জয়ধরখালী ২৫ ||  শেখ লুৎফর

জয়ধরখালী ২৫ ||  শেখ লুৎফর

অম্বর আলীর সাতটা মেয়ে হয়েছিল, ঝরে-পড়ে চারটা টিকল। ছেলেসন্তান নাই বলে কেউ কোনোদিন তাকে আক্ষেপ করতে শোনেনি। মেয়েরা পরের ধন, পরের পুতের হাতে বুঝিয়ে দিয়েছে। এখন বুড়াবুড়ির সংসার। দুইজন পিঠাপিঠি ভাইবোনের মতো সামনাসামনি বসে হুঁক্কা টেনে টেনে বেশ চলে যাচ্ছে। তিনবেলা ভাতও জোটে। পানসুপারি আর তামাকটা একটু বেশি লাগে। লাগুক। সে নিজেই তো পানের দোকানদার। কাঠের একজোড়া খড়ম কবে কিনেছিল মনে নাই। এখনো পায়ে দিয়ে চটাং চটাং করে হাঁটতে পারে। বিয়ের সময় রাবারের একজোড়া জুতা কিনেছিল; আজো উগারতলে পড়ে আছে। এই রকম লোকের খোরাকিকষ্ট থাকার কথা না। তাই বুড়া অম্বর আলী সুখী না দুঃখী ঠাস করে রায় দেওয়া মুশকিল।

অম্বর আলীর তিনকাল গিয়ে শেষকালে ঠেকেছে তবু মসজিদে যায় না। কয়েক বছর আগেও কেউ নামাজের কথা বললে সে চোখ লাল করে তাকিয়ে থাকত। এখন আর রাগ করে না। ছোটখাটো মানুষটার মাথায় সুন্নত বাবরি, বুক-সমান সাদা দাড়ি, গোঁফটা লম্বা হতে হতে বিড়ালের লেজের মতো ঝুলে পড়েছে। এখন কেউ নামাজের কথা বললে সে শুধু একবার দাড়িগোঁফে হাত বুলিয়ে নিজের বিবেচনামাফিক ভাবে। যা ভাবে তার সারকথা হলো : বিশ্বাসে খোদা; সংসার তার আবেগহীন প্রেমের নির্লিপ্ত রচনা।

এ্যাবাডেবা নাক-মুখ, গব্দা গব্দা হাত-পায়ের বুড়ি তামাক রেডি করে কুড়ুৎ কুড়ুৎ কয়টা টান দিয়ে হুঁক্কাটা বুড়ার দিকে এগিয়ে দেয়, — আমগর শেষকাল আইছে অহন জুম্মাঘরে গেলেই পারে।

বুড়া বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিল, পেছন বাড়ির বাঁশতলায় হাজারে-বিজারে জোনাকপোকা জ্বলছে। মাছির চে ছোট্ট এক জীব, রাত হলে কী আচান্নক মাহিত্বে অন্ধকারে বিরাজ করে! হুঁক্কাতে জোরে একটা দম দিয়ে ধোঁয়াগুলো বেরিয়ে যাওয়ার জন্য সে হা-করে একটু অপেক্ষায় থাকে। তারপর নির্বিষ গলায় বুড়িকে তিরস্কার করে, — তর আর বুদ্ধিটুদ্ধি কবে অইব?

বিষুদবার সন্ধ্যায় বুড়া বাজার থেকে জ্বর নিয়ে ফিরে আসে। জ্বরের কথা শুনে বুড়ি শুকনা পাটশাক ভাজে। গরম গরম ভাতের সাথে মচমচা শাক মুখে দিয়ে বুড়া কচ করে ভাজা মরিচে কামড় বসায়। বুড়ি আরো কিছু শাক বুড়ার পাতে দিতে দিতে বলে, — পেট ভৈরা খাউক; আঁতে তিঁতা পড়লে ঘাম দ্যায়া জ্বর পলাইব।

সত্যি সত্যি তামাক খেতে খেতেই বুড়ার জ্বর ছেড়ে দেয়। বুড়ি বদনাভরা পানি আর খড়মজোড়া এনে সামনে রাখে। উঠানে পা ধুয়ে খড়মে চট্টৎ চট্টৎ শব্দ তুলে বুড়া এসে চৌকিতে বসে। বিছানা বলতে খেজুরপাতার পাটি আর তেল-চিটচিটে দুইটা বালিশ। টিনে-ছাওয়া মাটির দেওয়াল-ঘরের উত্তর কোনায় ছোট্ট একটা ধানের উগার। ঘরের আরেক কোনার দড়িতে ঝুলানো বুড়ির খানকয় নোংরা শাড়ি, বুড়ার লুঙ্গি-গামছা। ঘরের অন্য কোনা দুইটায় নানান জাতের ছিপ-বড়শি। বুড়ার মাছ শিকারের নেশা। তাই ঘরের চালের কড়িবর্গার সাথে উজাই মাছ শিকারের  নানান আকৃতির কোঁচ-ট্যাঁটাও বাঁধা আছে। কোনো কোনোটার লোহার শলা এই মোটা আর হাতখানেক লম্বা লম্বা। এইসব ট্যাঁটা দিয়ে বুড়া দশসের-বিশসের ওজনের বোয়াল মাছ মারে।

বুড়ার একটা বিড়ালিও আছে; বাচ্চা দিতে দিতে সে চৌকির তলটা ভরে ফেলেছে। খেতে বসলে মা বিড়ালটা তার গোষ্ঠিগতর নিয়ে অম্বর আলীকে ঘিরে বসে। রোজ রোজ ভোররাতে সে মাছশিকারে চলে যায়। সুরুজ উঠার কালে খলইভরা মাছ নিয়ে ফিরে আসে। খাওয়ার সময় বুড়ার পাতের বেশিরভাগ মাছ চলে যায় বিড়ালগুলার পেটে। তাই বুড়ি ডালের ঘুটনি দিয়ে বিড়ালগুলাকে তাড়িয়ে দিতে চাইলে বুড়া বাঁ হাতে ঠোঁটের উপর থেকে গোঁফজোড়া সরিয়ে দিতে দিতে রাগী গলায় বলে, — দুনিয়াত খালি একলা একলা বাঁচবার আইছৎ?

সিথানের ছোট্ট খিড়কি দিয়ে দক্ষিণ থেকে অলল করে বাতাস আসছে। আরামে বুড়া ‘আল্লা…’ বলে বিছানায় গতর ছেড়ে দেয়। বাতি নিভিয়ে বুড়িও এসে পাশে শোয়, — আমার রহিমারে নাইয়র আনা দরকার। কতদিন বড় নাতিডারে দ্যাহি না।

রহিমা অম্বর আলীর বড়মেয়ে। বিয়ে হয়েছে তিন গেরাম পরে। রহিমার বড়ছেলেটা রূপকথার কিচ্ছা শোনার জন্য বুড়ি-নানির বিশেষ ভক্ত। কিন্তু বুড়ির কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বুড়ার নাক ডাকার শব্দ শোনা যায়। ‘ঘুমায়া গ্যাছে’ — নিজের মনে এই কথা বলে বুড়িও পাশ ফিরে।

শেষরাতে বুড়ার গতরের তাপে বুড়ির ঘুম ভেঙে যায়। সে অন্ধকারেই বুড়ার কপালে হাত দেয়, — ‘ইস…ধান দিলে খৈ ফুটব।’ এইসব বলতে বলতে বুড়ি বাতি ধরায়। এক সানকি ঠাণ্ডা পানি আর একটা ত্যানা নিয়ে শিথানে বসে। জ্বরের ঘোরে বেহুঁশ বুড়া বকছে, — গাঙ থাইকক্যা আধামণ ওজনের একটা কালিবাউশ খালে উঠছে রে… আমার উড়াল জালডা দ্যা।

বুড়ি সানকির পানিতে  ত্যানাটা ভিজিয়ে বুড়ার কপালে চেপে ধরে।

সুরুজ উঠার নাম নাই, সারা আকাশ জুড়ে কালো মেঘের থমথমানি। জ্বরের দাপটে বুড়া আর চোখ খুলতে পারছে না। চোখ বুজে-বুজেই প্যাঁচাল পাড়ছে : যার যার খোদা যার যার মতন, নমাজ পড়তে পড়তে কফালে দাগ ফালাইয়্যা দিলেই আল্লা মিলে না রে…।

বৃষ্টি আর আসল না। মেঘ কেটে গিয়ে রোদ উঠেছে। জ্বরে বুড়ার বেগতি শুনে পাড়ার কেউ কেউ দেখতে আসে। শিথানে দাঁড়িয়ে কপালে হাত দিয়ে ডাকে, — ভাইয়ো…শরীল বেশি খারাপ?

বুড়া ঘোরের মাঝেই জোরে জোরে জিগায়, — ক্যাডা রে এইহানে পানি ভাঙে? বোয়াল মাছটা যাইবগা।

যারা এসেছিল তারা সরে গিয়ে বারান্দায় বসে। বুড়ি তাদের সামনে পান-তামাক দেয়। তামাকে দুইদম দিতে না দিতেই ঘর থেকে বুড়ার গর্জন ভেসে আসে, — এইডা ক্যাডা রে…, ক্যাডা আমার দরজাত খাড়ইয়্যা চৌখ পাহায়, ভেংচি পারে? বোয়াল মারার ট্যাঁডাডা দ্যাছা; হালারে গাঁইত্থ্যালাই।

বুড়ি পাকঘর থেকে দৌড়ে আসে। বারান্দার দুইজন হুঁক্কা ফেলে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দরজায় উঁকি দেয় : জ্বরের ঘোরটোর নাই, বুড়া বিছানায় বসে বসেই পাগলের মতো দুইহাতে ট্যাঁটা খুঁজছে, — আমার ঘরে আইয়া আমারে চৌখ পাহায়! ট্যাটাৎ গাঁইত্থ্যা কইলজা রাইক্ক্যা দিতাম না?

একটু পরেই পাড়ায় পাড়ায় রব ওঠে, — অম্বর আলী আজরাইলরে ট্যাঁটা দ্যায়া গাঁইত্থ্যালবার চাইছিন, অহন জবান বন্ধ। আজাবের ঠ্যালায় আইগ্গ্যা-মুইত্ত্যা বিছনা ভৈরালাইছে!

তুকাব্বর আলী পাটের ফড়িয়া, সারাজীবন টাউট-বাটপারি আর সুদের ব্যবসাও করেছে। বুড়াকালে তিরিপুইর‍্যা হুজুরের পাল্লায় পড়ে নামাজ ধরেছে। তবু পাড়ার মহিলারা গাঙের ঘাটে আলাপে আলাপে বলে, — তুকাব্বর বুইড়্যার নজর ভালা না।

সে বলে, — একে ত বেনামাজি তার উফরে আজরাইলরে ট্যাঁডা মারতে চায়!
— হাছাই?
— হ। আমি নিজে চৌখ্যে দ্যাইখ্যা আইছি।

কাপড় নষ্টটষ্ট কিচ্ছু না। অম্বর আলী বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। একটু একটু নাক ডাকার শব্দে বুড়ি কপালে হাত দিয়ে দেখে, চোরা ঘাম হচ্ছে। জ্বরটর কিচ্ছু নাই। তাই খেতাটা বুড়ার গলাতক টেনে দিয়ে বুড়ি পাকঘরের দিকে চলে যায়। বুড়া যে-ধাতের মানুষ একটু পরেই হয়তো ঘুম থেকে উঠে ডাক দিয়ে বলবে, — খিদা লাগছে…,আমারে ভাত দ্যা।

বেনামাজি অম্বর বুড়ার খুব আজাব হচ্ছে শুনে পাড়ার লোকজন দলে দলে এসে দরজায় উঁকি দিয়ে দেখে, ঘুমের ঘোরে বুড়ার নাক ডাকছে। আজাব-টাজাব কিচ্ছু নাই দেখে যারা নামাজি তারা হতাশ হয়। সকাল থেকে পাড়ায় পাড়ায় বেনামাজি অম্বর আলী আর আজরাইল বিষয়ে যে ভীতিকর উত্তেজনা ছিল, টানটান আলাপ ছিল এবং যত আলাপ বাকি ছিল মুহূর্তে সব যেন পাঙসা হয়ে যায়; পাঙসা লাগে তাদের একঘেঁয়ে জীবনটাও।

দুপুরের দিকে বুড়ার ঘুম ভেঙে যায়। এর মাঝে বুড়ি অন্তত পাঁচবার এসে দেখে গেছে। বুড়ার ধাত সে জানে তাই রান্নাটান্না করে ফেলেছে। চিকন চালের ভাত আর চালকুমড়া দিয়ে কৈ মাছের পাতলা ঝোল। জ্বরের মুখে ঝাল ভালো লাগবে তাই শুঁটকির ভর্তাও করেছে। পাকঘরে বুড়াও নাই, বুড়ার বিড়ালগুলাও নাই। সবকটা বুড়ার চৌকির নিচে, আশপাশে গড়াগড়ি দিয়ে অপেক্ষায় আছে; কখন বুড়া পাকঘরে যায়।

বুড়ার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আগেই তবু শুয়ে থাকে। মাথার ভেতরটা ফাঁকা, হাড়ের জোড়ায় জোড়ায় টনটনে ব্যথা। আকাশে মেঘটেঘ নাই। জানালা দিয়ে হু হু করে গরম বাতাস আসছে। একটা চিল আকাশের গহিনে ক্লান্ত ডানা মেলে ধীরে ধীরে উড়ছে। বড় ক্লান্ত! কোথায় যেন তালটা কেটে গেছে, জানালা দিয়ে সেইদিকে তাকিয়ে বুড়ার মনটা খাঁ খাঁ করে।

খাওয়াদাওয়ার পর বারান্দায় মুখোমুখি বসে বুড়াবুড়ি হুক্কা টানে। শেষ দম দিয়ে বুড়ির হাতে হুক্কাটা দিয়ে বুড়া বলে,  — বিছানার পাডির নিচে পৈসা আছে; জবরালী একট্যাহা, মফিজ দুইট্যাহা তিনআনা আমার কাছে পাইব। আমি আর কেউর কাছে ঋণী না।

বুড়ার গতরটা বড় কাহিল তাই আলাপটালাপ জমে না। বুড়ি বুড়ার উদাস চোখের দিকে তাকিয়ে ভড়কে যায়, — তার শরীল কিন্তুক ঠিক নাই, বিছনাৎ গ্যায়া আরেকটু ঘুমাউক।

বুড়া সত্যি সত্যিই ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। হুক্কাতে তিন-চারটা দম দিতে না দিতেই বুড়ি বারান্দা থেকে বুড়ার নাক ডাকার শব্দ শোনে। এবং একটু পরেই নাকডাকার একটানা ছন্দটা থেমেও যায়। হুাক্কাটা রেখে বুড়ি বারান্দা থেকেই কান পাতে। না, শব্দটা নাই। অম্বর আলী মানুষটা চিরকাল আজব তাই বুড়ি কিছুটা কৌতূহল আর অনেকটা ভয় নিয়ে ঘরে এসে দেখে, বুড়ার মাথাটা বালিশ থেকে একটু কাত হয়ে পড়ে গেছে, ঠোঁটের কষে বুঝি একটু ফেনা! মুহূর্তগুলা অসহ্য লম্বা আর কঠিন তাই বুড়ি অস্থির, কাঁপা কাঁপা হাতে বুড়ার কাঁধে হাল্কা একটা ঠেলা দিয়ে বলে, — ঠিক অইয়া হুতুক।

বুড়ির ছোট্ট ধাক্কায় বুড়ার অসাড় মাথাটা এইবার বালিশ থেকে খসে পড়ে।

বুড়ির চিৎকারে পাড়ার মানুষ ছুটে এসে দেখে, বুড়া অম্বর আলী খেজুরপাতার পাটির বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। মৃত্যুর চিহ্নহীন চোখে-মুখে শান্তিময় জীবনের তৃপ্তি।

আবার পাড়াতে কবকব রব ওঠে, — মানুষটা কি কপাইলল্যা রে…, নিজেবাজে গোসল করল, ভাত খাইল, বিছনাৎ গ্যায়া ঘুমাইয়া মইর‍্যা গ্যালো!

যারা শেষকালে এসে মরণের আজাবের ভয়ে, কবরের আজাবের আতঙ্কে আর বেহেস্তের লোভে নামাজি হয়েছে তারা মানুষের এইসব কথায় সন্তুষ্ট হয় না। তারা বলে, কব্বরে গ্যায়া হান্দায়া দ্যাহোক, বেনামাজির দশা কি।

সন্ধ্যার আগেই অম্বর আলী বুড়ার দাফন-কাফন হয়ে গেল। গাঙপাড়ে কবর দিয়ে ফিরে আসার সময় কেউ কেউ দাঁড়িয়ে পড়ে। কবরের পাশেই কাটা বাঁশের পাতা পড়ে ছিল; সেগুলা খাওয়ার জন্য একটা বাছুর এসেছে। তারা জানে, কবর দিয়ে সরে আসতেই বেনামাজির কবরে লোহার ডাণ্ডা নিয়ে আজাবের দুইজন ফেরেশতা আসে। তখন কবরে বিকট শব্দ হয়। সেই শব্দ মানুষে না শুনলেও আবলা জীবেরা শুনতে পায়। তখন ভয়ে গরু-বাছুরের জিব বেরিয়ে আসে, ভে ভে করে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। এই বিশ্বাসে মানুষগুলা একটু তফাতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। কিন্তু কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বছুরটা বাঁশপাতা খাচ্ছেই খাচ্ছে। না পাইল ভয়, না দিল জিব বের করে ভে ভে দৌড়!

একজন দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলে, — দ্যাহিছ রাইত অইলে বেনামাজির কব্বরের বুহে আগুন জ্বলে।

যাদের উঠান কিংবা খলা থেকে গাঙপাড়ে অম্বর আলীর কবর দেখা যায় তাদের কেউ কেউ রাত হলে টানা কয়দিন সেইদিকে নজর রাখে। কিন্তু অম্বর বুড়ার কবরের বুকে আগুনটাগুন কিচ্ছু চোখে পড়ে না।

অম্বর বুড়ার মৃত্যুর পর কয়দিন খুব টানা বৃষ্টি গেছে। তাই নূরুর বাপের ঢেঁকিতে আসর জমেনি। আজ আর বৃষ্টি ছিল না। সারাদিন কড়কড়া রোদ ছিল। পথঘাটের থকথকে কাদা একদিনের রোদেই টান ধরেছে। তাই সন্ধ্যায় নূরুর বাপের রান্নাঘরে সবাই এসে বসে। তবারক বিড়িতে দম দিয়ে কুঁৎ করে মুখের লালা গিলে বলে, — অম্বর চাচা বড় ভালা মানুষ আছিন।

ফজর আলী বলে, — বৈশাগ মাস আইলে সাতটা-আটটা কৈরা উজাই বোয়াল মারছে। নিজের দরকারমতো একটু রাইকখ্যা বাকি সব পাড়ার মাইনশ্যেরে সমানমত ভাট কৈরা দিছে। মানুষটার কোনো লালসা আছিন না, না খাউন-পরনের, না ট্যাহা-পৈসার।

এইসব আলাপে নূরুর বাপ পারতপক্ষে মন্তব্য করে না। আজ করল, — কেউরে কোনোদিন মুখ কালা কৈরা কতা কৈছে না। আমার অম্বরভাই সাধু-সন্তগর লাহান চুপচাপ একটা জীবন কাডায়া গ্যালো।

মফিজদ্দি খুব নিরীহ মানুষ, কথাও বলে কম। সে বলল, — কোনোদিন হুনছি না অম্বরচাচার কাছে কেউ চাইরআনা পৈসা পাইব।

নূরুর বাপের সান্ধ্য-মজলিশে আজ আর আজিলি-ফাজিলি  আলাপ জমলই না। এইসব আধা-উলঙ্গ, অর্ধবর্বর মানুষেরা বিড়ির ধোঁয়া আর হৃদয়ের নীরবতা দিয়েই বুঝি বুড়া অম্বর আলীর জন্য আজকের সন্ধ্যাটা উৎসর্গ করে দিতে চাইছে?

প্রিভিয়াসলি অন জয়ধরখালী

… … 

শেখ লুৎফর

COMMENTS

error: