হিমুর হুমায়ূন (পর্ব ৩)

হিমুর হুমায়ূন (পর্ব ৩)

আগুনের পরশমণি ও দুটি গানের কথকতা

আমি আউলাঝাউলা স্বভাবের। ডানা ঝাপটাই এখানে-ওখানে। কোথাও থিতু হই না। আমার পরিবার থেকে শুরু করে আশেপাশের বন্ধু সবাই আমার ছন্নছাড়া বোহেমিয়ান জীবনের সাথে অভ্যস্ত। একদিন হুমায়ূনস্যার আবারও একটি ছোট চিরকুট লিখে সেলিমের বাসায় পাঠিয়ে দেন। আমাকে তার বাসায় যাওয়ার কথা বলেন। চিরকুট পেয়ে কয়েকদিন পরে স্যারের বাসায় যাই। স্যার তখন আমাকে বলেন, তুহিন তুমি একসপ্তাহ দাড়ি-মোচ শেভ না করে আমার কাছে আসবে। কিছু না জানতে চেয়েই আমি রাজি হয়ে গেলাম। নানা প্রশ্নের উদ্রেক হলেও স্যারের কাছে এর কারণ জানতে চাইনি।  তবে এর আগে আরেকটি কথা বলে নেই। সিলেট অঞ্চলের জনপ্রিয় গান ‘আইজ পাশা খেলব রে শ্যাম’ অনেক স্থানেই গেয়েছি আমি আর সেলিম চৌধুরী। স্যারও আমাদের কণ্ঠে গানটি শোনেন। সংগীতাঙ্গনের অনেকেই বিষয়টি স্বীকার না করলেও বিষয়টি জানেন। পরে এ গানটি গেয়ে অন্য এক শিল্পী ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছেন আগে ক্যাসেট বাজারজাত করে। স্যারের নির্দেশে দাড়ি-মোচ রেখে কয়েকদিন পরে তার সামনে হাজির হই। স্যার তখন বইমেলায় ‘কোথাও কেই নেই’ স্টলে বসা ছিলেন। বললাম, স্যার দাড়ি-মোচ রেখেছি, এখন কী করব? আমাকে এই বেশে দেখে স্যার বললেন ঠিকাছে বাসায় চলো। বাসায় এসে স্যার তার সরকারি অনুদানের ছবি আগুনের পরশমণিতে আমাকে মনে রেখে একটি চরিত্র রেখেছেন বলে জানান। ছবির চরিত্রটি স্যার ব্যাখ্যা করে বলেন, তোমাকে ভেবে এই চরিত্র রেখেছি। তুমি যুদ্ধক্লান্ত মুক্তিযোদ্ধাদের গান শুনিয়ে স্মৃতিকাতর ও উজ্জীবিত করবে। মা ও মাটির জন্য তারা বুকে শক্তি পাবে তোমার গান শুনে। মনটা চাঙ্গা হবে। ভারাক্রান্ত মনে শপথ নেবে দেশ শত্রুমুক্ত করতে। স্যার বলেই দিলেন বাউল শাহ আবদুল করিমের ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ ও আমাদের চারুকলার তৎকালীন শিক্ষার্থী আমার এক বন্ধুর লেখা ‘আামি দোজখে যাব’ গানদুইটা ছবিতে রাখা হবে। এ দুটি গানই আমাকে গাইতে হবে। শুনাতে হবে মুক্তিযোদ্ধাদের। ‘আামি দোজখে যাব’  গানটি আড্ডায় বসে বন্ধুবান্ধবরা মিলে তাৎক্ষণিক সুর করেছিলাম। তাঁর মনে ধরায় ছবিতে এ গানটিও পছন্দ করেন। এ দুটি গানের কথা বিবেচনা করে ছবিতে আমার প্রাথমিক চরিত্রটি ঠিক করেন। আমার জন্য আরো কঠিন বিষয় ছিল গানদুটি আমার নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করা হবে। ছবির অভিনয়ের এই সুযোগ, সাথে নিজের কণ্ঠে গান এসবকিছু স্বয়ং স্যারের মুখ থেকে শুনে  আমি থ বনে যাই। আমি আড্ডায় ও ঘরোয়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে টুংটাং সুরে গান গাই। মঞ্চে দলের সাথে কাজ করি। কিন্তু সিনেমায় অভিনয়ের কথা কখনো চিন্তা করিনি। তবে স্যারের সঙ্গে পরিচয়ের পর ফোকগানের প্রতি তার দরদ ও দুর্বলতা লক্ষ করেছি। বাউলগান আমি গাই বলে এটা আমার ভাল লাগত। স্যারের সঙ্গে আড্ডায় বসলেই তিনি সিলেট অঞ্চলের বাউলদের গান শুনতে চাইতেন। মরমি বাউল ও সাধকদের প্রতি দুর্বলতার কারণেই তিনি তার ‘রূপালি দ্বীপ’ বইটি হাসন রাজার নামে উৎসর্গ করেন। শাহ আবদুল করিমকেও একটি বই উৎসর্গ করেছিলেন স্যার। স্যার স্বশিক্ষিত মরমী সাধকদের গানের দর্শনের কথা চিন্তা করে এ প্রসঙ্গে প্রায়ই একটি কথা বলতেন, আল্লাহ যাকে গুণ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান তা মানুষের কাছে প্রকাশের দায়িত্ব দিয়েই পাঠান। হাসন রাজা ও আবদুল করিমের গান তার নাটক সিনেমায় ব্যবহার করে তাদের গান জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখলেও তিনি কখনো তাদের নিয়ে ধৃষ্টতা দেখাননি। এই সাধকদের প্রতি তার অন্তরের অসম্ভব শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। স্যার এই শ্রদ্ধাবোধ, ভালবাসা দেশ ও মাটির প্রতি পরম টানের কারণেই বারবার তাদের গানগুলো নাটক সিনেমায় পরিবেশন করে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রেখে গেছেন।

স্যারের আগ্রহের কারণেই আমি ‘আগুনের পরশমণি’ ছবিতে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ি। এফডিসিতেও বিভিন্ন স্থানে এ ছবির প্রসেসিঙের সব কাজেই জড়িত ছিলাম নিজের আগ্রহে। ছবির সহকারী পরিচালক আমার বন্ধু মিনহাজ এ ব্যাপারে অনেক সহযোগিতা করেছ। এমনকি তাঁর নির্ধারিত চরিত্রে অভিনয় ছাড়াও ছবির আনুষঙ্গিক অনেক কাজেই জড়িয়ে যাই। এর আগে মঞ্চনাটকের দলে কাজ করেছি দীর্ঘদিন। আমি জানি সেখানে কীভাবে সেট বানাতে হয়, লাইট ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে ব্যকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ভিজ্যুয়াল মিডিয়া সেটা আমার কাছে পুরোপুরি অস্পষ্ট একটা ব্যাপার। আমি মূলত ‘আগুনের পরশমণি’ ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি আনঅফিসিয়ালি প্রোডাকশনের অনেক কাজের সাথে জড়িত ছিলাম। এখানেই আমি শিখি ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার কারিগরি দিক। স্যার নিজেও উৎসাহ দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছিলেন কাজ শেখার ক্ষেত্রে। সেট বাঁধা ও দৃশ্যায়ন সহ আনুষঙ্গিক অনেক কাজেই আমি সম্পৃক্ত ছিলাম। ছবিতে যে দুটি গান রাখা নিয়ে আমার চরিত্র ঠিক করা হয় তা নিয়ে একসময় সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করতে বসেন স্যার। এ নিয়ে সালেহ চৌধুরীর সঙ্গেও কথা বলেন স্যার। গান দুটি দৃশ্যায়নের আগে স্যার আমাদেরকে বললেন ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানটি স্মৃতিকাতর ও অতীতদুঃখ জাগানিয়া, এককথায় নস্টালজিক। আগের বহুবর্ণিল ও ভালোবাসায় টইটুম্বুর দিনগুলোর কথায় মোড়ানো। কিন্তু ছবিতে এ গান মুক্তিযোদ্ধারা যখন গাইবে, আবার তারা যুদ্ধ করবে দেশ স্বাধীন করে একটি সুন্দর আগামীর জন্য – এটা কেমন জানি গল্পে দ্বন্দ্ব তৈরি করে। তাছাড়া এ গানের একটি অন্তরাও রাজনৈতিক বক্তব্য বহন করছিল। স্যার এ বিষয়টি সালেহ চৌধুরীর সঙ্গে পরামর্শ করেন। সালেহ চৌধুরী করিমের দুটি লাইনের দুটি শব্দ সংশোধন করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে স্যারের পছন্দও হয়েছিল। পরে শাহ আবদুল করিমের গানে হাত দেওয়ার সাহস দেখানো উচিত নয় মনে করে এ গানটিও বাদ দেওয়া হয়। ‘আমি দোজখে যাব’গানটির জন্য মৌলবাদীরা হুমকির কারণ হতে পারে। তাই গানদুটি দৃশ্যায়নের পরে যদি সেন্সরবোর্ডের কারণে ফেলে দিতে হয় তাহলে তো অনেক আর্থিক ক্ষতি হয়ে যাবে। অনুদানের ছবির খরচ হিসেব করে করতে হবে। তখন তো ৩৫ মিমিতে কাজ হতো। এটা অনেক ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। অনুদানের ছবিতে বাজেট কম থাকে। তাই এ ধরনের ঝুঁকি নেয়া যাবে না। তিনি আমাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে, কৌশলে সেন্সরবোর্ডকে এফডিসিতে ছবির দৃশ্যায়ন দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানান। সেন্সরবোর্ডের সবাই স্যারকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর রুচি ও সূক্ষ্ম ছবি পরিচালনার বিষয়েও তারা অবগত ছিলেন। আমন্ত্রণ পেয়ে তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ এফডিসিতেই চলে আসেন। এর আগে আমার ওই চরিত্রের অভিনয় নিয়ে স্যার সেন্সরবোর্ডকে চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু গান বাদ দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত তিনি কথা ও চিঠিতে জানতে দেননি। তাই কৌশলে স্যার এই গানটি গাওয়ার জন্য আমাকে বলেন। গান শোনার পর সেন্সরবোর্ড এ গানদুটি রাখা নিয়ে ভোটাভুটি করে। ৪/১ ভোটে গান দুটি বাদের সিদ্ধান্ত হয়। ফলে আমার অভিনয় করার মতো চরিত্র এই ছবিতে আর রইল না। কিন্তু স্যার আমাকে হয়তো খুব ভালোবাসতেন বলেই ফের আমার জন্য ছবিতে একটি যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার চরিত্র দাঁড় করিয়ে দেন, যেখানে আমি গেরিলা অপারেশনের পর ধরা পড়ে যাই। অন্য সঙ্গীদের অবস্থান জানার জন্য পাকআর্মি আমাকে নির্যাতন করে আঙুল কেটে ফেলে। এই ছবিতে আরো দু-একটি দৃশ্য আমার ছিল যেগুলো স্যার ছবিনির্মাণের সময় সংযোজন করেছিলেন। কিন্তু প্রথম দফায় অভিনয় শেষ হলে আমি ফের সুনামগঞ্জে চলে যেতাম। স্যারের সঙ্গে যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটত; ঢাকার সঙ্গে ছেদ পড়ত। ফোন না থাকায় তখন যোগাযোগ করাটাও কঠিন ছিল। এ সময় স্যার সেলিমের বাসায় আমার বিষয়ে যোগাযোগ করেও পাননি। ফলে সেই দৃশ্যগুলো আর ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ‘আগুনের পরশমণি’ বাজারে আসার পর বন্ধুবান্ধবরা আমাকে মধুমিতা সিনেমা হলে নিয়ে যায়। ছবিতে পর্দায় আমার আঙুলকাটার দৃশ্য দেখে একটি মেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। আমি এই ছবির একজন অভিনেতা হিসেবে ছবি দেখতে এসেছি টিকেটবিক্রেতারা জানত। তাই তারা ওই মেয়ের স্বজনকে নিয়ে আমার কাছে ছুটে আসেন। তারা মেয়েটিকে অভয় দিতে বলেন আমার হাত কাটা হয়নি, এটা অভিনয়। আমি মেয়েটিকে হাত দেখিয়ে বলি আমার আঙুল ঠিক আছে; আমিও ঠিক আছি। এটা ছবির পর্দায় অভিনয়। হাত দেখার পর মেয়েটি স্বাভাবিক হয়। হুমায়ূনস্যার তার ছবির মাধ্যমে বাঙালি মধ্যবিত্তকে সপরিবার হলমুখী করতে পেরেছিলেন। ওই মেয়ে ও তার মা-বাবা সহ সপরিবারেই ছবি দেখতে এসেছিল, যেটা এখন আর দেখা যায় না।

এ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে আমার মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতি মনে পড়েছিল। যুদ্ধকালীন সময়ে আমি ছিলাম ১ম শ্রেণির ছাত্র। আব্বা ছিলেন সুনামগঞ্জ সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসচিব ও সংসদ-সদস্য। আমাদেরকে এ কারণে পালিয়ে থাকতে হয়েছে। দ-একবার আমরা মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরে এসেছি। আমার শিশুমন তখন দেখেছে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব। অসহায় নরনারীর আর্তচিৎকার আর পাক হায়েনাদের বর্বরতা। এমন একটি ছবিতে এক মুক্তিযোদ্ধা-অন্তপ্রাণ হুমায়ূনস্যারের কল্যাণে মুক্তিযোদ্ধা চরিত্রে সুযোগ পাওয়াটা ছিল আমার জন্য গর্বের একটি বিষয়। মুক্তিযোদ্ধার এই চরিত্রে তাই আমি মন থেকেই সায় পেয়ে অভিনয়টা করতে পেরেছিলাম। স্যারও অভয় দিয়ে, সহযোগিতা করে আমার কাছ থেকে অভিনয়টা আদায় করে নিয়েছিলেন। বাঙালি জাতির দুঃসময়ে স্যারের ‘বহুব্রীহি’  নাটকে ‘তুই রাজাকার’ সংলাপের মাধ্যমে আমরা তরুণরা উজ্জীবিত হয়েছিলাম। এবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তারুণ্য রাজপথে বারুদ হয়ে ফেটে পড়ার সময়গুলোতে স্যারকে খুব মনে পড়ছিল।

এর একযুগেরও বেশি পরে ‘চ্যানেল আই ক্ষুদে গানরাজ’ অনুষ্ঠানে বিচারক ছিলেন হুমায়ূনস্যার ও শাওন। তখন এক ক্ষুদে গানরাজ শাহ আবদুল করিমের ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানটি গেয়েছিল। গান শেষে স্যার এই ক্ষুদে শিল্পী ও উপস্থিতজনদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, তোমরা জানো এ গানটি মিডিয়ার সামনে কে গেয়েছিল প্রথমে? তাদের নিরুত্তরে স্যার বলেছিলেন, তোমাদের সিলেট অঞ্চলেরই ছেলে তুহিন এই গানটি প্রথম গেয়ে আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তাঁর কণ্ঠে একজন বাউলের এই সরল বর্ণনা মাটিগন্ধা ঐতিহ্য-আশ্রয়ী সুরের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম আমি।

এভাবে স্যারের ভালোবাসা আমাকে বারবার ঋণী করেছে। আমি গোপনে টের পেতাম স্যারের ভালোবাসা। সেইসব সুখস্মৃতি এখন চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে।

(চলবে)

হিমুর হুমায়ূন ( পর্ব ১ )
হিমুর হুমায়ূন ( পর্ব ২ )

গানপার

COMMENTS

error: