ম্যান্ডেলাগানের ছেলেবেলা

ম্যান্ডেলাগানের ছেলেবেলা

কালো কালো মানুষের মাঝে
ওই কালো মাটিতে
রক্তের স্রোতে শামিল
নেলসন ম্যান্ডেলা তুমি
অমর কবিতার অন্ত্যমিল

শুভ হোক তোমার জন্মদিন
শুভ হোক তোমার জন্মদিন…

টেলিভিশন খুলত প্রতিদিন বিকাল সাড়ে-চারটায়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হতো পর্দা ভরে, আমরা আগ্রহ ধরে চেয়ে থাকতাম চক্ষু গোল ও একাগ্র করে, এই তো শুরু হবে আমার বাংলাদেশের মাটি   গানটির হাওয়াই গিটার। তারপর হবে কোরান থেকে তেলাওয়াত, গীতা-আবৃত্তি ও ত্রিপিটক পাঠ পরপর। অনুষ্ঠানসূচি জানিয়ে দেয়া হবে এরপর। রাত বারোটা পর্যন্ত অনুষ্ঠানের সূচি। ঘোষক হিশেবে দুইজন খুব মনপসন্দ ছিলেন আমাদের : মাসুদ কায়সার ও শামীমা আক্তার/ইয়াসমিন বেবী। আমার সমবয়সী বুড়োরা স্মরণ করতে পারবেন, এই দুইজনের মধ্যে একটা মানবিক সম্পর্ক গড়ে উঠুক ও সুস্থায়ী হোক — তখনকার শিশুকিশোররা আমরা খুব চাইতাম। যদিও আমাদের ইচ্ছা পূরণ হয়নি শেষ অব্দি। কিংবা আমরাও আমাদের অজান্তেই বড় হয়ে উঠেছি, খেয়াল রাখিনি এরপর, ফলো-আপ করিনি কার সঙ্গে কার জোড়া মিলল আর কারই-বা মেলে নাই। বিটিভির অনুষ্ঠানমালার সঙ্গে সঙ্গে একদিন-দুইদিন করে বেড়ে উঠতে থাকি আমরা। আর বড়বেলার ঘটনাবলি ও কারিক্রম তো সকলেরই জানা। কে কোন মাচার শসা বা চালকুমড়ো হয়েছি, কোন ঝাড়ের বাঁশ হয়েছি কে, সমস্তই তো চোখের সামনে এখন।

অত কথায় কে কান দেবে! যা বলতে বসেছি তা-ই বলি। কিন্তু কী যেন বলতে বসেছিলাম? বলতে তো কিছুই বসিনি কন্যে! কিংবা যা বলতে বসেছিলাম, ভুলে বসে আছি। বলতে যা বসেছি তাতে সারবস্তু বিশেষ নাই। নির্বক্তব্য বকবকানি জীবনভর। তবু বলি গানের কথা, গানের সুর, অবিরল লিরিক। শুনতাম গান, খাইতাম মারের উপর মার, ক্লাসখাতা গানের ডিমে ভরে ফেলার কারণে। এত প্রহৃত হয়েছি জীবনে, স্রেফ টিভি দেখার গুরুতর অপরাধে, বলে শেষ করা যাবে না।

ছায়াছন্দ   মাসে একবার, ছিল অনুরোধের আসর   যেমন রেডিও বাংলাদেশে, টেলিভিশনে তেমনি ছায়াছন্দ   ছাড়াও রোজ থাকত সন্ধে সাড়ে-সাতটার মালঞ্চ   অথবা রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলগীতির আসর। পল্লীগীতির অনুষ্ঠান, হীরামন নাটকের গান, প্রতিমাসে একখানা বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবির গান তো হতোই, যার শ্রেষ্ঠাংশে থাকতেন আমাদের ছেলেবেলার স্বপ্ননায়ক-স্বপ্ননায়িকারা। আর ছিল রাগসংগীতের সুরলহরী । শেষোক্ত অনুষ্ঠানের রেগ্যুলার লিসেনার ছিলাম না যদিও, তবু কখনো কখনো গায়িকা বা গায়কের চেহারাছবি মনে ধরে গেলে দেখতাম সুন্দর ওই গায়িকার-গায়কের গলাব্যায়াম। আর ভাইবোন মিলে পরে আক্ষেপ করতাম, এত সুন্দর চেহারার শিল্পী আধুনিক গান গায় না কেন যে! একটা আন্দাজ করতাম আমরা, নিশ্চয় চান্স পায় না বলেই গায় না, অচিরেই চান্স পেয়ে মঞ্চমাত করে দেবে বলেও বাজি ধরতাম ওই মার্গীয় মুখশ্রীর শিল্পীর উপর। সেসব শৈশবের সুর, সেসব শৈশবের মুখ, সেসব শৈশবের জল্পনা-কল্পনা। খাঁটি লিরিক্যাল ব্যালাড। আমি এর প্রিফেস লেখার চেষ্টা করে চলেছি দিবারাত্র উদয়াস্ত।

তখন কয়েকটা গান খুব ঘুরেফিরে শোনা হতো ওই টিভিস্ক্রিনে, এর কোনোটাই কিন্তু ক্যাসেটপ্লেয়ারে বা স্টিরিয়োতে শুনিনি কখনো। উল্লেখযোগ্য কয়েকটার মধ্যে যেমন হু. মু. এরশাদের পথকলিদের নিয়ে একাধিক গান এখনো মনে করতে পারি, গাইতেন এন্ড্রু কিশোরের মতো গায়কেরা, এবং শোনানো ও দেখানোও হতো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রতিদিন খবরপাঠের আগে-পরে, ফলে সেই-যে মুখস্থ হয়েছে আজও ছুটে যায় নাই। কিন্তু গানগুলোর গীতিপঙক্তি ভালোই ছিল বলে এখন মনে হয়। এর বাইরে, এইসব প্রচারণামূলক সামাজিক সহৃদয়তা আকর্ষণের গান ছাড়াও, বেশকিছু গান আছে যেগুলো মনে এক্কেরে গেঁথে গেছে।

যেমন ফিলিস্তিনের মাতৃভূমি হাতছাড়ার বেদনা ও স্বাধিকার ফিরে পাওয়ার আকুতি ও আন্দোলন নিয়ে একটা গান ফিলিস্তিন, আহা ফিলিস্তিন  — সুরটা আজও গুনগুনাতে পারি, কিন্তু কথা আর বিশেষ কিছুই মনে নাই। কিংবা আদ্যোপান্ত কথা ও সুর ও গায়নভঙ্গিমা হুবহু মনে আছে নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মদিন উপজীব্য করে গাওয়া একটা গানের। অসাধারণ জজবা গানটার, যাকে বলে গণসংগীত, ওই শিশুবয়সেই গানটা দোলাতো মনে পড়ে। এবং ওই গান দিয়েই ম্যান্ডেলার সঙ্গে চিনপরিচয় হয় আমাদের। গানটা গাইতেন ফকির আলমগীর, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর পক্ষে। মুখড়া স্ট্যান্জার শেষে এই কথাগুলি ছিল বলে রিকল করা যায় — নেলসন ম্যান্ডেলা তুমি  / অমর কবিতার অন্ত্যমিল

এরপর বড়দের পুছতাছ করে একটা আইডিয়া নেয়ার প্রয়াস পাই, ফাও হিশেবে বড়দের স্বভাবসুলভ ধমকিধামকি তো জুটতোই। কিন্তু ঠারেঠোরে একটা আইডিয়া হয়েই যায় ম্যান্ডেলা সম্পর্কে, এবং ফিলিস্তিনগাথা সম্পর্কেও, এর একটা কারণ গানগুলোর সঙ্গে বেশ ভালো মানের ভিশ্যুয়াল ফুটেজ দেখানো হতো। ফলে আমাদের শিশুচিত্তে সেইসব ঘটনাবলির চলচ্চিত্র অভিক্ষেপ রাখত, কল্পনায় এইসব ছবিচূর্ণের একটা বা একাধিক মন্তাজও ফুটে উঠত।

জানলাম আস্তে আস্তে ম্যান্ডেলার বন্দীজীবন, তাঁর ব্রত ও প্রতিবাদের শিরদাঁড়াটার ব্যাপারে একটু একটু জানলাম, শুরু করলাম কালো গতরের ওই লোকটাকে একটু একটু ভালোবাসতে। ও আচ্ছা, বাজারে তখন বনিএম   আর অ্যাবা   ব্যান্ডের গানবাদ্য অথবা ক্যারেন কার্পেন্টার্  ধুমিয়ে বেজে চলেছে, সেসবও শুনছি, ভালো ও চমৎকার লাগছে, এবং অবিসংবাদিত মাইকেল জ্যাকসনজাস্ট বিট ইট । কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলা   ধারার গানগুলো শুনে মনে হয়, এ হলো জীবনের আরেকটা রঙ, জীবনের সত্যিকারের রঙ, এভারগ্রিন কালার অফ লাইফ। পরে ধীরে ধীরে চিরপ্রিয় হয়ে উঠবেন বব ডিলানবব মার্লে। সেসব গল্প পরের কোনো এপিসোডের জন্য তোলা থাক।

ম্যান্ডেলাকে নয় শুধু, ভালোবেসে ফেলি উইনিকেও। কল্পনায় দেখতে শুরু করি আমাদেরও উইনি কেউ-একজন জীবনে আসবে একদিন, এবং জীবন হয়ে উঠবে অনন্য রঙিন! পরে, অনেক অনেকদিন বাদে, একদিন উইনি সম্পর্কে উল্টাপাল্টা কথা শুনতে পাই। ততদিনে ম্যান্ডেলা ছাড়া পেয়েছেন দীর্ঘ কারান্তরালের লড়াইয়ে জয়ী হয়ে, এসেছে ফ্রিডম কালো আফ্রিকায়, এবং ততদিনে আমরাও উন্নীত হয়েছি থান্ডার ক্যাটস   আর ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট অ্যান্ড দ্য প্ল্যানেটিয়ার্স   থেকে অ্যাডাল্ট ম্যুভিতে। পেল্লায় বড় ও ডাঙ্গর হয়ে উঠেছি আমরা।

তারপরের ইতিহাস সকলের জানা। আজও মনে সন্দেহ রয়ে গিয়েছে একটা ব্যাপারে শুধু। উইনির প্রতি কি ঠিকঠিক জাস্টিস করা হয়েছিল? অপরাধের কী এত শক্তি রয়েছে যে, দুঃখের দিনের সহযাত্রীটিকে সুখবসন্তে এসে একেবারে সাইফন-অফ একেবারে অপাঙক্তেয় করে ফেলা জরুর হয়ে পড়ে? ন্যায়-অন্যায় জানিনে জানিনে, ম্যান্ডেলা, আমরা ঠাকুরের দেশের লোক। শুধু জানি, প্রিয়তমাকে একেবারে অপাঙক্তেয় করে দিতে নেই।

ক্লিনিকের বেডে নিশ্চেতন শুয়ে পঁচানব্বইতম জন্মদিনে এইসব কথা খামাখা ভাববেন না ম্যান্ডেলা, আমরা আপনার কোনো দোষঘাট দেখছি না, আমরা আমাদের ছেলেবেলা নিয়া ভাবছিলাম আপনার ছেলেবেলায় ফিরে যাওয়ার শুভদিনে। সেরে উঠুন, হ্যাং অন, শুভ হোক আপনার মুক্তির দিন…শুভ হোক তোমার জন্মদিন।…শুভ হোক সত্যিকারের মানুষের সত্যিকারের লড়াইসমূহ, শুভ হোক মানুষের মুক্তির আকুতিগুলো…শুভ হোক, সফল হোক, জীবন সকলের। অথবা হই কিছু-একটা মহতের তরে ব্যর্থ সকলে।

লেখা / জাহেদ আহমদ; জুলাই ২০১৩

গানপার

COMMENTS

error: