ঠাকুরবন্দনা || অসীম চক্রবর্তী

ঠাকুরবন্দনা || অসীম চক্রবর্তী

বাইশে শ্রাবণ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণদিবস। সে-রাতে নাকি পূর্ণিমা ছিল। শ্রাবণী পূর্ণিমা। আসন্ধ্যা চাঁদের আলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছিল গোটা বঙ্গে। আর শেষরাতে? হ্যাঁ, শেষরাতে ছিল উজাড়-করা ঝুমবৃষ্টি। ছিল ক্রন্দন। ছিল রবিঠাকুরের মহাজগতিক যাত্রার আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন। ভৈরবী রাগে বিদায়ের খেয়াল শেষেই যেন বেজে উঠল মেঘমালহার আর রবিঠাকুর খোলা হাওয়া পালে লাগিয়ে পাড়ি ধরলেন মহাসিন্ধুর ওপারে।

আর-দশটা বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো রবীন্দ্রনাথ আমাদের পরিবারেরই একটা অংশ। বাড়িতে দুর্গাপুজো হোক আর স্বরস্বতী পুজো, দোল কি অধিবাস — ঠাকুরের গান থাকবেই। আর কেনই-বা থাকবে না? দেখুন, আমরা ঠাকুরদেবতার গান করি কিন্তু ইনি একমাত্র ঠাকুর যিনি আমাদের জন্য গান লিখেছেন, কবিতা লিখেছেন, নাটক লিখেছেন, লিখেছেন ছড়া প্রবন্ধ কত কী!

যা-ই হোক, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সাথে আমার পরিচয় হয় খুবই ছোটবেলা। সবে ঠাকুরদাদার সাথে স্কুলে যাওয়া-আসা করি। বলাই বাহুল্য আমার ঠাকুরদাদা ছিলেন আমার স্কুলের হেডমাস্টার মশাই। সেই স্কুলেই রবীন্দ্রনাথের সাথে প্রথম পরিচয় ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের তালে, যা আমাদের জাতীয় সংগীতও বটে। ক্লাস শুরুর আগে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন শেষে জাতীয় সংগীত এবং সবশেষে শপথ পাঠ করে লাইন ধরে পঙ্গপালের মতো শ্রেণিকক্ষে ঢুকতাম আমরা। ছোটবেলা বাড়িতে গানের চর্চা থাকার কারণে স্কুলে জাতীয় সংগীতের কোরাসে লিড দিতে ডাক পড়ত আমার। সেই থেকেই জাতীয় সংগীত ঢুকে গিয়েছিল অস্থি-মজ্জায়। আজো ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইতে গিয়ে বুকের ভেতরে দলা পাকিয়ে ওঠে। কী শোভা, কী মায়া! আর এভাবেই রবীন্দ্রনাথ হয়ে গেলেন জীবনের অচ্ছেদ্য অংশ।

তারপরে ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে’, ‘আমরা সবাই রাজা’, ‘আলো আমার আলো ওগো’, ‘তাতা থৈ থৈ’ অথবা পৌষের গান। এভাবেই ঠাকুরের উস্কানিমূলক প্রবেশ ঘটল জীবনে। চেরাপুঞ্জির ঠিক ওপারে অর্থাৎ সীমান্তের ঠিক ওপারে কেটেছে আমার জীবনের বড় একটা সময় । বড় বড় ফোঁটায় ঝুম বৃষ্টি ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সারি সারি দুধশাদা মেঘ সবুজের আদরে লেপ্টে থাকত মেঘালয়ের পাহাড়ের গায়ে গায়ে। যেন আদরের একটু চ্যুতি হলেই অভিমানে ঝরে পড়বে মাটির ধরায়। ঠিক কবিগুরুর ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে’ কবিতার একেবারে জীবন্ত অনুবাদ। সেই শাদা মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ত আমাদের প্রাগৈতিহাসিক উঠোনে বারিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি হয়ে।

‘যৌবনে প্রেম যেই-না এল’ … হ্যাঁ, প্রত্যেকটি বাঙালির মতো আমাদের প্রথম কলেজজীবনে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একমাত্র অবলম্বন। দুজনে দেখা হলো গানটি ছিল আমার ভীষণ প্রিয়, এছাড়াও প্রেম আর পূজা পর্যায়ের প্রতিটা গানই ওই সময়ে শুনলে মনে হতো বুকের ভেতরটা একেবারেই খালি হয়ে যাচ্ছে। এমন করে বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে উস্কানিমূলক প্রেমের গান আর পৃথিবীর কেউই লিখে যেতে পারেনি।

অনেকেই বলেন পূজা আর প্রেম সম্পূর্ণ আলাদা পর্যায়। আমি বলি তুমি যাকে পূজা পর্যায় বলো গুরু, আমি তাতেই শুনি আমার অন্য প্রেমের অদম্য গল্পগাথা। প্রেম অপ্রেম বিরহ অভিসারে যে-মানুষ প্রতিটা বাঙালি প্রাণে শান্তির বারি ছড়িয়ে দেন তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ। যৌবনে প্রেমের পাশাপাশি আসে বিদ্রোহ। আসে সম-অধিকার আদায় আর সমাজবদলের অঙ্গীকার। সেখানেও বাঁধ ভেঙে দেওয়ার সাহস যোগান রবীন্দ্রনাথ। মায়ের ডাকে এক হওয়ার তাগিদ দেন তিনি। কতবার কোরাসে গেয়েছি ‘সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরই অপমান’।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে দু-লাইন লেখার বা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। তবুও চেষ্টা করেছি। কারণ কবিগুরু তো আমাদের একান্নতবর্তী বাঙালি পরিবারেরই একজন। যিনি শেখান কীভাবে আত্মসমর্পণ করতে হয়, কীভাবে ফলবান গাছের মতো শেকড়ের পানে ঝুঁকে থাকতে হয়, তিনি বলে যান ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে’ …

অবশেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানের তালেই বলি —

আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে
তাই হেরি তায় সকলখানে॥
আছে সে নয়নতারায়
আলোকধারায়, তাই না হারায় —
ওগো তাই দেখি তায়
যেথায় সেথায়
তাকাই আমি যে-দিকপানে॥

… …

অসীম চক্রবর্তী

COMMENTS