জয়ধরখালী ২৪ || শেখ লুৎফর

জয়ধরখালী ২৪ || শেখ লুৎফর

আজ ভোররাতে উবেদের কচি বউটা পালিয়ে গেল। বউ পালানোর ঘটনা জয়ধরখালীতে এই প্রথম না। দুই বছর আগে রাশেদের বউও পালিয়ে গেছিল। অনেক দেনদরবার করে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরিয়ে এনেছে। এইভাবে আঙুলের ডগায় একে একে গুনতে বসলে বেরিয়ে আসবে আরো অনেক বউ পালানোর করুণ অধ্যায়। বউয়ের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলার জন্য কোনো কোনো খরদরজাল শাশুড়ি একলাই একশ। তারপর আছে ননদিনীর ফোঁসফাঁস। আছে উদয়-অস্ত বান্দীর খাটুনি। এতসবের  পরে অনেকের কপালে ঠিকমতো ভাতও জোটে না। সবার খাওয়া শেষ হলে পিঁড়ি পেতে বসতে হয় শাশুড়ির পাশে। বউ হলো পরের বাড়ির মেয়ে, দোষে-গুণে নিজের করে না-নিলে কি আপন হয়?   তাই মাছ-গোস্তের সবচে ছোট টুকরাটা পড়ে বউয়ের পাতে। খেতে-বসার ভঙ্গি, পাতের ভাত মাখানো, খাওয়ার ধরনধারন সবকিছুর উপর চোখ থাকে শাশুড়ি নামক জজ-ব্যারিস্টারের। ভাতের নেউলাটা (গ্রাস) একটু বড় হলে, চিবানোয় শব্দ হলে দুই ঠোঁটের ক্ষুর দিয়ে বউয়ের চৌদ্দগোষ্ঠির ছাল তুলে নেয় শাশুড়ি। আর কি খাওয়া হয়? বউয়ের পেটের ক্ষিধা পেটেই পোড়ে। তাই কালো কালো দুই চোখের জলে নীরবে ভিজতে থাকে খোদার জমিন।

উবেদের বউটা ছিল তেরো বছরের খুকি। ‘বৌ কুত কুত’ খেলার মাঝ থেকে তার বাপ ধরে এনে, অপুষ্ট-আনাড়ি দেহটা লাল শাড়িতে প্যাঁচিয়ে, বিয়ের নামে চব্বিশ বছরের মর্দ উবেদের ঘরে পাঠিয়ে দিলো। উবেদের মা-ও একদিন বউ ছিল। লাজুক, কাঠি কাঠি হাত-পা; পরনের বারোহাত লম্বা শাড়ি সামলাবে না রান্নাঘর সামলাবে? তাই উঠতে-বসতে শাশুড়ির হাতে শিকার হয়েছে আচান্নক সব লাঞ্ছনার! ‘পুলসিরাত’-এর পুল পার হওয়ার মতো সংসারের শতশত অগ্নিপরীক্ষায় বালুভাজা হয়ে আজ সে শাশুড়ি। ছেলের বউকে কাছে পেয়ে বুকের অন্ধকার খন্দ থেকে কথায় কথায় তেড়ে আসতে শুরু করে যতসব বিষাক্ত সাপ-বিচ্ছু।

আঁটি তো দূরে থাক তেরো বছরের শরীরে সরও জমেনি; চব্বিশ বছরের জোয়ানের মর্দামিতে সব তঞ্চনঞ্চ! ছিন্নভিন্ন! বিয়ের লাল শাড়িতে কৌমার্যের ছোপ ছোপ রক্ত! ক্ষিধা-তৃষ্ণা, শরীরের বেদনা আর ঘুশঘুশানি জ্বরের ঘোর থেকে শেষরাতে উবেদ বউকে টেনে তোলে, — ল ঘাডে যাই; গোসল করতে অইব।

ঘাট থেকে ফিরতেই উবেদের মা বউয়ের হাতে একটা ঝাড়ু ধরিয়ে দেয়, — সবগুলান ঘর খুব ভালা কৈরা ঝাড় দিবা।

বউ নামক পরের বাড়ির বাচ্চা মেয়েটার ইচ্ছা করছে এইখানেই ঘুমে ঢলে পড়তে। কোমরে ব্যথা, পিঠে ব্যথা, উরুতে টনটনানি আর সেই জাগার অসহ্য জ্বলুন্তি নিয়ে সে ঘুমিয়ে-ঘুমিয়েই ঘরগুলা ঝাড়ু দেয়। উগার (ধানের ভাণ্ডার) তলায় একটা পাঁচ পয়সার দেখা মিলে, বড় ঘরের চৌকির নিচে একটা দুই পয়সা পড়ে থাকতে দেখে। এইগুলি নিয়ে সে কী করবে, কার হাতে দিবে, কিছুই বুঝতে না পেরে যেখানের মাল সেখানেই ফেলে রাখে।

কৈ জানি ছিল, চিলের মতো উড়ে এল শাশুড়ি, — ঘর হোরা (ঝাড়ু দেওয়া) শেষ হইছে বউ?
— হ।

উবেদের মা ঠাঠা পড়া মানুষের মতো বউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। পাঁচটা মেয়ের মাঝে উবেদ তার একমাত্র পুত। সেই পুতের এই অলক্ষ্মী বউ! চাউলের মুটকির পাশে কতকগুলা চাউল ফেলে রেখেছিল; সেখানেই পড়ে আছে। পয়সাগুলাও তাই। সে মরলে এই অলক্ষ্মীর হাতে পড়বে তার সোনার সংসার! ফকির হইতে উবেদের কয়দিন লাগবে গ?

বউয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উবেদের মায়ের চোখ দুইটা দপদপ জ্বলছিল। বাড়িভরা বিয়ের মেহমান, শুধু এই বিবেচনায় সে তখনকার মতো দাঁতের বিষ দাঁতেই চেপে রাখে।

বউ বাপের বাড়ি থেকে দ্বিতীয় যাত্রা ঘুরে এলে আসল জিনিস শুরু হয়। শিখিয়ে-পড়িয়ে লক্ষ্মী গিন্নী করে তোলার জন্য উবেদের মা বুকের আঁচল কোমরে কষে বেঁধে ফেলে। কথায় বলে, —

যেমন মা তেমন ঝি,
তিনগুণ তার নাতিটি।

সেই সুবাদে উবেদের ছোটবোনটাও মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে ফোঁসফাঁস করে, — ফক্কিনির ঝি; কিচ্ছু দেখছে না, খাইছে না, জানব কি?

সকালে থালাবাসন ধুতে গিয়ে একটা সানকি ভেঙে ফেলার অপরাধে উবেদের ছোটবোন এইসব বলতে বলতে ঘচ করে সমবয়সী ভাবীর গালে ঠুক্কর মারে।

উবেদ হলো জোয়ান চাষী, রক্তে তার হাজার বছরের চাষের স্মৃতি, পাকা ফসলের ঘ্রাণ; দিন কাটে তাই মাঠে মাঠে। খাওয়ার টাইমে পেটভরা আগুন নিয়ে বাড়িতে এসে গপগপ করে তিন সানকি ভাত গিলে। ফুতফুত করে বিড়ির ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আবার মাঠের দিকে চলে যায়। বউয়ের সাথে দেখা হয় ঘুমানোর সময় হলে। কুপিবাতির লাল আলোয় বিছানায় শুয়ে-বসে উবেদ যদি বউকে একটু দেখতে চায়, ভাব জমাতে চায়, তবে উঠান থেকে উবেদের মা দাঁত কিড়িমিড়ি করে চেঁচিয়ে ওঠে, — বউ বাতি নিভাও; একপোয়া কেরাসিনের দাম দুইআনা!

বউয়ের পেটের ক্ষিধা, শুকনা মুখ, গালের কালশিটে দাগ, চোখের বোবা কান্না; উবেদের কিছুই দেখা হয় না। চব্বিশ বছরের একটা শরীর শুধু অন্ধকারে আরেকটা বিপরীত শরীর খোঁজে। এবং ওইদিন শেষরাতেই উবেদের নিরুপায় বউটা বাপের বাড়ি পালিয়ে যায়।

— উবেদের বউ পলায়া গ্যাছে রে…

এই খবরে ঘরে ঘরে কোমরের গোপন দাদ চুলকানির মতো আরামের চুলবুলানি শুরু হয়, — ভালা হইছে; এইবার দারোগা মাগীর মুহে মাইনশ্যে পেশাব করব।

মরুব্বিদের কেউ কেউ বুঝি স্বস্তির নিশ্বাসও ফেলে, — আহ্! দুধের শিশুডা পলায়া আজরাইলের মুখ থাইকক্যা বাঁইচছ্যা গ্যাছে রে…

খবর পেয়ে উবেদ মাঠ থেকে ফিরে আসে; লজ্জা-ঘিন্না আর ক্ষোভে মুখটা কালো আঙরা, বুকের ভিত্তে আজব একটা ছটফটানি।

কেউ যাচ্ছে না দেখে বউয়ের খোঁজে উবেদকেই শ্বশুরবাড়ির দিকে হাঁটতে হয়। মাটির সড়ক ধরে সোজা দক্ষিণ দিকে হাঁটলে পাইথল খুব দূরে না। কিন্তু আজ উবেদের কাছে দূরেই মনে হয়! শ্বশুরবাড়িতে বিরাট হাউকাউ, রাগে-দুঃখে সবাই ফোঁসছে। উবেদকে দেখে তারা খেরি কুত্তার মতো খেউ খেউ করে তেড়ে আসে, — বিয়া কৈরা বউ নিছিলা না বান্দী কিনছিলা?

শাশুড়ি কাঁদতে কাঁদতে ঝাড়ু নিয়ে উবেদের দিকে ছুটে আসে, —

ঝি বাঁচলে জামাই,
পুত বাঁচলে কামাই।

এইরহম জামাইয়ের মুহে আমি ঝাড়ু মারি।

উবেদের চাচাশ্বশুর এসে বলে, — ফুলের মতন মেয়েডারে পালকিত তুইলল্যা দিছিলাম, একমাসেই কব্বরের কান্দাত পাডাইয়া দিছো মিয়া।

মানুষের স্বভাব এই, আঁতের বিষ উগলে দিলে এমনিই দেমাগ ঠিক হয়ে আসে। বোধ করি তারাও সব ঠিকঠাক করে রেখেছিল; তাই রাগ একটু থিতিয়ে এলে একটা কাগজ উবেদের সামনে মেলে ধরে, — আইয়া ভালাই করছ মিয়া, এইডাত টিপ দ্যায়া সব রাফসাফ কৈরা যাও।

উবেদের বুক পুড়ছে; একবার যদি তার দেখা পাইত! দুইচৌখ যেদিকে যায়, হাত ধইরা চইলা যাইত। ক্ষেত-বাড়ি দ্যায়া কী অইব, পরানে যদি সুখ না থাকে?

তালাকনামায় টিপছাপ দিয়ে উবেদ শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। বুকের মাঝে যার মুখের ছবি, রক্তের কোষে কোষে যার শরীরের ঘ্রাণ, তাকে এই জনমের মতো পর করে দিয়ে এল সে! আজ ওরা শুধু তাকে মারতেই বাকি রেখেছে। হুমকিধামকি, গালিগালাজে কী হয়? পুরুষের পরানের মাইর আসল জিনিস। শ্বশুরবাড়ির লোকজন আজ উবেদকে জীবনের মতো পরানে মাইরা দিছে!

উবেদের পকেটে ছিল তিনটাকা চৌদ্দআনা। সন্ধ্যায় গয়েশপুরের মাউড়্যাপট্টিতে ঢকঢক করে একহাড়ি তালের তাড়ি গিলে ফেলে। তারপর ঝুলতে ঝুলতে তিনমাইল পেরিয়ে এসে আহত রাক্ষসের মতো দেউড়ির কাছে ধুপ্পুত দিয়ে পড়ে যায়, — চুতমারানির ঝি কৈ? আমারে ভাত দ্যা…

চিনির ঘেরান পেয়ে সারি সারি পিঁপড়ার মতো পড়শিরা সব মুহূর্তে উবেদের মায়ের উঠান ঘিরে ফেলে। এক হুঙ্কারে তার মা-বোন ইঁদুরের মতো দৌড়ে গিয়ে ঘরের কোনাকানা খোঁজে। বাড়ির মরুব্বিরা বলাবলি করতে থাকে, — উবেদ হইল একরোখা খাঁটি দিলের মানুষ। উবেদের মা ভুল কৈরা বেণীর আগুন ঘরের চালে লাগায়া দিছে রে…।

গোঁয়ার চাষার স্বপন যেমন হয়; ঘুমের মাঝে উবেদ দুইহাতে লাঠি চালায়, শত্রু মারে হাজারে-বিজার তবু হারিয়ে-যাওয়া লাল শাড়িপরা সেই পরানপক্ষীটা উদ্ধার হয় না। তাই পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে উবেদ লাল চোখ কচলায়; ঘরের রুক্ষ-নিষ্ঠুর সেই গলাটার কোনো সাড়া-শব্দ নাই। তার জীবন তো বিনা দোষে হাবিয়া দোজখ; আসল দোষী দুধভাত খায় কোন যুক্তিতে?

মনের সাথে রফা করে সকাল সকাল বিরুনিয়া বাজারে এসে উবেদ ডাল দিয়ে রুটি খায়। দুই দিনের উপাস মানুষটার খাওয়ার চপচপ শব্দে দোকানদার জিগায়, — বাড়ি কৈ মিয়া?
— জয়ধরখালী।
— উবেদরে চিনঅ?
— হ। আমগর তিনবাড়ি দক্ষিণে।
— উবেদের ছোডু বইনরে আমার চাচাত্ত ভাই বিয়া করছে।
উবেদ রুটি খায় আর দোকানদারের সাথে চাডিনাড আলাপ করে। মনে মনে পিডিপিডি হাসে, — আমি ত শেষ; এইবার আসল জাগাত আগুন দিমু। দ্যাখবে পরের ঝি আর নিজের ঝি-র তফাৎ কতকানি।

বাজারের পাশেই উবেদের ছোটবোনের শ্বশুরবাড়ি। বিয়ের পরে সে মাত্র একবার এসেছিল। তাই বাজারের কেউ তাকে চিনে না। বোনের কোলে একটা বাচ্চা আছে। বিয়ের দশমাসের মাথায় সে মা হয়েছিল। এই নিয়ে অনেক কেলেঙ্কারি গেছে। নাস্তার বিল দিয়ে চলে আসার সময় উবেদ দোকানদারের কানে কানে ফিসফিস করে, — আফনের চাচাত্ত ভাইয়ের বউ ভালা না; বিয়ার আগেই পেডে পোলা আইছিন।

লোকটা হা-করে উবেদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে আর দাঁড়ায় না। হনহন করে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।

তিনদিন পরেই উবেদের ছোটবোন উঠানে এসে দাঁড়ায়। চাপা কান্নার ফোঁপানি শুনে উবেদের মা ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসে দেখে, বাচ্চা কোলে ফক্কিনির মতো দাঁড়িয়ে আছে তার বড়মেয়ে! খালি পা। নাক খালি, কান খালি, পরনে একটা কমদামা পুরান শাড়ি; কাঁদতে কাঁদতে চোখ দুইটা লাল কুক্কা!

উবেদের মা দৌড়ে আসে মেয়ের দিকে। মেয়ে এক-কদম পিছিয়ে গিয়ে সাপের মতো ছোবলে ওঠে, — তুমি একটা রাক্ষুসী; আমারে তুমি ছঁইবা না। পরের ঝি-র ঘর ভাঙছ, তোমার ঝি-র ঘর খোদায় ভাঙছে।

উবেদের বিয়ের আগেই সবচে ছোটটার বিয়ের আলাপ আসছিল; এখন আর আসে না। যদিও আসে, পড়শিরা পাত্রীর তত্ত্বতালাশে আসা মানুষকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলে, — এই আগুন ন্যায়া কী করবাইন? রক্ত ভালা না। অত্যাচারে অতিষ্ঠ পুতের বউ পলায়া গ্যাছে; চরিত্রদোষে বড়মেয়েও ফেরত আইছে।

উবেদের মাকে এখন আর বেশি চোখে পড়ে না। কথায় কথায় নিজের পেটের মেয়েরাই তার চুল ছিঁড়তে চায়। উবেদ মাঝে মাঝে গয়েশপুর থেকে তাড়ি খেয়ে এসে খুব চিল্লাফাল্লা করে, — চুতমারানির ঝি কৈ?

বেশ কয়েক বছর পরের কথা। এর মধ্যেই একবার উড়ন্টি বাতাসের মতো আশপাশের কয়েক গ্রাম খেয়ে জয়ধরখালীতেও কলেরা এসেছিল। মানুষজন সব মরল পটারপট। উবেদের মা আর জামাইবাড়ি ফেরৎ উবেদের বোন-ভাগ্নাটাও মরল। শরীরে প্রায় বিগতযৌবনা ভাব নিয়ে সবার ছোটটাও ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেটেদে একদিন চলে গেল এক বুড়োর তিন নম্বর বউ হয়ে। উবেদ এখন সকালে পানি-পান্তা খেয়ে মাঠে গেলে বিকালে এসে উঠানের চুলায় ভাত চড়ায়। মাথাভর্তি সেই বাবরিটা আর নাই, শরীরটাও কিছু শুকিয়েছে। কাম না থাকলেও ক্ষেতের বাতরে বাতরে হাঁটে। গরু বলো আর ছাগল বলো ভালোবাসা ছাড়া কী জীবন হয়? তাই উবেদের হৃদয়-নিংড়ানো মমতা আর নিবিড় ভালোবাসায় জমিনও তাকে বুক ভরে দেয়। জয়ধরখালীর সবাই বলাবলি করে, — উবেদের শালকাঠের সিন্দুকটা ট্যাহায় ভরা!
উবেদ মিটমিটায় হাসে আর মনে মনে কয়, — আমার বুকের সিন্দুকে যে অনেক দুক্কু!

আউশ ধান তখন গুছি বাঁধতে শুরু করেছে। সারা মাঠ খালি; সবাই গেছে দুপুরের ভাত খেতে। উবেদ তো দুপুরে বাড়ি যায় না। সে পুবের সড়কের পাশের ক্ষেতে ঘাস বাছছিল। হঠাৎ কানে লাগে কচি একটা গলা তাকে ডাকছে, — এই-যে চাচা… আম্মা আফনেরে ডাহে।

উবেদের হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে ওঠে। আজ সাত বছর তার বিয়ে হয়েছে কান্দিগ্রামে। প্রথম প্রথম দুই বেহারার পালকি চড়ে বাপের বাড়ি যেত এখন নাকি পুবের সড়ক দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাওয়া-আসা করে। এই খবর পাওয়ার পর থেকে সে কান্দি তো দূরে থাক পারতপক্ষে উত্তরের দিকে ভুলেও কদম ফেলে না। সড়কে উঠে আবেদ ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। সেই চোখ, নাক, চিকন ঠোঁটে বাঁকা বাঁকা হাসি। ঝিমঝিম করে শরীরটা ভেঙে আসছে দেখে উবেদ সড়কের বাজুতেই বসে পড়ে।

পাশে যে দাঁড়িয়ে ছিল, সে দাঁড়িয়েই থাকল। মুখের উপর থেকে বোরকার নেকাব সরানো, —
আমি সব জানি, সব খবর পাই। হে আরেকটা বিয়া করোক। আমি সুখী হইয়াম।

উবেদের দুনিয়া ঘুরছিল। আরেকটু হলেই পড়ে যেত। তাই মাথাটা ঝাপত করে বুকের দিকে নেমে যায়।

কালো কুচকুচা সেই বাবরিটা আর নাই। রোদে-পোড়া রুক্ষ ফিরিঙ্গি ফিরিঙ্গি চুলগুলাতে কতদিন জানি তেলপানি পড়ে না! চুলে, গোঁফে একটু একটু পাক ধরেছে। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে-থাকা মানুষটার চোখ ফেটে পানি আসছিল। বুক থেকে কী যেন একটা উঠে এসে দুইহাতে চেপে ধরেছে শ্বাসনালি। নিজের উদ্দরের ছেলেটা হা-করে চেয়ে আছে মায়ের মুখের দিকে। না পারল কাঁদতে, না পারল মনের কথা ঠিকমতো কৈতে।

অনেকক্ষণ পর উবেদ মাথা তুলে দেখে মা-ছেলে উত্তরের কলুপাড়ার জামতলায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ছেলেটা জামগাছে বসা পাখি দেখছে। মা দক্ষিণ দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে। মাঝেমাঝে বোরকার হাতা দিয়ে চোখ মুছছে। উবেদের ইচ্ছা হয় একদৌড়ে গিয়ে তার কাছ থেকে একটা কথা জেনে আসে। কিন্তু তাদের মাঝে আজ একজীবনের ফারাক। তাই দক্ষিণের বাতাস শুধু দুপুরের ঠাঠা রোদ ভাঙতে ভাঙতে উত্তরের দিকে ছুটে যায়।

প্রিভিয়াসলি অন জয়ধরখালী

… …

শেখ লুৎফর

COMMENTS

error: