নব্বইয়ের কবিদের মধ্যে আলফ্রেড খোকনের কবিতার জগৎ সম্পর্কে পাঠকের অনুভূতি দু-কথায় গুছিয়ে বলা কঠিন। পাঠসহজ হলেও এই কবির ভাষা-আঙ্গিকের ওপর আলোকপাত পাঠককে জটিল অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করায়। অলঙ্কার ও অতিরঞ্জন বর্জিত খোকনের অতি সাধারণ কবিতা পাঠকের মনোজগতে সংবেদী অনুভবের ছোট-ছোট যেসব তরঙ্গ পাঠায় তাকে ব্যাখ্যার মোড়কে পরিবেশনার ইচ্ছা কেন যেন তীব্র হয়ে ওঠে না। তাঁর কবিতা ‘চিত্ররূপময়’ — এহেন পাঠকীয় বিবৃতি রাবীন্দ্রিক ধাঁচে জীবনানন্দের কবিতাকে ‘চিত্ররূপময়’ শিরোনামে দাগানোর মতো কানে খট করে বাজে। জগতে সকল কবি নিজ মাপ অনুসারে অনুভূতিপ্রবণ, সংবেদনশীল এবং চিত্ররূপময় বটে। সকল কবিতাই তাদের অভ্যন্তরে বিরাজিত মাত্রাভেদ ও রকমফের মেনে ছন্দ-অলঙ্কার আর অতিরঞ্জনের সমাবেশে নিজের স্বাতন্ত্র্য জাহির করে। কোনো কবি হয়তো প্রতীক-সংকেত ও হেঁয়ালিভরা ভাষাকে আশ্রয় করে কঠিনভাবে লেখেন! অনেকে আবার সহজ অঙ্গে প্রতীক-সংকেত ও হেঁয়ালিকে ভাষা দিতে পছন্দ করেন। কঠিন করে লিখলে সেটি ব্যর্থ কবিতা হয়ে যাবে আর সহজ লিখলে সফল…এমনধারা বিবেচনা কবিতা ও সাহিত্যে খাটে না। ভাষাঅঙ্গের দিক থেকে অনুপ্রবেশ অগম্য কবিতার অভাব জগতে নেই; যদিও একবার সেখানে প্রবেশ নিয়ে নিতে পারলে পাঠক রসের সন্ধান ঠিক পেয়ে যায়। অন্যদিকে নিছক সহজ ভাষায় বোনা কবিতা তাকে ঘোল খাইয়ে ছাড়তে পারে। যারপরনাই কবিতার রস ও সফলতা বিচারে সহজ বা কঠিন অঙ্গে বোনা ভাষিক বিবরণকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত নয়। পাঠকের হৃদয়-মস্তিষ্কে একটি কবিতা অনুভবসংবেদী আবেদন বহাতে পারল কি না সে-বিষয়টি তার সার্থকতা নির্ধারণের চাবিকাঠি করা প্রয়োজন।

এই বিবেচনায় আলফ্রেড খোকনের সহজ অঙ্গে বোনা কবিতা কঠিন ছাদে বাঁধাই কবিতা থেকে কোনো অংশে কম কূটাভাসপূর্ণ নয়। তাঁকে পড়তে সহজ কিন্তু তাঁর কবিতার প্রতি পরতে লুকিয়ে-থাকা অনুভবের সূতা নিমিষে ঠাহর যাওয়া দুঃসাধ্য বটে! নিজের কবিতা সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে কবি লিখেছেন :—
আমি খুব সাধারণ কবিতা লিখি
. এ ধরনের কবিতায়
. শব্দের ওপর শব্দ উঠে খেলা করতে পারে না
. যেমন মানুষের ওপর মানুষ উঠছে।
আমি খুব সাধারণ কবিতা লিখি
. এ ধরনের কবিতায়
. একটিও গাছের পাতা নড়ে না,
. ওরা সবাই ঝাঁকি মেরে
. গাছগুলোকে পাতাশূন্য করে দিচ্ছে
। ঝাঁকচিত্রের দায় এড়াতে এড়াতে
(বাংলা কবিতা যায়; সাধারণ কবিতা)
পড়তে সহজ কিন্তু ভাষার অন্তরালে পোরা ইশারা খেয়াল না করলে এই কবিতাপাঠ পণ্ডশ্রমের নামান্তর। সহজ ভাষায় কবিতা বয়নের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে খোকন কিন্তু সেইসব কবিতাকে খারিজ করে দিচ্ছেন যেখানে অনুভূতির তন্তুগুলো শব্দের কসরত করতে যেয়ে খেইতাল হারায়। জানিয়ে দিতে ভুল করছেন না, তাঁর কবিতার আপাত সহজ বায়ুপ্রবাহে গাছের পাতা নাড়া খায় না কিন্তু এক-ঝাপটায় তাকে ন্যাড়া করে দিতে জানে। পরের স্তবকে স্বভাবসুলভ কুশলতায় খণ্ডদৃশ্য ফেঁদে ঠিক কোন ঘরানার কবিতা তাঁকে টানে সেটি খোলাসা করছেন :—
তখন সকাল,
বারান্দায় বসে চায়ে ভিজিয়ে টোস্ট খাচ্ছি
. এরপর কঠিন কবিতার গায়
. একবার গুলতি মেরে দেখব
. আগামীকাল কীভাবে নুইয়ে পড়ছে
. দৈনিক অধীনস্থতায়।
(সাধারণ কবিতা)
‘দৈনিক অধীনস্থতা’ চায়ে টোস্ট ডুবিয়ে খাওয়ার মতো সহজ ঘটনা হলেও সহজ ভাষায় এর ভাবার্থ ফুটিয়ে তোলা কঠিন বুঝেই লোকে সম্ভবত গুলতি মেরে ফাটাতে হয় এমন ভাষায় লেখে! খোকনের ইশারাঘন তির্যক পঙক্তিপাঠ অগত্যা কবি আল মাহমুদের ‘কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার’-কে স্মৃতিতে জাগিয়ে তোলে। সকল কবিতাই দৈনন্দিন জীবনের অধীন এবং তাকে মোক্ষম মুহূর্তে শিকার করা কবির সফলতা। সফলতার এহেন কারুকাজে খোকন মামুলি ও গতানুগতিক ভাষাকে বেছে নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হননি। ভাষা নয় বরং ভাষার অঙ্গে প্রবাহিত দৈনন্দিন জীবনের অনুষঙ্গকে দৃশ্যমান করে তোলার কঠিন কাজটিকে তিনি আরাধ্য করে নিয়েছেন। ক্ষেতের আল থেকে রাজপথ ধরে গমনের ক্ষণে প্রাত্যহিক দৃশ্যগুলোকে কবি শোষণ করেন। কুড়ানো শিউলি ফুল দিয়ে যে-বালিকা প্রতিদিন সহজে মালা গাঁথে তার মতো করে কবিতার অঙ্গে খোকন দিনানুদৈনিক শব্দের সমাবেশ ঘটান। বালিকার হাতের কাজ একঘেয়ে মনে হলেও এর মধ্যে নিহিত অধ্যবসায় ও ছন্দকুশলতাকে যে-ব্যক্তি অনুভব করতে জানে তার কাছে ফুলবালিকা সাক্ষাৎ শিল্পী বলে গণ্য হতে বাধ্য। একঘেয়ে জীবনের ছন্দে তাল দিয়ে একাগ্র চিত্তে প্রতিদিন যে-কবিতা সে সীবন করে যায় তার মূল্য কথায় আঁটানো মুশকিল! জীবনের সকল সুর এইসব সহজতার মধ্যে লুকিয়ে থাকে! পাবলো নেরুদার নোবেলভাষণ এই সহজতাকে কবিতার মৌল সুর বলে চিহ্নিত করেছিল।

আলফ্রেড খোকনের কবিতাভাষ্য তাই কল্পনাপ্রতিভার জোয়ার বইয়ে শব্দের অর্থস্তর পালটে দেওয়ার খায়েশে উতলা হয় না। ছন্দ, অলঙ্কার, ব্যাজস্তুতি কিংবা অতিশোয়ক্তির সাহায্যে কবিতাকে হেঁয়ালিভরা ভাষার স্মারকে পরিণত করার বাসনা তাঁকে অস্থির করে না। ওইসব খণ্ডদৃশ্য চেতনায় ধারণের জন্য তিনি অপেক্ষায় থাকেন যাদের সমাবেশ কবিতায় কূটাভাস তৈরি করতে জানে আর পাঠকমনে নতুন অর্থস্তরের দ্যোতনা বহে :—
সব সম্পর্কই ছাদের উপরে কর্তব্যরত ওই তরুণীর মতো
খুব সকাল-সকাল ক্লিপ দিয়ে বেঁধে দিচ্ছে রোদ, সম্ভবত
রাতের কোলাহল শেষে শিশুর চাদর, ঘাম, মায়ের স্তনে
লেগে থাকা পিতার ঠোঁটের লালা নিকোটিনের কটু ঘ্রাণে
এই সম্পর্ক তৈরি হয় ভেঙে যায় আবার সম্পর্ক শুরু হয়,
এইভাবে ধূমপান করি তুমি তার পাশে বসো প্রবল ঘৃণায়
এইভাবে তোমার সঙ্গে আমার এই সম্পর্ক এই এই কাজ
এইভাবে রোদের সম্পর্কের ভিতর হঠাৎ মেঘের আওয়াজ
অথবা একটি স্নিগ্ধ দিন কীভাবে কীভাবে যেন প্রতীক্ষায়;
মেঘমল্লার বুকে নীরবতা থেকে দূরে যায় দূরে চলে যায়
প্রেমে ও প্রতাপে জিহ্বার লালায় চুমু খাই, আগলে রাখি;
বাজাও তো বাজে ওড়াও তো ওড়ে পোড়ালে পুড়তে থাকি
দারুণ দোকানগুলি সন্ধ্যায় যথারীতি ভয়ে ভয়ে খোলে —
যন্ত্রণা বেশি হলে বিপ্লবীও বসে যায় কোনার টেবিলে!
(সব সম্পর্কই)
আলফ্রেড খোকনের আপাত সহজ ভাষার প্রতি অঙ্গে জড়ানো কূটাভাস হচ্ছে তাঁর স্বকীয়তা! এটি তাঁকে বাংলা কবিতা ও নব্বইয়ের ধারায় সমভাবে সংযুক্ত রাখে। মাইক্রো অর্থাৎ অণুবিশ্বে বিরাজিত ঘটনার সমাবেশ থেকে ম্যাক্রো বা বৃহৎ ঘটনার তাৎপর্য অন্বেষণ নব্বই দশকের কবিতার স্বাভাবিক লক্ষণ, তবে এর জন্য আত্মমগ্ন অনুভবে নিজেকে দীক্ষিত করার কাজটি সহজ নয়। অণু থেকে বৃহৎ ও বৃহৎ থেকে অণুবিশ্বে গমনের যজ্ঞে আপাত তুচ্ছ সামগ্রীকে অনুভবের রসে চুবিয়ে উপযুক্ত চারিত্র্য প্রদানে অনেক কবিকে হিমশিম খেতে হয়েছে। নব্বইয়ের কবিতা খণ্ডকাহিনি ফাঁদার ছলে কবির অনুভবকে ভাষা দিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেছে, যেটি হয়তো অনুভবকে দৃশ্যে রূপ দান এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ নিষ্কাশনে পাঠককে উৎসাহী করে। কাজটি সমাধা করতে গিয়ে অনেক কবি দেশকালের সীমানায় প্রচলিত শব্দের বিকল্প তালাশে নিজেকে নিঃস্ব করেছেন। অনেকে আবার অনুভূতিআশ্রিত ঘটনাকে কবিতার আধারবীজ করে নিলেও ভাষা নিরীক্ষার প্রচণ্ড চাপে ঘটনার কায়া সেখান থেকে লোপ পেয়েছে। এইসব অস্পষ্ট ও গোলমেলে প্রবণতার মাঝে আলফ্রেড খোকন অনুভবের সাদামাটা কিন্তু সংবেদি বয়নে বিশ্বস্ত থাকায় তাঁর কবিতায় ভাষা কখনো চাপ তৈরি করেনি। দ্বিরাভাসপ্রবণ কবি পাঠকের মনে আবেশ ঠিক জাগিয়ে রাখেন :—
আমরা সবাই সুন্দরের পূজারী
. অসুন্দর এক যোনির পাশে জাগি।
(সুন্দরের সর্বশেষ ধারণা)
…
পর্দা সরে গেলে কবাটের ছায়াগুলি
. দেহের অমেয় গলিতে নাচে।
(ফালগুনের ঘটনাবলি)
…
এই হচ্ছে পদ্মার পাড়ে জ্যোৎস্নাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
তৃতীয়জন জানতে চাইল — ‘এর মধ্যে ভাঙন কোথায়,
কোথায়ই-বা পদ্মার পাড়?’
আমি শুধু টের পাই, নিঃশব্দতা একটা বিরল ব্যাপার।
(একটি বিরল ব্যাপার)
…
উন্নত সম্পর্কের মধ্যে ভুলে যাবার বেদনা থাকে। যে-কোনো
যাওয়ার মানে পরিবর্তন। পরিবর্তনে ব্যথা ও ব্যান্ডেজ জড়িত;
(আবশ্যক)
রুশ কথাশিল্পী আন্তন চেখভ বিশ্বাস করতেন হেন ঘটনা বা সামগ্রী নেই যা দিয়ে গল্প বোনা যায় না। নব্বইয়ে এই বিশ্বাস চল পেয়েছিল কিন্তু এর সফল নির্মাণ কতটা ঘটেছে তার অনুসন্ধান হয়তো প্রাজ্ঞ কবি ও পাঠকরা করবেন। আলফ্রেড খোকনের নামটি সংগত কারণে সেখানে প্রাসঙ্গিক হবে সেদিন। অণুঘটনার নেপথ্যে বিরাজিত অনুষঙ্গরা কবির মনোবীজে কীভাবে নতুন বাস্তবতার বীজতলা তৈয়ার করে তার অসংখ্য উদাহরণ এই কবির কবিতা থেকে তুলে আনা যায় :—
ভোর ছিল সাধারণ
দরজায় টোকা দিয়ে চলে গেছে সে,
একথাও মনে করা যাবে না এখন।
এমনকি তোমার জন্য
বুকের বাইরে বসেনি রঙের নীল দোকান,
আমি যখন এসব কথা লিখছিলাম
. ইতিহাসের শাদা পৃষ্ঠায়
তখন একটা চুল উড়ে আসলো লেখার খাতায়;
যেমন লিখি ফড়িঙের ওড়া
লোকে বলে ‘আর কোনো বিষয় পেল না।’
লিখছিলাম একজোড়া হাত নিয়ে
তারা বলল, ‘মানুষ কোথায়!’
তো এইভাবে লিখতে লিখতে
খাতার ওপর একটা চুল
এইভাবে লিখতে লিখতে
এড়িয়ে যাওয়া গোপনেষু ভুল —
লেখাটি মুদ্রিত হলো গত শুক্রবার,
চুলটি বাদ দিলেন দৈনিকের গাঢ় সম্পাদক।
(গত শুক্রবারের ঘটনা)
প্রতিদিনের জীবনের অঙ্গ চুলকে উপলক্ষ করে যে-বয়ান এখানে জন্ম নিলো সেটি হচ্ছে কবিতা; — এক অন্তরালগামী ভাষাশরীর, যার আড়ালে বাস্তবিক অনুষঙ্গরা নীরবে ঘুম যায়। আলফ্রেড খোকন প্রীতিকর এ-কারণে যে প্রাত্যহিক ভাষার শরীরে কবিতার জন্য প্রয়োজনীয় অন্তরালগামী পরাভাষা তিনি সফলভাবে নির্মাণ করে নিতে পেরেছেন।
নব্বইয়ের কবি, নব্বইয়ের কবিতা
আহমদ মিনহাজ রচনারাশি
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026
- অপূর্ণ জীবনের নান্দনিক সহমর্মিতা || আয়াজ আহমদ বাঙালি - August 30, 2026
- মন হইলো…মানুষ মূলত… || রোদ্দুর রিফাত - August 30, 2026

COMMENTS