-জেমস্, ২০১৮ মার্চে সিলেট সেন্ট্রাল স্টেডিয়ামে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আয়োজিত উন্নয়ন কন্সার্টে দেখা গেল যে-জেমসকে, একইসঙ্গে সমাহিত ও সংগীতোদ্দীপ্ত, অনেকদিন পর্যন্ত মনে থাকবে সেদিনকার ময়দানে উপস্থিত শ্রোতাদর্শকের। পঞ্চাশোর্ধ্ব রকারদের মধ্যে এমন হিম্মৎ এমন তাকৎ দুনিয়ায় বিরল। হাজিরানে-ময়দান কেউ চোখ তুলে তাকানোরও জোর পায় নাই, এমন স্তব্ধ মেস্মেরাইজ্ করে রেখেছিলেন সবাইকে। কেউ শব্দটাও করছিল না যেন, করতে পারলে তো করত, কন্সার্টে যেয়ে কেউ রবীন্দ্রানুরাগী কৃত্রিম সমুজদারের গাম্ভীর্য ধরবেও না বস্তুত, ফলে মেস্মেরাইজেশনটা আদতে জেন্যুয়িনই ছিল; ওয়ান-মোর বলা তো দূর-কি-বাত, দিওয়ানা জিকিরের একটা শারীরিক দোলা ছাড়া হাজিরানে-কন্সার্ট ফোকের ভিতর ছিল না বাড়তি কোনো চাঞ্চল্য; স্বয়ং সংগীতের অধিষ্ঠান হয়েছিল যেন সেদিন জেমসের উপরে। এমন অভিজ্ঞতা ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস্ ছাড়া আর-কে দিতে পারত এই দেশে, এই দুনিয়ায়, আমাদের জীবদ্দশায়? স্টেজে যতক্ষণ ছিলেন জেমস্, অডিয়েন্স-সংযোগ ঘটাবার জন্য দুই-তিনটার বেশি বাক্যালাপও করেছেন কি করেন নাই এত সমাহিত সৌম্য সংগীতগম্ভীর, মনে পড়ছিল শেরপাদের মুখ। শুধু শেরপারাই নিঃসঙ্গ হয়েও সুন্দর, সবল, স্ব-অবলম্বী। কিংবা আবহমান অলমাইটি।

শিখরে শেরপাদেরেই মানায়, শীর্ষে শেরপাদেরেই শুধু অশ্লীল লাগে না। মানুষের সঙ্গকামনা স্বাভাবিক। মানুষের নিঃসঙ্গতা ন্যাচারাল নয়। নিঃসঙ্গ মানুষ অদ্ভুতভাবে ভঙ্গুর, নাজুক, অসহায়। নিঃসঙ্গতা শেরপাদেরেই মানায়। সেদিনের কন্সার্টে এবং এর আগেও ২০১৭ ফেব্রুয়ারির একটা কন্সার্টে সিলেটেরই শাহি ঈদগা মাঠে জেমসের লীলা দেখে শেরপা ছাড়া আর-কোনো মনুষ্যাবয়বের সঙ্গে এই হিম্মতি শীর্ষসমাহিতির তুলনা পাই নাই। কিংবা তারই গাওয়া গানে, জেমসেরই ভীষণদিনের দুর্ধর্ষ একটা গানে, এমন কিছু লাইন পাই : “ঈশ্বরের মতো / ভবঘুরে স্বপ্নগুলো / রাতের অরণ্যে / ভোজসভায় / উৎসবে মাতে / একা আমি একলা রাতে / শত শতাব্দী ধরে” … সেই সিলেটকন্সার্টে, লাগোয়া দুই-দুইটা কন্সার্টে, এমনই নিশ্চুপ চরাচরে জেমসের ঈশ্বরভবঘুরে রেন্ডিশন দেখেছে হাজার-তিরিশেক সমবেত জনতা। পাহাড়ের পিকদেশে শেরপার সুর আচ্ছাদিত করে রেখেছিল অচিনপুর। ওনলি দি শেরপাস্ ক্যান্ স্ট্যান্ড অ্যালোন অন্ টপ অফ দি সলিট্যারি মাউন্টেন।

লেখা : সুবিনয় ইসলাম

… …

গানপার

COMMENTS

error: