দিনের কী অসুখটসুখ করলো নাকি! এমন গুমড়ামুখী হয়ে আছে কেন! মেঘ তুমি বরং দুঃখ জেনে নাও আর পাতা ভরতি নারিকেল গাছ চন্দ্রাস্তকাল। এই যে আমি দোকান থেকে কোথাও বের হতে পারছি না। আটকে পড়ছি যেন—আমার মন দুর্বল হইয়া যাইতেছে। আমি এইসব পাত্তা না দিয়ে ভ্রু কুঁচকাইতে থাকলাম।
দোকানের সামনে যে কাঠবাদামের গাছটা আছে—যেন দুপুর সেই কাঠবাদামের গাছটা ঘেরা। দাশবাবু ‘জামরুলতলা’ গল্পে লিখেছিলেন—“অবাক হয়ে এক-একবার উঠানটার দিকে তাকিয়ে দেখি হরিচরণের আস্তাবলের দুটো মরকুটে ঘোড়া এসে ঘাস খাচ্ছে।” তাকিয়ে দেখার চোখ—তারপর তার চোখ যেন আমার চোখে। অদূরে দৃশ্যমান ভেড়ার পাল, যারা কোনোদিন ঘাসের ছবি আঁকেনি। আমাদের যাত্রাপথে এসে দাঁড়িয়ে থাকে স্তম্ভিত চিত্রল হরিণ যেভাবে নেমে আসে। ছায়াতে পাখির সিম্ফনি। পথের পাখিরা তবে কীসের আত্মার গন্ধ নিয়ে গ্রীবা বাঁকিয়ে তাকায়ে থাকে!
পেটানো এক আকাশ যেন। বাবা যেদিন মারা গেল, সেদিন যে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম—তার স্মৃতির সাথে মিশিয়ে বুঝতে পারি দখিনপাশে যমের বাড়ি। ঠান্ডা বাতাস এলে ভাবি, কাছাকাছি কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। এর মাঝে একজন মানুষ এল ওষুধ কিনতে। হাতে তার প্রেসক্রিপশন। মানুষটার শরীর জুড়ে শ্যাওলার গন্ধ। কেন জানি মনে হইলো মানুষটা বোধহয় সূর্যের আলোর কাছে বেশিক্ষণ থাকে না। এ-সবের মধ্যেও নিভৃত জীবন বেঁচে আছে।

মানুষটা চলে গেল। চলে যাওয়াই একমাত্র মানুষের বিশ্বস্ত সঙ্গী।
একটা পরাবাস্তব কবিতা লিখতে ইচ্ছে হইলো। হাতে নিলাম ‘অরণ্যে এক কাঠের শতাব্দী’। দুই-এক পৃষ্ঠা উল্টিয়েপাল্টিয়ে দেখলাম। কেন জানি কবিতা পড়তেও মন বসতেছে না। শক্তির কবিতার বইটার কথা মনে হইলো—‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান’। অরণ্য আমাকে টানে। অরণ্যের উপলদ্ধি আমার কবিতায় একটা বিশাল অংশ জুড়ে উপস্থিত। অসংখ্য চলেছে কল্পনা—যে পথ গেছে জঙ্গলে। রসুলপুর থেকে ডানে বনের দিকে ঢুকতে যে রাস্তাটা চলে গেছে বনবিভাগের মূল গেইট ধরে। সেই পথে অনেকটা পথ আছে ইটের সলিং করা। ওইখানে পাতা ঝরে পড়া একটা জায়গার নাম আমি রেখেছি ‘ঝরাকৃতি’। সেখানে সেই ঝরাপাতাদের উপর বসে আমি দুই-একবার নিজের কবিতা পড়েছি। পড়ার পর মস্তকে মৃত মানুষ গান গায়। সে এক অদ্ভুত রকমের সুর। পৃথিবীতে এর আগে এই সুর আমি কখনো শুনি নাই।
সবুজের বর্ণনা থেকে জেনেছি—এই সুর কেবল শুধু সূর্যের বন্দনার জন্যে করা হয়। যিনি দেখতে পান যা এখনো দেখা হয়নি। ঋগ্বেদের মতো প্রাচীন গ্রন্থে কবিকে বলা হয়েছে এমন এক সত্তা যিনি দেবত্ব জ্ঞান ও রহস্য উপলব্ধি করতে সক্ষম। সেখানে কবি এক ঋষিসুলভ জ্ঞানপ্রাপ্ত সত্তা। মহর্ষি কশ্যপের বংশধর আমি। সেইমতে, গোত্র কশ্যপ। পৃথিবী গোল বলে তুমি হয়তো বলতে পারো, গোত্র—এর আবার শুরু বা শেষ কোথায়?
বসন্তকাল চলে গেছে! এখন আর কোকিলের ডাক শুনতে পাচ্ছি না। কোকিল অন্ধকারে কত রকমের হয়? এর উত্তর আমি জীবনভর খুঁজে যাচ্ছি। কিন্তু জীবন আমাকে বলছে—“আমাকে কেন, রাতের ঈশ্বরকে জিজ্ঞেস করো!”

COMMENTS