জয়ধরখালী ১২ || শেখ লুৎফর

জয়ধরখালী ১২ || শেখ লুৎফর

নিঃসন্তান রামু দাসের ছোটখাটো গতরটা একহারা গড়নের। তার কালো আর মোটা মোটা ঠোঁটদুইটা সবসময় সে শক্তভাবে চেপে রাখে। এতে তার লম্বাটে মুখে জেগে ওঠে আচান্নক একটা বিদ্রুপমাখা উপেক্ষা। স্বল্পবাক এই নির্বিরোধী মানুষটা হাঁটার সময় সামনের দিকে একটু ঝুঁকে, একমনে হনহন করে হেঁটে যায়। খাটো করে পরা একটা ময়লা লুঙ্গি, কাঁধে গামছা কিংবা কমদামা কাপড়ের নোংরা ফতুয়া। বড় বড় থ্যাবড়া পা-দুইটা ঘড়ির কাঁটার ভঙ্গিতে লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটছে। বিশেষ দরকার ছাড়া কস্মিনকালেও সে ডানে-বাঁয়ে তাকায় না। চলার সময় সামনে যত বড় মানুষটাই পড়ুক না কেন, রামু দাস আগবাড়িয়ে কথা বলে না। না, কোনো অহঙ্কারে না। (গ্রামের সকলেই জানে, অহঙ্কার করার মতো রামু দাসের কিচ্ছু নাই।) এবং অবশ্যই বিনয়েও না। গ্রামের একেবারে বোকা মানুষটাও জানে, জন্মগত অধিকারের মতো এ-ই তার অভ্যাস। ঝগড়া তো দূরে থাক, জয়ধরখালীর কেউ আঙুল তুলে এমন কথা বলতে পারবে না যে, রামুদাস কারো সাথে কখনো উঁচু গলায় কথা বলেছে। চরম দরিদ্রতা ও খোরাকি-কষ্টের মাঝেও ব্যক্তিত্বের এইসব ভূষণের জন্য রামুদাস দুনিয়াভরা মানুষের মাঝে একা একজন নিঃসঙ্গ আদম।

জয়ধরখালীর আখড়া পেরিয়ে মিনিট দুইয়েক হাঁটলে, সড়কের বামপাশে রামুদাসের জঙ্গলঘেরা ছোট্ট বাড়িটা যেন ব্যথাতুর এতিমের লুকিয়ে-রাখা বিষণ্ণ মুখ। আম-জাম-কাঁঠাল গাছের ফাঁকে ফাঁকে, ঘন সারিবদ্ধ কলাগাছের ভিড়ে, বাড়ির একমাত্র ছোট্ট দোচালাটা তাই সারাবছর লোকচক্ষুর আড়ালে আত্মগোপন করে থাকে। বাড়িতে কোনো বালবাচ্চা নাই। পাড়ার শিশুরা তাই সেদিকটা ভুলেও মাড়ায় না। নাই কোনো বুড়াবুড়ি, সেজন্য বয়োবৃদ্ধরাও উঁকি দেয় না। এই সুবাদে ঘনছায়াঘেরা উঠানটায় বিষণ্ণ, চিন্তাজর্জর, দুক্কি রামু দাসের মুখের মতো সারাবছর আস্তর-আস্তর শ্যাওলা জমে থাকে।

রামুদাসের নির্দিষ্ট কোনো পেশা নাই। শীতকালের শুরুতেই সে গাঙপাড়ের জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বর্ষাকালের জন্য লাকড়ি জোগাড় করে। বাংলা নববর্ষের আগে, ফাল্গুন-চৈত্র এই দুই মাস গ্রামের কেউ কেউ শখ করে ভাগ্য গণনা করায়। সেই সময়টা সে বাড়ি বাড়ি ঘুরে দশ গ্রামের মানুষের হাত দেখে। এছাড়া ইস্কুল-কলেজের পরীক্ষার পর রামুদাসের শ্যাওলাভরা উঠানটাতে মাঝে মাঝে ছাত্ররা এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। রামুদাস কোথায় জানি ছিল, হন্তদন্ত হয়ে এসে বিনয়ের সুরে বলবে, — অ তুমি আইছ?

তার ভরাট কণ্ঠের অনুচ্চ উচ্চারণ শুনেই এই জল-কাদা, ঝাড়-জংলার দেশে রামু দাসকে মহাব্যতিক্রম বলে মনে হয়। তাই ছাত্ররা মনে মনে একটু শ্রদ্ধা নিয়েই বলে, — হ দাদা, আমার পরীক্ষার ফল কেমুন অইব একটু দ্যাইখ্যা দ্যান।

রামু দাস বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পরিষ্কার পথটায় গিয়ে বসবে। হাত-বাড়িয়ে সামনে থেকে একটা কাঠি তুলে নিবে, কোন পরীক্ষা?
— ক্লাস টেনের টেস্ট পরীক্ষা। কিংবা আইএ ক্লাসের ফাইনাল পরীক্ষা।

ছেলেটা এই কথা বলতেই রামু দাস হাতের কাঠি দিয়ে মাটিতে লিখতে শুরু করবে। অঙ্কের প্রথম ধাপ শেষ হলে, রামু দাস জটিল সংখ্যাগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করবে, — মোট কত নাম্বার?
— এক হাজার।
রামু দাসের হাতের কাঠি দ্রুত মাটিতে অঙ্ক কষে চলছে। লিখতে লিখতেই সে আবার বলবে, — একটা ফুলের নাম কও।
দুরুদুরু বুকে ছেলেটা বলবে, গোলাপ কিংবা গন্ধরাজ।
রামু দাস বসে বসেই একটু একটু করে পিছিয়ে যায় আর তার সামনের অঙ্কটা বড় হতে থাকে।
— একটা পাখির নাম কও।
— দইয়ল।
— একটা ঋতুর নাম কও।
— বর্ষা।
রামু দাস মুখ তুলে ছেলেটার দিকে তাকায়। একটু পরেই হাতের কাঠিটা ফেলে দিয়ে বলবে, তুমি সেকেন্ড ডিভিশন পাইবা।

রামুদাস আর দাঁড়ায় না। ছেলেটা পিছে পিছে ছুটেতে ছুটতে হয়তো বলবে, — আগেরবারও আপনি সেকেন্ড ডিভিশন কৈছিলেন, মেট্রিকে আমি সেকেন্ড ডিভিশন পাইছলাম।

খুশিতে গরম-হয়ে-ওঠা হাতের মুঠি থেকে ছেলেটা কয়েকটা সিকি-আধুলি রামু দাসের দিকে এগিয়ে দেয়। ধাতব মুদ্রাগুলোর ঝনঝন শব্দে রামু দাসের বিষণ্ণ বাড়িটা হকচকিয়ে ওঠে।

স্বামী-স্ত্রী দুইজনের মাত্র পেট, তাও রামু দাসের হন্তদন্তের শেষ নাই। জেষ্ঠি-আষাঢ়-শ্রাবণ এই তিনমাস আমা-কাঁঠাল নিয়ে রোজ রোজ বাজারের গলিতে তাকে বসে থাকতে দেখা যায়। আবার সে কলাও বেচে সারাবছর।

রামু দাস বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেই প্রতিবেশী বিজন আসে বিড়ি খাওয়ার জন্য। মুখে ব্রণের দাগে ভরা বিজনের ফ্যাসকা চেহারাটা ঢ্যাঙা হলেও মাথার লম্বা লম্বা চুলগুলো ফিটফাট থাকে সবসময়। গোসল-খাওয়া শেষে দোকান নিয়ে বাজারে রওনা দেওয়ার আগে, তেলতেলা গতরে রামু দাসের উঠানে এসে বিজনের গলাটা রসে উথলে ওঠে, — বউদি কৈ?

কপালে সিঁদুরের লম্বা টান আর ফলফলা পরিষ্কার শাড়িপরা যে নারী ঘর থেকে বেরিয়ে আসবে, তাকে পয়লা নজরে যে কেউ আমকাঠের তক্তা বলে ধরে নেবে। কিন্তু তার লম্বা ছিপছিপা শ্যামলা শরীর আর চিকন ঠোঁটে ঝিলিকধরা হাসি দেখলে আপনি নিজেও তার বয়স বিশের উপর মানবেন না।

বলতে গেলে জন্মের পর থেকে বিজন বাজারে বাজারে দোকান মেলে বসে। আয়না-কাঁকই, স্নো-পাউডার, তেল-সাবান বিকিসিকি করতে করতে বিজনের চোখদুইটা এখন ধূর্ত-জহুরি। লোকে বলে, গত দশবছরে তলে তলে নাকি বিজনের সুদের ব্যবসাটাও অনেক বড় হয়ে গেছে। অবিবাহিত বিজনের তেত্রিশ বছরের মোটা মোটা হাড়ের বেমানান গতরটায় কামনা নামক জন্তুটা অনেকদিন ধরেই রামু দাসের বউয়ের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে জিব চাটছে। আষাঢ় মাসের দিকে যখন বৃষ্টিবাদলা অঝোর ধারায় শুরু হয় তখন গ্রামে রব ওঠে, বিজেনর কাছে ডাকাইতরা নাকি চিঠি দিছে, নগদ দশ হাজার ট্যাহা, নাইলে বিজনের মাথা।

বিজন এখন আর রামু দাসের বাড়িতে দিনে আসে না। রাত একটু ঘন হলে উত্তরের জংলা দিয়ে জাতিসাপের মতো নিঃশব্দে এসে সে রামু দাসের পাশের ছোট্ট আর অন্ধকার কোঠাটাতে ঘুমিয়ে থাকে। এবং এইভাবেই বিজন রামু দাসের বউকে নিয়ে অঘ্রান মাসে পালিয়ে যায়।

এই আচান্নক খবরে সারাটা গ্রাম এক্কেবারে বোবা হয়ে যায়। কি হিন্দু, কি মুসলমান সকলের মুখে এক কথা, হায়! এইডা কী কল্ল?

বড়বাড়ির ছাবেদ আলী মেম্বার জয়ধরখালীর সবচে প্রবীণ ও বিচক্ষণদের একজন। এই খবর শুনে, মরুব্বী মানুষটা হায়-হায় করে ওঠে, আহা রে…, রামুডা আর বেশিদিন বাঁচত না।

সারাগ্রামে কয়েকদিন ধরেই কবকব করে চলতে থাকে এইসব হায়-পাস্তানি। আর এইমতো রকমসকম দেখে মনে হয়, রামু দাস জয়ধরখালীর সকলের কত-না আপনজন।

আজকাল রামু দাস ঘর থেকে একদম বের হয় না। হাটবাজারে যাওয়া নাই, চুলাতেও আগুন নাই। চিড়ামুড়ির মজুদ ফুরিয়েছে কবে! ক্ষিধায় যখন রামু দাসের রুহুটা গলার কাছে এসে ধকধক করে বেরিয়ে পড়তে চায়, তখন থ্যাবড়া পা-দুইটা এলোমেলোভাবে ফেলতে ফেলতে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত রামু দাস যেন পাত্থরসমান পৃথিবীটা পিঠে নিয়ে, একটা কলা আর একগ্লাস পানি খেয়ে আবার বিছানায় গিয়ে পড়ে থাকে। অভিমানী বালকের মতো মোটা মোটা ঠোঁটদুইটা এখন সে আরো বেশি শক্তভাবে এঁটে রাখে।

ক্যামনে ক্যামনে জানি খবরটা গ্রামে চাউর হয়, রামু দাস গুরুতর অসুস্থ। জয়ধরখালী উজানপাড়ার কেউ একটা পাদ মারলে পালপাড়া-সাহাপাড়া-দাসপাড়া হয়ে রায়পাড়ায় পৌঁছতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। তাই এই খবরে দক্ষিণ থেকে আসে হিন্দু তরুণেরা, উত্তরপাড়া থেকে মুসলমান ছেলেরা। সবাই গোল হয়ে বসে আখড়ার চাতালে। কয়েক মিনিটের ছোট ছোট কথাবার্তায় স্থির হয়, গ্রাম থেকে চান্দা তুলে অসুস্থ রামু দাসকে ময়মনসিংহের হাসপাতালে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানো হবে।

ছেলেরা সারাদিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে চান্দা তুলে সন্ধ্যায় আবার এসে আখড়ার সামনে বসে। গ্রামের হিন্দু-মুসলমান, গরিব-দুক্কি-ধনী সকলেই রামুর জন্য সাধ্যমতো দিয়েছে। আর ক্ষুৎপিপাসায় ক্লান্ত তরুণেরা অবাক হয়েছে রামুর জন্য গ্রামের সকলের দরদ দেখে। দলের সবচে লম্বা আর কান্তিমান গণেশ সাহা বছর বছর আখড়ার রঙ্গমঞ্চের নাটকে নায়কের অভিনয় করে। চলে যাবার সময় সে তার কোঁকড়া চুলে ভরা বড় মাথাটা নাড়তে নাড়তে দীপ্ত গলায় বলে, আগামীকাল সকাল ছয়টায় রামুদার বাড়িতে সবাই আসবা। লঞ্চে করে কাঁওরাইদ। তারপর ট্রেনে ময়মনসিং।

শেখপাড়ার সিরাজ, ছোটখাটো গতরের তরুণ; নাটকে সে সবসময় দুঃখবাদী যুবকের মর্মস্পর্শী অভিনয় করে। তার মমতামাখা ভরাট কণ্ঠে সকলকে সে আরেকবার হুঁশিয়ার করে দেয়, সবাই ঠিক টাইবে আসবে; লঞ্চ ফেইল করা যাবে না।

পরেরদিন খুব ভোরে রামু দাসের বাড়িতে একটা হৈ চৈ পড়ে যায়। গ্রামের মানুষ ছুটে গিয়ে দেখে, স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ভরা ঘরটার একমাত্র চৌকিটাতে রামু দাস চিত হয়ে মরে পড়ে আছে। হাতদুইটা শক্ত করে মুঠি দেওয়া। মোটা মোটা কালো ঠোঁটদুইটা তারচে বেশি শক্ত করে এঁটে আছে, বিস্ফারিত চোখ দুইটা ভয়াবহ বিদ্রুপে স্থির।

রামু দাসের জন্য কাঁদবার কেউ ছিল না। কিন্তু সারাটা গ্রাম যেন অস্ফুট রোদনে মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে!

মুসলমান ছাত্ররা দ্রুত সরে এসে একটু তফাতে উঠানটা ঘিরে তাদের পড়শি জাতভাইদের সাথে দাঁড়ায়। হৈচৈ, গালিগালাজ, কুন্দল ও কলহপ্রিয় হাড়কিপ্পন মানুষগুলো দলে দলে নিজেদের ঘর থেকে লাকড়ি নিয়ে নদীপারের চিতাশালে নেমে আসে। কেউ কেউ ছোট ছোট শিশিবোতলে করে সাধ্যমতো কেরোসিনও নিয়ে আসে। হিন্দুরা ভিড় করেছে রামু দাসের চিতা ঘিরে। মুসলমানরা নদীর উঁচু তীরে মনখারাপ করে বসে বসে চিতা সাজানো দেখছে।

আম-কাঁঠালের সেরা লাকড়ি আর যথেষ্ট কেরোসিনের কল্যাণে অপুত্রক রামু দাসের মুখাগ্নির মিনিটখানেকের মধ্যে হাউৎ করে চিতার আগুন আকাশটাকে গিলে ফেলতে চায়। আর এই ফাঁকে রামু দাসের একহারা গতরটা বুকের উপরের লাকড়িটাকড়ি সহ স্প্রিঙের মতো ফাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়ে। এই মুহূর্তটির জন্য বলিষ্ট গতরের কয়েকজন বাঁশ হাতে আগে থেকেই রেডি ছিল। কাঁচা বাঁশের লম্বা আর মোটা মোটা লাঠিগুলো চারপাশ থেকে রামু দাসের মাথায় ঠাস ঠাস করে পড়তে থাকে। দূরে, নদীর উঁচু পাড় থেকে কিছু সাহসী আর রামু দাসের জন্য দরদিপ্রাণ মুসলমানরা ভিড় করে এইসব দৃশ্য দেখছিল। শেখপাড়ার হরমুজ আলীর হাড়জিরজিরে বুড়ি মা বাঁশের উঠানামা দেখেই চোখেমুখে আঁচলচাপা দেয়ে। সে নিজের ছেলের বয়েসী রামু দাসের জন্ম-কর্ম দেখেছে, বিয়ে দেখেছে। আর এখন সে দেখছে চিতার দাউ দাউ আগুনের মাঝে আজন্ম দুক্কি মানুষটার মাথায় বেশুমার লাঠি পড়ছে। রামু দাসের মাথার খুলি ডুপ্পৎ করে ফেটে যাওয়ার শব্দে বুড়ি কান্নায় ডুকরে ওঠে, হায়! হায় রে রামু দাস, তর ভাগ্যে অত দুক্কু আছিন!

… …

শেখ লুৎফর

COMMENTS

error: