ছবির গল্প ১ : চিলমারী বন্দর || আনম্য ফারহান

ছবির গল্প ১ : চিলমারী বন্দর || আনম্য ফারহান

এইরকম ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটে ছবি আমি তুলি না। কিন্তু এই টাইপের ছবিগুলার এস্থেটিকস ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটেই এস্টাবলিশড। প্রফেশনাল ছবি, বিক্রির জন্য প্রদর্শিত ছবি, এবং ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ, মৃণাল ইত্যাদি মারফত নদীমাতৃকতার এমনই একটা ভিজ্যুয়াল টেকনিক দাঁড়াইছে যে, আমিও ওই চক্করে পইড়াই এইটা সাদাকালো তুলছিলাম।

যদিও আমার উদ্দেশ্য ছিল শান্ত নদীটির ওই দিগন্তে বাঁধা সীমানা এবং এইদিকের দুইটি নৌকার (নৌকা আসলে তিনটা, ভিজিবিলিটির প্রেফারেন্স পায় হইল দুইটা, তাই দুইটাই বলতেছি) একইরকম শান্ত নিশ্চল জিনিসটার জেরক্স কপি করা। তা করতে করতেই দেখি লাফাইয়া দাপাইয়া জিনিসটার ওই স্থবির কিন্তু পরিস্থিতি-সমাগত-টাইপ অবস্থাটার বারোটা বাজাইতেছেন এনারা দুইজন মিইলা। একজন পানির ভিতরে। একজন পড়তেছেন। আর দাঁড়াইয়া থাকা লোকটা আমার প্রথম চিন্তার কম্পোজিশনের সাথে বিরোধপূর্ণ না। ওনার একটা স্থবিরতার পরিমিতি থাকা সত্ত্বেও একটু ডায়নামিকসও ছিল। নৌকাগুলা আর ওই একটুখানি কোণা বাইর হইয়া থাকা আরেকটা স্ট্রাকচার মিইলা এই ডায়নামিকস।

কয়েকটা শট নিছিলাম। যেহেতু ইনারা দ্রুতই সইরা যাবেন না বুঝতেছিলাম। আমি বুড়িমারী স্থলবন্দরে যাব, দুপুরের ভাত খাব, হলদিরামের সোনপাপড়ি কিনব, পরে আবার কাজকামের শিডিউলও মিলাইতে হবে। আসছিলামও রংপুর থেইকা কাজকাম কইরাই। তো, ইনাদের লাফালাফিকে যে নিব, সেইটা ঠিক কইরা ফেলতে হইছিল। শুধুই তাড়া থাকার জন্যই যে, তা না। বলতেছি।

পরে দেখি যে, কোনো একটা শটে এই মোমেন্টামটা পাইছিলাম জন্যই ছবিটা হইছিল। ঝাঁপানোর এই ভঙ্গিটা ইউজুয়ালি আমরা দেখি না। বা দেখি, লক্ষ করি না। দেবে যাওয়ার একটা ফিয়ারলেস ঘটনা আছে এইখানে। জলের গভীরে ঝাঁপ দেওয়ার কতগুলা তরিকা আছে, আপনারা তো জানেনই। কিন্তু উনার ওইরকম কিছুই নাই। নদীপাড়ের মানুষ বইলাই যে এইটা ঘটছে, তা না। সেইরকমও তো দেখছি আমি অনেকজায়গায়।

ছবিটা তোলা হইয়া যাওয়ার পর, মোটামুটি ৪০/৪৫ মিনিট ওইখানে অবস্থান করার পর, আমি দেখলাম যে ছবিটা তোলারও আগের স্মৃতি, পূর্ব-কম্পোজিশনটা ভাবার ছবি, বা মানুষগুলারে বাদ দিয়া যা ধারণা করছিলাম এবং মনে মনে সাজাইছিলাম — তার চাইতে এই যে যতটুকু পাইলাম; সেইটা হইতেছে ওই পর্বগুলার সমষ্টির চূড়ান্ত দশা। সিনেমার ফ্রেমের পর ফ্রেম পর পর আসতে আসতে যেভাবে গতি পায় এবং ইলেক্ট্রনের ঘূর্ণনের মতো ক্লাইম্যাক্সে আইসা যেভাবে স্থিতির দিকে যায় — সেরকম। সেরের উপরে সোয়া সের হইছিল।

এখন ভাবতে বইসা বা মনে করতে বইসা দেখি যে, আমার বিশ্রী মাথাব্যথাটা ছিল ওইদিন সকালে। আর কুড়িগ্রামে তখন ঠাণ্ডা। এগারোটা-নাগাদও-সূর্য-ওঠে-না-মতো কুয়াশায় মোড়া শীত আসবে আসবে এরকম টাইম। ছবিটা তুলছিলাম দুপুরের দিকে। লিকার চা কয়েকদফা খাইয়াও মাথাব্যথা যায় নাই। নদীর পাড়ে এইগুলা দেইখা খুব যে ভালো লাগতেছিল, তা না। সিগারেটও লাগতেছিল যেন হুগনা চেলি বিস্কুট। মানে জঘন্য। যা-ই হোক, ছবি দেইখা একটু খুশি লাগছিল।

ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট বা মনোক্রোম নিয়া যেইটা বলতেছিলাম, প্রযুক্তির ব্যবহারই কোনোকিছুকে ঠিক জায়গায় পৌঁছায়ে দেয় না। বলা যায়, ঠিক জিনিসকে ঠিক জায়গায় আসার সুযোগ কইরা দেয়। সিরিয়াস কাজ একটা জিনিস আর সিরিয়াস কাজের ভঙ্গি আরেক জিনিস। মোটা ফ্রেমের চশমা পরা মানেই কোনো-একটা আইডিয়ালিস্ট ক্যারেকটার; তা আপাত হইতে পারে কিন্তু তা যে না, তা ঠিক রাখতে পারলেই হইল। আমি এই একই কম্পোজিশন কালারে তুলতে পারলেও সেইম খুশি হইতাম। কিন্তু মনোক্রোম যেই আলাদা একটা ভঙ্গি আনয়ন করল ছবিটায়, সেইটা এড়ায়ে ছবিটা দেখতে বলব আমি। যদিও তা দুষ্কর এই মুহূর্তে।

এরই ঠিক পাঁচ মাস পর শুরু হবে কোভিড লকডাউন। কোভিডের ঢেউ শুরু হবে তিন চার মাস পর থেকে। তার আগে এইটাই ছিল শেষবার ওইদিকে যাওয়া। আজকে ছবিটা দেইখা মনে পড়ল, এরপর আমি রংপুর হইয়া দিনাজপুর পঞ্চগড় করছি, গাইবান্ধা করছি, চিলমারী বা বুড়িমারী আর যাই নাই।

ছবি : ২৫/১০/২০১৯ ।। লেখা : ২৫/১০/২০২৩


আনম্য ফারহান রচনারাশি
গানপার এক্সিবিশন ১ : টেরাটোমার্টা
গানপার এক্সিবিশন ২ : মৃস-র জন্য এক্সিবিশন

COMMENTS

error: