লেখায় এডিটিং, কাটিং, টেইলরিং, মাস্টারিং ও আনকাট আনএডিটেড সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

লেখায় এডিটিং, কাটিং, টেইলরিং, মাস্টারিং ও আনকাট আনএডিটেড সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

সন্দীপনের ডায়রি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল নিজে আর লিখতে পারব না কোনোদিন। ২০০৯ ঈসায়ীতে বেরিয়েছিল সন্দীপনের ডায়রি, প্রতিভাস   থেকে, ওই বছরই পড়ে উঠি। ঠিক তাঁর অন্তর্ধানের পরপর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম প্রকাশযন্ত্রস্থ বইটির। সেই থেকেই ছিল পড়ার খায়েশ। ভূমিকায় কিংবা ব্লার্বে বলা হয়েছে এবং পড়েও মনে হয়েছে, এই বইতে জায়গা-পাওয়া ডায়রিগুলো সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের পঁয়তিরিশ বছরের লেখালেখিগিরস্তির একটা ভালো দরোজা হিশেবে কাজ করবে লেখকের অন্দর ও অন্তর্মহলে ঢোকার। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তো অভিজ্ঞতাই রীতিমতো, মনে হয়েছে সবসময় আমার কাছে, এবং শুধু গল্প-উপন্যাস দিয়েই তো নয়, জীবনযাপন ও অত্যানুষঙ্গিক ফোড়ন-খোঁচাখাঁচি দিয়েও। সমস্ত মিলিয়েই তো সন্দীপন। একজনই তো তিনি। বাবু সন্দীপন চট্টো। ডায়রিতেও রয়েছেন তিনি তেমনি আনকাট, আনএডিটেড, আনসেন্সর্ড।

সন্দীপনের ডায়রি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল নিজে আর লিখতে পারব না কোনোদিন। মনে পড়ে, এ-রকম হয়েছে আমার বেলায় এর আগেও। সর্বশেষ হয়েছিল ২০০৬ খ্রিস্টবর্ষের দিকে এবাদুর রহমানের দাস ক্যাপিটাল   পড়তে যেয়ে। সে-যাক, কাটিয়েও উঠেছিলাম ভাগ্যিস! মনে কেন হলো অমন দুম করে যে, লিখতে ফের পারব না কোনোদিন? — মনে হবে না! ভাষা, ভাবনা, বয়ান/ইন্টারপ্রিটেশন ও অনুভূতির এমনতর তীব্রতার সামনে নিজেকে অসহায় না-লাগাই কী অস্বাভাবিক নয়?

ইন্তেকালের পরে, ২০০৫ ডিসেম্বরে সন্দীপনের ইন্তেকালের বেশ কিছুদিন পরে, ‘আনকাট আনএডিটেড’ বিশেষণে বিজ্ঞাপিত করে লেখকের কয়েক বছরের ডায়রি বাজারজাত করা হয়। তখন এই জিনিশটা মাথায় কিক দিয়েছিল যে এই কাটিং, এডিটিং ইত্যাদি তো লেখার পার্ট অফ প্রোসেস। আপনি যাচ্ছেতাই ভাবতে পারবেন হয়তো, বলতে গেলে দেখবেন একটা অটোকাট অটোএডিট প্রোসেস দিয়া আপনি মিহি নিয়ন্ত্রিত। বলার পরে লিখতে গেলে তো উক্ত প্রোসেসটা আরও জোরদার হয়। আর তখন যদি কোনো লেখক খুব সচেতন হয়ে, চেতনায় চার্জড হয়ে, এডিটিং বাদ দিয়া লিখতে চান তাইলে যেইটা হয় সেইটা দেখতে কেমন আমি তা নয়নে হেরি নাই। কাজেই আমার বিবেচনায় আনকাট আনএডিটেড লেখা বাস্তবে লিখতে পারা সম্ভব নয়। দাবি করা সম্ভব, দাবিদাওয়ার তো বল্গা নাই।

সোয়াইন-ফ্লো নামক জুজু অথবা বাস্তবিক বালাইয়ের ভয়ে এই-তো কিছুদিন আগে জগৎ তোলপাড় হয়ে গেল। আরেকটা আছে এমন, ফ্লো, অথচ জগৎ খুব বেশি খোঁজ রাখে না এর। পাত্তাই দেয় না কোনো মিডিয়া এই ফ্লোটিকে। দেয় না বলেই বাঁচোয়া। লিখন-ফ্লো এর নাম। লিখন-ফ্লো আসে নির্জনে, জগতের অগোচরে। প্রথমটা ব্যামো-ব্যাধি হলে, দ্বিতীয়টা আশীর্বাদ — ভুবনাশীর্বাদ। নাকি ঈশ্বরাশীর্বাদ? ভুবন আর ঈশ্বর দুইজনা মারামারি করে মরুক গে ভুবনেশ্বরে যেয়ে। সেই তর্কে না-যাই, বরং সন্দীপনরচনা সম্পর্কে ২টা/১টা আপত্তি যা আমি জানি লিখে ফেলি এইখানে। হ্যাঁ, বেশকিছু আপত্তি উত্থাপনের অপেক্ষায় মৎ-মসীতে, সন্দীপনপ্রবণতা বিষয়ে। সেই আপত্তিগুলো সময় বের করে এবার লিখে ফেলতে হবে। যেমন লিখে ফেলতে চাইছি, দীর্ঘদিন ধরে কেবল চাইছিই, রিল্কে-র চিঠি বিষয়ে বেশ খানিকটা আপত্তির কথা। বলছিলাম বিখ্যাত ওই চিঠিগুলোর ব্যাপারে, যেগুলো লিখেছিলেন জনৈক তরুণ কবিকে অ্যাড্রেস করে, এবং যে-চিঠিগুলো প্রেরণা যোগায় আজও দুনিয়ার তরুণতর কবিদেরে।

এখন কথা হলো, সন্দীপনের সঙ্গে কোথায় কিংবা কোথায় কোথায় আমার দ্বি/ভিনমত, মনে থাকতে থাকতে লিখে ফেলা দরকার। কিন্তু জনাব, ঠিক এই মুহূর্তে, যা ভাবছিলাম তা-ই অবশেষে, ঢেউটিনের চালা মাতিয়ে এসেছে বৃষ্টির বলাকা ঝাঁক বেঁধে এই ঘনযামিনীতে। বৃষ্টিবলাকার কিচিরমিচিরে কান ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে সুখে। বৃষ্টি আসা মাত্রই বাতি নেভানো উচিত নয় কি?

বাবু সন্দীপন কি তার ডায়রিতে অকপট? কতটুকু সম্ভব অকপট থাকা ডায়রিতে? একজন লেখক যখন মুদ্রণ/প্রকাশচিন্তা মাথায় না-রেখে দিনপঞ্জি লেখেন, যেমন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ডায়রিগুলোর কথা ভাবা যাক, কতদূর পর্যন্ত অকপট-অনর্গল থাকতে পারেন তারা? আদৌ সম্ভব, অকপট থাকা? আমি কি পারি, অকপট থাকতে, দিনলিপিতে? এ-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই, কিংবা নিশ্চিতও বলতে পারি। নিশ্চিত যে, আমি সবসময় অকপট নই, কপটতা কখনো স্বেচ্ছাকৃত কখনো স্বতঃস্ফূর্ত চলে আসে ডায়রিপৃষ্ঠায়। এক-ধরনের কৌশলও কখনো-কখনো, যার অন্য নাম কপটতা, অবলম্বন করতে হয় বৈকি কোনো ঘটনা বা ব্যক্তিনির্দিষ্ট প্রসঙ্গের উল্লেখকালে। স্রেফ লেখার টানেও কখনো-কখনো অতিশয়োক্তি-অতিরিক্তরঙ-অতিরঞ্জন করে ফেলি। সন্দীপনও মনে হয় এর ব্যতিক্রম নন, অথবা আসলে কেউই নয় এর অন্যথা। কারণ, কলমেরও তো একটা প্রাণ থাকে, পাওয়ার (ইংরিজি হিম্মত ও বাংলা আকাঙ্ক্ষা/অভিলাষ উভয় অর্থে) থাকে, সাধাহ্লাদ থাকে। এছাড়া ডায়রি লেখার/রাখার বেলা আরেকটা ব্যাপার ঘটে যে, একটা কোনো ঘটনা বা কারো সম্পর্কে তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন করা যখন সম্ভব হয় না তখন সাংকেতিকতার আশ্রয় নিতে হয়। এইটা তো কপটতা, সাংকেতিকতা সর্বপ্রকারের, এক-অর্থে। সেহেতু লিখন ব্যাপারটাই কি কপটাচার নয়?

একজন মানুষ নিজের জন্য নিজের খেয়ালখুশি নিজমনে আকাশকুসুম কি পাতালআঁধি ভাবতে পারে, কিন্তু শুধু নিজের জন্য স্রেফ নিজে পড়ার লক্ষ্যে লেখা আনবিলিভেবল। টুকিটাকি দেনাপাওনা যা আমরা পকেটনোট হিশেবে রাখি, তা-ও তো প্রয়োজনে অডিয়েন্সের সামনে প্রমাণ দাখিল করার চিন্তা থেকে মদদপুষ্ট। তাই না? আর যা-কিছু নিজের জন্য নয়, তাতে ফেব্রিকেশন তো হবেই। শিল্পচোখ এক্ষেত্রে আরেক ধর্তব্য। অপরের চোখে আমার কাজ প্রীতিকর ঠেকুক, এ আমরা চাই। তাই এম্ব্রয়ডারি, তাই ফেব্রিকেশন, তাই সাজানোগোছানো। ফলে এটা তালাশ করা খামাখাই যে, একজন লেখকের ডায়রিতে তিনি কতটুকু কপট/অকপট। অনুসন্ধানে নানা ইন্ট্রেস্টিং দিক উঠে আসবে, কিন্তু অকপটতার সুরাহা তাতে হয় কি?

বুঝতে হবে, টেক্সট মাত্রই লীলাময় এবং সহস্রছলা — ফলে তার এত মুখ এত মুখর উচ্ছ্বলতা। আর ডায়রিকার ঘোষণা দেবেন তিনি অকপট আর আমরা পাঠক তখন সন্তুষ্ট হয়ে তার ডায়রি পড়তে শুরু করব, তা-ও তো নয়। একটা লেখাকে লেখা হিশেবেই পাঠ করতে হবে এবং লেখার ভেতরগত পদার্থ খোঁজাখুঁজির ক্ষেত্রটুকু কপটতা থাকলে যেমন না-থাকলেও তেমন, কোনো হেরফের হয় না তাতে লেখাটার।

দেখতে পাই যে, এমনসব ডায়রি ও সেসবের রচনাকারদের আমরা সাধারণত অকপট ঠাওরাই যেগুলোতে ডায়রিকারের নিকটজনদের চরিত্রহরণ ও সমাজের যে-যে ও যা-যা ডায়রিকারের বিরাগভাজন তা-তা নিয়া ধুমায়া গালিগালাজ বিধৃত থাকে। এটা আরেক বিভ্রম। পরে কখনো এ নিয়ে কথা শুরু করা যাবে হয়তো। শুধু এই খটকাটা আমার কখনোই ঘোচে না যে যারে ধুমায়া গাইলাইলাম ডায়রিতে, যে-বন্ধু বা প্রতিবেশীটিরে, যে-অ্যাক্টের জন্য বকলাম, দুইদিন পরে দেখা গেল সব মিটমাট হয়ে গেল এবং ওই বিশেষ দোষের দায়ভার অভিযুক্ত বন্ধুটির মোটেও নয়, তখন? ততক্ষণে সেই বন্ধুটির তো মহাকালে মানহানি সারা। মামলাটা করবে কে? অ্যানিওয়ে। এই কারণেই বলছিলাম, কপটতা ইত্যাদি যেভাবে আমরা ঢালাও বকাবকি/রিডিকিউল করি এবং অন্যদিকে অকপটতা ইত্যাদি যেভাবে হেইল করি, অত সোজা শাদাকালা না ব্যাপারগুলা। সাংকেতিকতা, প্রতীকধর্মিতা, রূপকধর্মিতা প্রভৃতি লিখনকর্মে এমনি-এমনি শখের কারবার নয়। এই জিনিশগুলা লেখার স্বধর্ম। কবি জীবনানন্দ দাশ ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধবইয়ের কোনো লেখায় ‘লেখার স্বধর্ম’ কথাটা তার স্বভাবভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেছিলেন ইয়াদ করব।

তবে এটা তো মানবে যে, অকপটতার ছিঁটেফোঁটা কোথাও যদি তালাশিতে হয় তো সেই জায়গাটা ডায়রি। সন্দীপন যদি চরিত্রলক্ষণগত বিচার-বিবেচনায় মহাকপটও হয়ে থাকেন, বলছি না যে তিনি তা ছিলেন, তাঁর রেখে-যাওয়া ডায়রিতে অকপটতা থাকবেই। শিল্পকর্মে কপটতা কারুকৌশল হলেও হতে পারে, কিন্তু বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথায় কিংবা ডায়রিতে এই জিনিশটা আমাদের কাম্য না। ডায়রি ছাড়া আর কোথায় খুঁজবে তুমি ওই সোনার পাথরঘটি অকপটতা ব্যাপারটি?

দ্রষ্টব্য  / ‘সন্দীপনের ডায়রি, লিখন ও সোয়াইন ফ্লো, ইত্যাকার নানাবিধানুষঙ্গ ও আমি’ শিরোনামে এই নিবন্ধটি ২০১৩ জুলাইতে ফেসবুকে লেখা হয়েছিল। অধুনালুপ্ত নোট-অপশনের লেখাগুলো ফেসবুক প্রতিদিন মেমোরিতে ফেরায়া দ্যায় এবং ঘষেমেজে লেখাগুলা কালেক্ট করা যায়। এই নিবন্ধটি লিখনকালে দুনিয়ায় ‘সোয়াইন’ নামে একটা ব্যামো/ফ্লু এসেছিল, স্মরণ করে দেখুন, পরে ইবোলা ভাইরাস ইত্যাদি পারায়া আজ কোভিড-নাইন্টিন করোনা ভাইরাসে ‘শ্রেষ্ঠ জন্তু’ গরবে মাটিতে পা না-ফেলা মানুষের নাকানিচুবানি দশা।


লেখা / জাহেদ আহমদ

COMMENTS

error: