ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৭ / তোমার চূড়ান্ত স্বরূপ : না মৃত্যু, না ভয় || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর

ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৭ / তোমার চূড়ান্ত স্বরূপ : না মৃত্যু, না ভয় || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর

শেয়ার করুন:

প্রিয় ধরিত্রী মা,
তুমি জন্ম নিয়েছ দূরবর্তী সুপারনোভা ও প্রাচীন নক্ষত্রদের ধূলিকণা থেকে। তোমার এই প্রকাশ কেবলই এক ধারাবাহিকতার অংশ। আর যখন তুমি এই বর্তমান রূপে আর থাকবে না, তখনও তুমি অন্য এক রূপে অব্যাহত থাকবে। তোমার সত্য স্বরূপ হলো বাস্তবতার চূড়ান্ত মাত্রা—যেখানে নেই আগমন, নেই প্রস্থান; নেই জন্ম, নেই মৃত্যু। এটা আমাদেরও প্রকৃত স্বরূপ। যদি আমরা এই সত্যকে স্পর্শ করতে পারি, তবে আমরা এক গভীর শান্তি এবং নিঃশঙ্ক স্বাধীনতার অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারি।

তবু আমাদের সীমিত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমরা এখনও ভাবি, আমাদের শারীরিক অবয়ব ভেঙে গেলে আমাদের কী হবে? যখন আমরা মৃত্যুবরণ করি, তখন আমরা কেবল তোমার কাছেই ফিরে যাই। তুমি অতীতে আমাদের জন্ম দিয়েছ, এবং আমরা জানি, ভবিষ্যতেও তুমি বারবার আমাদের জন্ম দেবে নতুন নতুন রূপে। আমরা জানি, আমাদের সত্যিকার অর্থে কোনও মৃত্যু নেই। প্রতিবার যখন আমরা প্রকাশিত হই, নতুন ও সতেজ রূপে আসি; আর প্রতিবার যখন তোমার বুকে ফিরে আসি, তুমি আমাদের অপরিসীম মমতায় বরণ করো, বুকে জড়িয়ে নাও। আমরা প্রতিজ্ঞা করছি, গভীরভাবে দেখতে শিখব এবং এই সত্যকে অনুভব করতে শিখব যে, আমাদের আয়ুষ্কালই তোমার আয়ুষ্কাল, আর তোমার আয়ুষ্কাল অসীম।

আমরা জানি, চূড়ান্ত সত্য এবং ঐতিহাসিক সত্য—অন্তর্লৌকিক ও প্রকাশমান—একই বাস্তবতার দুটি মাত্রা। আমরা চূড়ান্ত সত্যটিকে স্পর্শ করতে পারি একটি পাতা, একটি ফুল, একটি নুড়িপাথর, একরশ্মি আলো, একটি পাহাড়, একটি নদী, একটি পাখি, কিংবা আমাদের নিজের দেহের মতো ঐতিহাসিক মাত্রাকে স্পর্শ করে। যখন আমরা গভীরভাবে যেকোনও একটিকে স্পর্শ করি, তখনই আমরা সমগ্রকেই স্পর্শ করি। এটাই হলো আন্তঃঅস্তিত্ব।

প্রিয় ধরিত্রী মা,
আমরা অঙ্গীকার করছি, তোমাকে আমাদের নিজের দেহ হিসেবে দেখব, আর সূর্যকে দেখব আমাদের হৃদয় হিসেবে। আমরা নিজেদের এমনভাবে প্রশিক্ষিত করব, যেন আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে তোমার উপস্থিতি ও সূর্যের স্পন্দনকে চিনে নিতে পারি। আমরা মা ধরিত্রী ও পিতা সূর্য উভয়কে খুঁজে নেব প্রতিটি কোমল পাতায়, প্রতিটি বজ্রের ঝলকে, প্রতিটি জলের বিন্দুতে। চূড়ান্ত সত্যকে দেখতে এবং আমাদের প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করতে আমরা নিষ্ঠাভরে অনুশীলন করব। আমরা অনুশীলন করব এই সত্য দেখার জন্য যে, আমাদের কখনও জন্ম হয়নি, আর আমাদের কখনও মৃত্যু হবে না।

আমরা জানি, চূড়ান্ত মাত্রায় কোনও জন্ম নেই, কোনও মৃত্যু নেই; নেই অস্তিত্ব, নেই অনস্তিত্ব; নেই দুঃখ, নেই সুখ; নেই ভালো, নেই মন্দ। সেই পরম সত্যের জগতে সব দ্বন্দ্ব মিশে গেছে এক গভীর সমতার শান্তিতে। আমরা নিজেদের এমনভাবে প্রশিক্ষিত করব, যাতে আন্তঃঅস্তিত্বের প্রজ্ঞা নিয়ে এই চিহ্ন ও প্রকাশের জগৎকে গভীরভাবে দেখতে পারি। তখন আমরা বুঝতে পারব—যদি মৃত্যু না থাকত, জন্মও সম্ভব হতো না; যদি দুঃখ না থাকত, সুখও অর্থহীন হয়ে যেত; যেমন কাদা ছাড়া পদ্ম ফোটে না। আমরা জানি, সুখ ও দুঃখ, জন্ম ও মৃত্যু পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল, একে অপর ছাড়া অসম্পূর্ণ। এই বিপরীতার্থক যুগলগুলো কেবল ধারণা, কেবলই মনের নির্মাণ। যখন আমরা এই দ্বৈত ধারণার সীমা অতিক্রম করি, যখন আমরা বাস্তবতাকে অবিভক্তভাবে দেখি, তখনই আমরা সব ভয় ও উদ্বেগ থেকে মুক্ত হই।

চূড়ান্ত সত্যকে স্পর্শ করলে আমাদের অন্তর প্রশান্তি ও আনন্দে ভরে ওঠে—সমস্ত ধারণা ও কল্পনা থেকে মুক্ত হয়ে আমরা আমাদের নিজস্ব স্বাভাবিকতায় ফিরে যাই। তখন আমরা হয়ে উঠি আকাশে ভেসে থাকা পাখির মতো স্বাধীন, বনে দৌড়ে চলা হরিণের মতো মুক্ত। সচেতন উপস্থিতির গভীরে বাস করতে করতে আমরা স্পর্শ করি আমাদের পারস্পরিক নির্ভরতা ও আন্তঃঅস্তিত্বের প্রকৃত স্বরূপকে। আমরা জানি, আমরা তোমার সঙ্গে এবং সমগ্র মহাবিশ্বের সঙ্গেও একাত্ম। চূড়ান্ত বাস্তবতা সব ধারণা ও কল্পনার ঊর্ধ্বে। তাকে ব্যক্তিগত বা অব্যক্তিগত, বস্তুগত বা আত্মিক, মানসিক বা বাহ্যিক হিসেবে বর্ণনা করা যায় না। চূড়ান্ত সত্য নিজেই নিজের মধ্যে অনন্ত দীপ্তিতে উদ্ভাসিত। আমাদের সেই চূড়ান্ত সত্যকে খুঁজতে বাইরে যেতে হয় না। আমরা এখানেই, এই মুহূর্তেই, চূড়ান্ত সত্যকে স্পর্শ করতে পারি।


তিক নাত হান অনুবাদ
জয়দেব কর রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you