গল্পটা জাহাজডুবির, গল্প অস্কারযামিনীর

গল্পটা জাহাজডুবির, গল্প অস্কারযামিনীর

ডুবেছিল ১৯১২ সনে। ভেসে উঠেছে এর ঠিক পঁচাশি বছর বাদে। এই গল্প ডোবার পরে ভেসে ওঠার, এই কিচ্ছা সাগরের তলদেশে প্রেমকল্পনার, সোজা বাংলায় পানিপির খোয়াজ খিজিরের কৃপায় লাভেমূলে পয়মন্ত হবার। আরো সোজাসাপ্টা বলতে বললে, এই কিসসা নাইন্টিন-নাইন্টিএইটের এক রজনীর। সে-বছর, সেই রাত্রি, ছিল অস্কারপূর্ণিমার। সত্তরতম অস্কারনাইটে সেবার টাইটানিক এক নয় দুই নয় জিতে নিয়েছিল দশ-যোগ-এক এগারো অস্কার! গল্পটা আরেকবার ইয়াদ করা যাক।

লস্যাঞ্জালিসের শ্রায়িন মিলনায়তনে বসেছে সেবারকার আসর। মিলনায়তন-উপচানো দুনিয়ার নানা প্রান্তের পর্দাজাগতিক মেহমান-মুসাফির। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক বিলি ক্রিস্টাল, এর আগে একটানা পাঁচ-পাঁচটা অস্কার আসর সঞ্চালনার অভিজ্ঞতা যার ঝুলিতে, “শুভ সন্ধ্যা! টাইটানিকে আপনাদের স্বাগতম!” উপস্থাপক শুরুতেই যে-বাক্যটি বললেন, হুবহু উপস্থাপকের উক্তিটাই উদ্ধৃত হলো, সহজে মেহসুস হয় রাত গড়াবে টাইটানিকেরই ডেকে। সেই রাতটা বানডাকা পূর্ণিমা হবে, অ্যাওয়ার্ডের পূর্ণিমা, ক্যামেরনের জিগরি ইয়ারও বোধহয় এতটা ভাবে নাই। কিন্তু হয়েছিল অবিকল তা-ই। ঠিক তার আগের বছরের বানানো দুনিয়াজোড়া ছায়াছবিগুলো থেকে বেছে নেয়া হয়েছিল টাইটানিককেই।

বিভিন্ন ক্যাটাগোরিতে সেইবার টাইটানিক পেয়েছে এগারোটা অ্যাওয়ার্ড। শ্রেষ্ঠতার এগারোটি তিলক। পুরস্কার বিতরণের অনুষ্ঠানটি ছিল পৌনে-চারঘণ্টার। বলতে গেলে অ্যাওয়ার্ড-গিভিং স্টেজের সিংহভাগটাই কব্জায় রেখেছিল টাইটানিক। জেমস ক্যামেরন ও তার জাহাজগল্প প্রকল্পের কলাকারুকুশলীরা বাজিমাৎ করেছিলেন। যদিও ১৯১২ সনের কাপ্তান ডুবেছিলেন অনবোর্ড প্যাসেঞ্জারদেরই লগে, এই ডোবানোই কিচ্ছায় ফেটিয়ে দেখানো হয়েছে এবং আমরা তারিফি দৃষ্টিতে দেখেছিও, এইবারকার কাপ্তান ক্যামেরন পুরা জাহাজ অতলান্তিক থেকে উঠিয়ে এনে অন্তরীক্ষে উড়িয়েছেন যেন। অস্কার রিসিভ করতে এসে সেই ফুর্তি, নিজের শ্রেষ্ঠতার গরব, চাপিয়া যাবার চেষ্টাও করেন নাই : “আই অ্যাম দ্য কিং অফ দ্য ওয়ার্ল্ড”, বলেছেন টাইটানিকনির্মাতা।

বাদশা তো বটেই। তিন পয়সার পালা নয় এগারোটা অ্যাওয়ার্ড পাওয়া। আগে এর জুড়ি উদাহরণ সত্তর বছরের অস্কারহিস্ট্রিতে একটাই, একবারই মাত্র হয়েছিল এমনটা, নাইন্টিন-ফিফটিনাইনে, সেইবারও ‘বেনহার’ এগারো অস্কার বগলদাবা করেছিল। তো, চোদ্দটা বিভাগে টাইটানিক মনোনয়ন পেয়েছিল। জুটেছে তিনটা কম। কম নয়, এগারোটা! ছায়াছবিবোদ্ধারা ভেবেছিলেন টাইটানিক এইবারও ডুববেই নির্ঘাৎ। যুক্তি ছিল যে, বেজায় জনপ্রিয় ছবিগুলো সচরাচর মনোনয়ন পাইলেও চূড়ান্ত জয় পায় না। টাইটানিকের ক্ষেত্রে এইটা খাটে নাই। তাছাড়া তা-বড় পরিচালকেরাও অস্কার না-পেয়ে বিদায় নিয়েছেন, আলফ্রেড হিচকক যেমন, আর স্টিভেন স্পিলবার্গকেও অপেক্ষা করতে হয়েছিল বহু বহু বছর, শিন্ডলার্স লিস্ট পর্যন্ত, যদিও শিন্ডলার্স লিস্ট স্পিলবার্গের বলতে গেলে আগের নির্মাণগুলোর তুলনায় সাধারণই বলতে হবে। এইসব খামখেয়ালি নিয়েই অস্কার চলছিল এবং চলছে। সেই হিসাবে টাইটানিকের পুরস্কারপ্রাপ্তি কিছুটা বিস্ময়করই ছিল বলতে হবে।

এগারো ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠতাগুলোর মধ্যে ছিল শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ পরিচালনা, শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্র্যাফি, শ্রেষ্ঠ শিল্পনির্দেশনা, শ্রেষ্ঠ সম্পাদনা, শ্রেষ্ঠ পোশাকপরিকল্পনা, শ্রেষ্ঠ মৌলিক সুরারোপ, শ্রেষ্ঠ গান, শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রহণ, শ্রেষ্ঠ সাউন্ডইফেক্টস্, শ্রেষ্ঠ ভিশ্যুয়্যালইফেক্টস্। প্রায় সবকিছুতেই সাক্সেস দেখাতে পারলেও অভিনয় ক্যাটাগোরি দিয়া টাইটানিক পুরস্কার বাগাতে ব্যর্থ হয়েছিল। অবাক করেছিল এই বিষয়টাও। ‘অ্যাজ্ গ্যুড অ্যাজ্ ইট গেটস্’ ম্যুভি দিয়ে সেবারকার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার অস্কার হাতে নিয়েছিলেন জ্যাক নিকলসন। এই সিনেমায় জ্যাক নিকলসন মানববিদ্বেষী, সমাজবিরোধী, খ্যাপাটে এক লেখকের চরিত্রে অভিনয় করেছেনও দুর্দান্ত। এই নিয়া জ্যাকের থার্ড অস্কার অ্যাচিভ করা। আর তারই বিপরীতে একই সিনেমায় হোটেলপরিচারিকার চরিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হয়েছিলেন সেইবার হেলেন হান্ট। ‘গ্যুড উইল হান্টিং’ দিয়ে সেরা পার্শ্ব-অভিনয়শিল্পীর পুরস্কার অবশেষে পেয়েছেন রবিন উইলিয়ামস। এর আগে রবিন তিন-তিনবার নমিনেশন পেয়েছিলেন। অভিনেত্রী পার্শ্বচরিত্রের পুরস্কার পেয়েছিলেন কিম ব্যাসিঙ্গার, ছবিটি ছিল ‘এল্ অ্যা কনফিডেনশিয়্যাল’।

শুধু লিয়োনার্ডো ডিক্যাপ্রিয়ো অথবা কেইট উইন্সলেট সেইবারকার অস্কার পান নাই বলিয়া আলোচকরা খামোশ হন নাই, গ্লোরিয়া স্টুয়ার্ট বহুদিন বাদে তার সাতাশি বছর বয়সে টাইটানিকে অভিনয় করে একটা পুরস্কার পাবেন সবাই ধরে নিলেও ঘটনাটা ঘটে নাই। বৃদ্ধ রোজ্ তথা টাইটানিকের নিমজ্জন থেকে বেঁচে-যাওয়া যাত্রীটির ভূমিকায় তিনি অভিনয়ও করেছেন মনে রাখবার মতো। ভুলবে না দুনিয়া।

আরও অন্তত একডজন ক্যাটাগোরিতে দেয়া হয়েছে অ্যাওয়ার্ড। তবে সেসব ছবির বেশিরভাগই দেখা হয় নাই নিবন্ধকারের। শুধু মৌলিক চিত্রনাট্যের জন্যে বেন্ অ্যাফ্লেক আর ম্যাট ড্যামন্ যুগ্মভাবে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠতার, এই তথ্যটাও যোগ করে রাখা যায়। স্ক্রিপ্টটা আর কিসের হবে, ‘গ্যুড উইল হান্টিং’ ছাড়া?

… …

গানপার

COMMENTS

error: